বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে আবদুল কাদির এক অনন্য নাম। আজ তার ১২০তম জন্মবার্ষিকী। এই সময়েও তাকে নতুন করে স্মরণ করা আবশ্যক। কারণ আবদুল কাদির শুধু কবি ছিলেন না; ছিলেন একজন মননশীল সম্পাদক, বিচক্ষণ সাহিত্য-সমালোচক এবং সাহিত্য ঐতিহ্যের নিরলস সংরক্ষক।
নিজের সৃজনশীল রচনার পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যের বহু গুরুত্বপূর্ণ কবি ও লেখকের লেখা নিষ্ঠা ও দায়বোধ নিয়ে সম্পাদনা করেছেন আবদুল কাদির। বিশেষ করে সাহিত্য সমাজের মুখপত্র বার্ষিক ‘শিখা’র প্রকাশক ও লেখক হিসেবে তার ভূমিকা বাংলা মুসলিম নবজাগরণের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কবি কাজী নজরুল ইসলামের দৈনিক ‘নবযুগ’ পত্রিকার বার্তা সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন আবদুল কাদির। হয়েছিলেন মাসিক বিখ্যাত ‘মাহে নও’ পত্রিকার সম্পাদক।
আজকের সাহিত্য-বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আবদুল কাদিরের মতো সম্পাদক ও সাহিত্য-সমালোচকের প্রয়োজনীয়তা আরও গভীরভাবে অনুভূত হয়। বর্তমান সময়ে সাহিত্যচর্চার বিস্তার ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে বেড়েছে অপরিণত ও অগভীর লেখার প্রবণতা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতার কারণে এখন খুব সহজেই লেখক পরিচয় গ্রহণ করা যায়। কিন্তু সাহিত্য কেবল শব্দের বিন্যাস নয়; এটি চিন্তা, ভাষাবোধ, ইতিহাস ও নন্দনের সমন্বিত প্রকাশ। এই জায়গাতেই আবদুল কাদিরের মতো সম্পাদকদের গুরুত্ব সামনে আসে। তিনি লেখাকে কেবল ছাপার উপযোগীই করতেন না; বরং তার ভাষা, ভাব, ছন্দ ও সাহিত্যমানকে পরিশীলিত করতেন। একজন প্রকৃত সম্পাদক লেখকের বিকল্প নন, কিন্তু তিনি লেখকের সৃষ্টিকে যথার্থ রূপ দিতে সহায়তা করেন। আজ সেই দায়িত্বশীল সম্পাদনার অভাব স্পষ্ট।
আবদুল কাদির সাহিত্যকে দেখতেন সমাজ ও মানবিক চেতনার আলোকে। তার সাহিত্য-সমালোচনায় ব্যক্তিগত পক্ষপাতের চেয়ে যুক্তি ও সাহিত্যমান বেশি গুরুত্ব পেত। এখনকার সময়ে সমালোচনা প্রায়ই ব্যক্তিগত সম্পর্ক, গোষ্ঠীস্বার্থ কিংবা প্রচারণার দ্বারা প্রভাবিত হয়। ফলে প্রকৃত সাহিত্য মূল্যায়ন অনেক ক্ষেত্রেই আড়ালে পড়ে যায়। অথচ একটি সুস্থ সাহিত্য সমাজ গড়ে তুলতে নিরপেক্ষ ও মননশীল সমালোচনা অত্যন্ত জরুরি। কারণ সমালোচনাই সাহিত্যের ভেতরের শক্তি ও দুর্বলতাকে সামনে আনে এবং নতুন লেখকদের সঠিক পথ দেখায়।
তার কবিতা সম্পর্কে কবি জসীম উদদীনের মন্তব্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি লিখেছিলেন— ‘কবি আবদুল কাদিরের ভাষার গাঁথুনি যে-কোনো ভালো কবির অনুসরণীয়। ভাষার সুকঠোর বাঁধুনির অন্তরালে কবি তাঁর কাব্যখানি লুকাইয়া রাখেন।’ এই মূল্যায়ন আবদুল কাদিরের ভাষাবোধ ও কাব্যশক্তির গভীরতারই প্রমাণ বহন করে।
আবদুল কাদির ছিলেন ভাষা ও ছন্দের প্রতি গভীর অনুরাগী একজন ছান্দসিক। বাংলা ভাষার ধ্বনি, গঠন ও নান্দনিকতার প্রতি তার যে মনোযোগ ছিল, তা আজকের সময়ে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। এখনকার অনেক লেখায় ভাষার অযত্ন, অশুদ্ধতা ও অস্থিরতা চোখে পড়ে। ভাষা দুর্বল হলে সাহিত্যও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। তাই ভাষাবোধসম্পন্ন সম্পাদক ও সমালোচকের প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
বাংলা সাহিত্যের অতীত পরম্পরা সংরক্ষণেও আবদুল কাদিরের অবদান স্মরণীয়। তিনি বেগম রোকেয়া, কাজী নজরুল ইসলাম, কাজী আবদুল ওদুদ, শিরাজী রচনাবলি, লুৎফর রহমানসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ লেখকের রচনা সম্পাদনা ও সংকলনের মাধ্যমে সাহিত্য ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
আজ আমরা দ্রুত পরিবর্তনশীল এক সময়ে বাস করছি, যেখানে পাঠের চেয়ে প্রচার বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে সাহিত্য ইতিহাস ও ক্লাসিক পাঠের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সংযোগ ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। এই সংকটে আবদুল কাদিরের মতো গবেষণামনস্ক সম্পাদকদের প্রয়োজন, যারা সাহিত্যকে কেবল তাৎক্ষণিক ভোগের বিষয় হিসেবে নয়, একটি ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হিসেবে দেখবেন।
যে সময়ে আবদুল কাদিরের বেড়ে ওঠা, সে সময়টি ছিল নানা টানাপোড়েন ও বৈপরীত্যে ভরা। তিনি যে সমাজ ও সম্প্রদায় থেকে উঠে এসেছিলেন, তা ছিল নানা দিক থেকে পিছিয়ে পড়া এবং সাম্প্রদায়িক বিভাজনে আক্রান্ত। কিন্তু এই প্রতিকূলতার মধ্যেও তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল মুক্ত ও প্রসারিত। ‘সওগাত’ ও ‘নবযুগ’-এর মতো পত্রিকার পরিমণ্ডল, কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেন, মুজফফর আহমদ এবং নজরুলের সংস্পর্শ তার চিন্তাকে গভীরতা ও মুক্তির পথ দেখিয়েছিল। ফলে খুব অল্প বয়সেই তিনি নিজস্ব সাহিত্যদৃষ্টি নির্মাণ করতে সক্ষম হন।
আবদুল কাদিরের সম্পাদনা, সমালোচনা ও সাহিত্যদৃষ্টি আমাদের মনে করিয়ে দেয়— সাহিত্য শুধু জনপ্রিয়তার বিষয় নয়, এটি দায়বদ্ধতা, মনন ও সাংস্কৃতিক বিবেকেরও বিষয়। আজকের দিনে যখন সাহিত্য অনেক ক্ষেত্রেই তাড়াহুড়ো, বাজারকেন্দ্রিক প্রচার ও বিভাজনের শিকার, তখন তার মতো সম্পাদক ও সাহিত্য-সমালোচকের অভাব গভীরভাবে অনুভূত হয়। তার সাহিত্যদৃষ্টি নতুন প্রজন্মের জন্য হতে পারে পরিশীলিত, দায়িত্বশীল ও মানবিক সাহিত্যচর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা।