৫৮ বছর পর নতুন মডেলের গ্রেনেড পাচ্ছে মার্কিন সেনা

Date:

আজ ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাতের ৩৫তম দিন। এ সময়ে এসে জানা গেলো, নতুন গ্রেনেড পেতে যাচ্ছে মার্কিন স্থলবাহিনী।

সর্বশেষ ভিয়েতনাম যুদ্ধের আমলে একটি নতুন মডেলের গ্রেনেড তুলে দেওয়া হয়েছিল মার্কিন সেনাদের হাতে। ১৯৬৮ সালের ওই ঘটনার পর পেরিয়ে গেছে অর্ধ-শতাব্দীরও বেশি সময়। 

স্থলসেনাদের জন্য প্রথমবারের মতো একটি প্লাস্টিক-বডিযুক্ত হাত বোমা বা হ্যান্ড গ্রেনেডের অনুমোদন দিয়েছে মার্কিন সেনাবাহিনী। 

গতকাল বৃহস্পতিবার এই তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। 

গত মাসে এম১১১ নামের এই নতুন গ্রেনেডের বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করে মার্কিন সেনাবাহিনী। 

 

১৯৬৮ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মার্কিন সেনাদের হাতে এমকে৩এ২ গ্রেনেড তুলে দেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকারিতা দেখালেও অ্যাসবেস্টসের উপস্থিতির কারণে গ্রেনেডটি ১৯৭০ সালে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। 

অ্যাসবেস্টসের সঙ্গে ফুসফুসের ক্যান্সারসহ অন্যান্য মরণব্যাধির যোগসূত্র খুঁজে পাওয়ায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। 

 

এরপর থেকে মার্কিন সেনারা মূলত এম৬৭ গ্রেনেড ব্যবহার করে এসেছেন। 

গ্রেনেডটি দেখতে খানিকটা বেসবলের মতো। ইস্পাতের তৈরি গোলাকার গ্রেনেডগুলোর ওজন ১৮০ থেকে ১৮৪ গ্রামের মতো। 

 

এতে আরডিএক্স ও টিএনটির সমন্বয়ে তৈরি একটি শক্তিশালী বিস্ফোরক থাকে। আগের আমলে গ্রেনেডের ভেতর ছোট ছোট ‘বল’ রাখা থাকতো। বিস্ফোরণের দমকে বলগুলো শত্রুদের দিকে ছুটে যেত। সেখান থেকেই ‘শ্র্যাপনেল’ শব্দের ব্যবহার শুরু। 

তবে বর্তমানে ওই গ্রেনেডে কোনো বল থাকে না। বাইরের ইস্পাতের আবরণটি বিস্ফোরণের দমকে ভেঙে শত টুকরো হয়ে উচ্চ গতিতে শত্রুকে আঘাত হানে। 

 

নতুন হাতবোমায় প্রথাগত শ্র্যাপনেলের বদলে ‘শকওয়েভ’ ব্যবহার করে শত্রু নিধনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এই প্রযুক্তির নাম ব্লাস্ট ওভারপ্রেশার (বিওপি)। 
সেনাবাহিনীর দাবি, এই হাতবোমা ঘনবসতিপূর্ণ শহুরে এলাকায় বেশি কার্যকরী ভূমিকা রাখবে। 

বিশেষত, কোনো ভবনকে শত্রুমুক্ত করে দখল নেওয়ার ক্ষেত্রে এটি খুবই কার্যকরী। 

 

এই গ্রেনেডের মাধ্যমে বেসামরিক মানুষ বা ‘হামলার লক্ষ্য নয়’ এমন ব্যক্তিদের এড়িয়ে সুনির্দিষ্ট অবস্থানে হামলা চালিয়ে লক্ষ্য পূরণ সম্ভব। 

বিস্ফোরণের পর খানিকটা এম৬৭ এর মতোই এম১১১ গ্রেনেডের বাইরের প্লাস্টিকের আস্তরণটি বাষ্পীভূত হয়ে যায় এবং ইলেকট্রিক শকের মতো ‘শকওয়েভ’ চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। শকওয়েভের আঘাতে শত্রু নিহত বা অজ্ঞান হয়ে পড়ে।  

প্রথাগত গ্রেনেড ছোড়ার পর দেওয়াল, আসবাবপত্র বা অন্যান্য উপকরণের পেছনে লুকিয়ে বা ‘কাভার’ নিয়ে প্রাণে বেঁচে যাওয়ার সুযোগ থাকে। আগের গ্রেনেডের শ্র্যাপনেল অনেক কিছুই ‘ভেদ’ করতে পারে না। 

তবে শকওয়েভের জন্য এগুলো কোন বাধা নয়। 

নতুন গ্রেনেডের প্রকল্প পরিচালক কর্নেল ভিন্স মরিস বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘কোনো কক্ষে বিওপি প্রযুক্তিনির্ভর এই গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হলে শত্রুরা পালানোর পথ পাবে না। একইসঙ্গে এটাও নিশ্চিত হবে যে আমাদের নিজেদের কেউ বা বন্ধুভাবাপন্ন মানুষরা আঘাত পাচ্ছে না।’

 

নিউ জার্সির পিকাটিনি অস্ত্রাগারে এই প্রকল্প পরিচালিত হয়।  

সেনাবাহিনীর ফ্যাক্ট শিটে উল্লেখ, ‘এই উচ্চ-চাপের ঢেউ (ওয়েভ) যখন কাউকে আঘাত হানে, তখন শরীরের পেশী সংকুচিত ও প্রসারিত হতে থাকে।’ 

ফ্যাক্ট শিটে আরও উল্লেখ, ‘ছোট বিস্ফোরণে কানের পর্দা, ফুসফুস, চোখ ও পরিপাকনালী আক্রান্ত হতে পারে। বড় বিস্ফোরণে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং শরীর থেকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।’ 
এই গ্রেনেডে আরডিএক্স নামের একটি শক্তিশালী বিস্ফোরক উপকরণ আছে। এটি বেশ কয়েক দশক ধরে মার্কিন সেনাবাহিনীতে ব্যবহার হয়ে আসছে। 

সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে মরিস জানান, হাতের তালুর সমান আকারের এই সিলিন্ডার সদৃশ গ্রেনেড তৈরিতে মধ্যপ্রাচ্যের পুরনো সংঘাতগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হয়েছে।  

‘ইরাক যুদ্ধ থেকে আমরা শিখেছিলাম যে এম৬৭ গ্রেনেড সব সময় কার্যকর নয়। এতে অনেক সময়ই বন্ধুভাবাপন্ন মানুষরা অকারণে হতাহত হয়’, যোগ করেন তিনি। 

 

সেনা বিবৃতি মতে, এম৬৭ ফ্র্যাগমেন্টেশন গ্রেনেড একেবারেই বাতিল হচ্ছে না। খোলা ময়দানে ব্যবহারের জন্য সেনারা এটাও বহন করবেন। তবে ঘরের ভেতর বা ভবনে হামলার ক্ষেত্রে এম১১১ ব্যবহার করা হবে। 

অপরদিকে মার্কিন মেরিন কর্পস আরও এক ধরনের বিওপি গ্রেনেড পেতে যাচ্ছে। মার্কিন সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এম২১ নামের এই গ্রেনেডটি নরওয়েভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নাম্মো উৎপাদন করবে। 

যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের কাছে আরও এক ধরনের গ্রেনেড থাকে। এর নাম থার্মোব্যারিক গ্রেনেড। একে ফুয়েল-এয়ার মিউনিশনও বলা হয়ে থাকে। এই গ্রেনেড বাতাসে জ্বালানি ছড়িয়ে দিয়ে প্রজ্বলন করে। 

সেখান থেকে শক ওয়েভ ও অগ্নিগোলক তৈরি হয় এবং এটি বাতাস থেকে অক্সিজেন শুষে নেয়। যার ফলে, দুই তিন মাত্রায় এটি শত্রু নিধন করে। 

বিওপির প্রভাব, বাতাসে অক্সিজেনের অভাব এবং উচ্চ চাপ—সব মিলিয়ে বাঁচার পথ খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। 

 

এই গ্রেনেডটি উৎপাদনের দায়িত্ব পেয়েছে টেক্সাস ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডে অ্যান্ড জিমারম্যান। 

তবে এর নকশা ও মেধাস্বত্ব থাকছে মার্কিন সরকারের হাতেই। যার ফলে, চাইলে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকেও ভবিষ্যতে এই গ্রেনেড উৎপাদনের দায়িত্ব দিতে পারে ওয়াশিংটন। 

মার্কিন সেনাবাহিনীর এক্সিকিউটিভ অ্যামুনিশন অ্যান্ড এনার্জেটিক্স (সিপিই এঅ্যান্ডই) এবং আর্মি কমব্যাট ক্যাপাবিলিটিস ডেভেলপমেন্ট কমান্ড (ডেভকম) নামের দুই পৃথক সংস্থা যৌথভাবে এর নকশা তৈরি করেছে। নিউ জার্সির পিকাটিনি অস্ত্রাগারে এই কার্যক্রম চলে। 

২০২০ সাল থেকে এই গ্রেনেড নিয়ে কাজ শুরু হয়। 
সাধারণত নতুন কোনো অস্ত্র অনুমোদন পাওয়ার পর সেনাদের হাতে পৌঁছাতে ন্যুনতম ছয় মাস থেকে ১ বছর বা তার চেয়েও বেশি সময় প্রয়োজন হয়।

আনুষ্ঠানিক অনুমোদন এসেছে ১০ মার্চ। 

ধরে নেওয়া যায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে স্থল অভিযানের নির্দেশ দিলেও মার্কিন সেনাদের এম৬৭ গ্রেনেড দিয়েই কাজ চালাতে হবে।  

Popular

More like this
Related

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এত ন্যূনতম—খাদ্যমূল্যের ওপর পড়বে না: বাণিজ্যমন্ত্রী

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে যে প্রভাব, সেটা এত ন্যূনতম যে,...

শেষ দিনে চমক, রূপগঞ্জে লিটন-মিরাজ জুটি

ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ (ডিপিএল) ক্রিকেটের দুই দিনের ট্রান্সফার উইন্ডোর...

আশা ভোসলের কণ্ঠে কালজয়ী হিন্দি ও বাংলা গানগুলো

ভারতীয় উপমহাদেশের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আশা ভোসলের বিদায়কে সংগীতপ্রেমীরা দেখছেন...

কেরাণীগঞ্জে আগুনের ঘটনায় নিহত ও আহতদের পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কেরাণীগঞ্জের কদমতলীতে গ্যাস লাইটার কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের...