১৯৩২ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইরান ও ইরাক সফর করেছিলেন। সেই সফরের অভিজ্ঞতার বিস্তারিত তিনি লিখেছেন তার ‘পারস্যে’ ভ্রমণকাহিনিতে। এতে প্রকাশিত আবেগ ও অনুভূতি কবির বিশ্বজনীন ভাবনার স্পর্শে অনন্য মাত্রা পেয়েছে।
বিশেষ করে, এর বড় অংশজুড়ে ফুটে উঠেছে মুসলিম বিশ্বের প্রতি রবীন্দ্রনাথের গভীর শ্রদ্ধা ও আত্মিক টান। তিনি পরম মমতায় এঁকেছেন কবি হাফিজ ও রুমির আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারকে।
ইরানে হাফিজ শিরাজির সমাধিতে বসে কবি পরম শান্তি অনুভব করেছিলেন, সেখানে কিছুক্ষণ ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের চোখ ভরা ছিল অশ্রু, ছিল এক অমোঘ সত্য প্রেমের উপলব্ধি।
সুফি প্রেমতত্ত্ব আর উপনিষদীয় অদ্বৈতবাদ—একই অখণ্ড সত্যের দুটি ভিন্ন ধারা। রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন, মানুষের সত্যিকার মুক্তি নিছক ‘বাণী’ উচ্চারণে নয়, প্রকৃত জ্ঞানচর্চায়—একে অপরকে চেনাজানার গহন গভীরে। মূর্খের জন্য ধর্মের সাধনা নয়, তার প্রতি সৃষ্টিকর্তাও বিরূপ। তিনি থাকেন আলোকিত মানুষের হৃদয়ে।
ধর্মীয় অমিয় বাণী: ‘বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে? কেবল বিবেকবানরাই উপদেশ গ্রহণ করে।’ এমনকি মূর্খদের এড়িয়ে চলার কথাও সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘আপনি … মূর্খদের এড়িয়ে চলুন।’
হায়দ্রাবাদের নিজামের অনুদানে ‘নিজাম অধ্যাপক’ পদ সৃষ্টি করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ফলে শান্তিনিকেতনে ইসলামি সংস্কৃতি ও ইতিহাস গবেষণার নতুন দ্বার উন্মুক্ত হয়। এই পদের অধীনে খ্যাতনামা সব পণ্ডিত শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন।
তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ভাষাবিদ ও গবেষক পণ্ডিত মওলানা জিয়াউদ্দিন। তার প্রচেষ্টায় বিশ্বভারতীতে আরবি, ফারসি ও ইসলামি ইতিহাস গবেষণায় জোয়ার আসে। পরে বিশ্বভারতীর ‘ইসলামিক স্টাডিজ’ বিভাগ পূর্ণাঙ্গ রূপ পেয়েছিল, যার ভিত্তিপ্রস্তর ছিল এই ‘নিজাম অধ্যাপক’ পদটি। শান্তিনিকেতনের লাইব্রেরিতে ইসলামি সাহিত্য ও দুষ্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপির যে সংগ্রহ গড়ে উঠেছিল, তার পেছনেও এই উদ্যোগের বিশেষ ভূমিকা ছিল।
আজকের এই কণ্টকাকীর্ণ বিশ্বে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। মানুষে মানুষে সম্পর্কের বাঁধন আলগা হয়ে পড়ছে। বুঝে বা না বুঝেই হোক, মানুষ পরস্পরকে কাদা ও কালি নিক্ষেপ করছে। এমন বিভাজিত সময়ে রবীন্দ্রনাথের সমন্বয়ী চিন্তা আরেকবার পথ দেখায়, ‘বিশ্বপথিক’ হওয়ার আহ্বান জানায়। কারও কাছে তা ‘ইউটোপিয়া’ বা ‘স্বাপ্নিক কল্পনা’ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু অনেক সময় বৃহত্তর প্রয়োজনে এই ‘ইউটোপিয়া’রই প্রয়োজন হয়।
রবীন্দ্রনাথ তার নিবিড় উপলব্ধিতে বুঝেছিলেন, অজ্ঞানতা ও উগ্রতা মানুষকে সংকীর্ণতার গণ্ডিতে আবদ্ধ করে। অজ্ঞানতা স্বাধীনতার অপূর্ব স্বাদ নষ্ট করে দেয়। মানবতার পথকে ভয়ানকভাবে রুদ্ধ করে। মসৃণ পথে হযরতের বুড়ির মতো কাঁটা বিছিয়ে দেয়। আর মাত্রাজ্ঞানের অভাব মানুষকে ধুলোর সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। অহংকার কখনোই কাউকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেয় না।
প্রসঙ্গক্রমে স্মরণ করা যায় মহান বাণী, ‘তুমি তো কখনোই পদভারে ভূপৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় কখনোই পাহাড় সমান হতে পারবে না।’ মানুষের আয়োজন যত বড়ই হোক না কেন, তার জীবনকাল সীমিত। সেই ক্ষণকালের জীবন নিয়ে বড়াই করা অর্থহীন। তাই মানুষের উচিত আত্মার সন্তুষ্টি অর্জন করা, আত্মজ্ঞান অর্জন করা।
রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী মন্ত্র—‘যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম্’। মানে—‘যেখানে সমস্ত বিশ্ব একটি নীড়ে পরিণত হয়।’ এটি শান্তিনিকেতনের প্রবেশদ্বারে উৎকীর্ণ লিপি, আর্তমানবতার অভয় আশ্রয় গড়ার অঙ্গীকার।
১৯৩০-এর দশকে নাৎসিবাদের দানবীয় ছায়ায় ইউরোপ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ সারা বিশ্বের নিপীড়িত ও নির্বাসিত শিল্পীদের জন্য তার হৃদয়ের দুয়ার উন্মুক্ত করে দিলেন। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে শান্তিনিকেতনের মাটিতে মিলেছিলেন চীনের তান ইউন-শান, জার্মানির অ্যালেক্স আরোনসন, অস্ট্রিয়ার স্টেলা ক্রামরিশ কিংবা ফ্রান্সের আন্দ্রে কার্পেলেস ও আলেক্সান্দ্রে বোগদানফের মতো বহু বিশ্বনাগরিক। তারা বিভিন্ন শাস্ত্রে ও ভাষায় বিশেষজ্ঞ ছিলেন।
তান ইউন-শান চীনের গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে কবির আশ্রয়ে এসেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তার সহযোগিতায় ‘চীনা ভবন’ প্রতিষ্ঠা করলেন। ভারত-চীন মৈত্রীর এক শাশ্বত সেতুবন্ধন রচিত হলো।
একইভাবে ইহুদি বংশোদ্ভূত অ্যালেক্স আরোনসন নাৎসি নিপীড়ন থেকে বাঁচতে ভারতে এলেন। ব্রিটিশ রাজশক্তি তাকে ‘বিদেশি শত্রু’ হিসেবে বন্দি করল। কবির হস্তক্ষেপে তিনি মুক্তি পেলেন। এই মিলনমেলায় কোনো পক্ষপাত বা আধিপত্য ছিল না।
হাঙ্গেরির লিজা ফন পট কিংবা ফরাসি শিল্পী আন্দ্রে কার্পেলেসরা যখন ইউরোপীয় নকশাশৈলী শেখাতেন, তখন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শিল্পকলার এক অপূর্ব রসায়ন তৈরি হতো। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন, আধুনিক তুরস্কের মতো এক আত্মনির্ভরশীল ও সংস্কারবাদী এশিয়ার অভ্যুদয়।
তিনি রাজনীতিবিদের চেয়েও দূরদর্শী ছিলেন। তিনি সতর্ক করেছিলেন যান্ত্রিক আধুনিকতার বিষয়ে। তাই বিবেচনাহীন রাষ্ট্রনীতি থেকে সরে থাকতে বলতেন। স্বৈরাচারী শাসকের অপরিণামদর্শী অন্ধ মোহকে তিনি মনে-প্রাণে ঘৃণা করতেন। পারস্যের সম্রাট রেজা শাহ পাহলভির প্রশাসনিক কঠোরতা যেন কবির মনে ‘রক্তকরবী’র যান্ত্রিক জগতের কথা স্মরণ করিয়ে দিত। তিনি বুঝেছিলেন, ক্ষমতার দাপট দিয়ে মানুষের অন্তরাত্মাকে জয় করা যায় না।
শুধু তাই নয়, সামগ্রিক কল্যাণের প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ নিজ দেশের মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গেও কখনো কখনো ভিন্নমত পোষণ করেছেন।
১৯৩২ সালের ইরান-ইরাক সফরের সময় কবি রবীন্দ্রনাথ বাগদাদে স্থানীয় সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন। ইরাকের রাজা প্রথম ফয়সালের আমন্ত্রণে ছিল তার বাগদাদ সফর। সেখানে তিনি মরুভূমির দেশগুলোর মানুষের সাহসিকতার প্রশংসা করেন। তাদের কাব্যসাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের অনন্য ও অমূল্য সম্পদ বলে ঘোষণা করেন। তিনি ইরাকের কবিদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, এশিয়াকে আবার জেগে উঠতে হবে এবং সেই জাগরণ হবে জ্ঞান ও মৈত্রীর।
কোনো মনীষী ইরানে বেড়াতে গেলে সে-সময় মসজিদে ভাষণ দেওয়ার রীতি প্রচলিত ছিল। এই উদার ঐতিহ্যের ধারা মেনেই রবীন্দ্রনাথ মিনারে দাঁড়ালেন। তিনি সেখানে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করলেন হায়দ্রাবাদের নিজামের কথা, যার উদার অর্থানুকূল্যে শান্তিনিকেতনে ইসলামি বিদ্যাচর্চার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল।
পারস্যের সুরম্য মসজিদ আর বাগিচা দেখে রবীন্দ্রনাথের চিত্ত বিগলিত হয়েছিল। সেই অনুভব বিচিত্র বর্ণের বিভায় রঙিন হয়ে সুমধুর সুর হয়ে ঝরে পড়েছিল, ‘এর স্থাপত্য একাধারে সমুচ্চ গম্ভীর ও সযত্নসুন্দর, এর কারুকার্য বলিষ্ঠ শক্তির সুকুমার সুনিপুণ অধ্যবসায়ের ফল। এর পার্শ্ববর্তী আর-একটি মসজিদ মাদ্রাসে-ই-চাহার বাগে প্রবেশ করলুম। এক দিকে উচ্ছ্রিত বিপুলতায় এ সুমহান, যেন স্তবমন্ত্র, আর এক দিকে সমস্ত ভিত্তিকে খচিত করে বর্ণসংগতির বিচিত্রতায় রমণীয়, যেন গীতিকাব্য।’
একইসঙ্গে তিনি দুঃখ করে বলেছিলেন ভারতবর্ষের মন্দিরে তার প্রবেশে সংকোচ নিয়ে। একক ও অভেদ স্রষ্টায় বিশ্বাসী রবীন্দ্রনাথ তখন ধর্মমন্দিরে ছিলেন অপাঙ্ক্তেয়। যিনি সারাবিশ্বকে এক নীড়ে বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই রবীন্দ্রনাথই তার আপন জন্মভূমির সংকীর্ণতায় ভীষণ ব্যথিত ছিলেন।
‘পারস্যে’ গ্রন্থে তারই প্রতিধ্বনি, ‘বিশ বছর পরেও পুরীতে জগন্নাথের মন্দিরে আমার মতো কোনো ব্রাত্য যে প্রবেশ করতে পারবে সে আশা করা বিড়ম্বনা।’ অথচ বিস্ময় প্রকাশ করে উচ্চকিত হয়ে লিখেছেন, ‘ইস্পাহানের ময়দানের চারিদিকে যে-সব অত্যাশ্চর্য মসজিদ দেখে এসেছি তার চিন্তা মনের মধ্যে ঘুরছে। এই রচনা যে যুগের সে বহুদূরের, শুধু কালের পরিমাপে নয়, মানুষের মনের পরিমাপে।’
১৯৩২ সালের ইরান সফরে রবীন্দ্রনাথ রেজা শাহ পাহলভির প্রশংসা করেছিলেন। তিনি তখন তার চোখে দেখেছিলেন একজন দেশপ্রেমিক সংস্কারককে। কিন্তু মাত্র নয় বছরের মাথায় সেই শক্তিশালী সম্রাটের পতন হয়। কারণ বৃহত্তর রাজনীতি ও জনগণের মনোভাব বুঝতে না পারলে কোনো শাসনই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কেবল প্রশাসনিক কঠোরতা দিয়ে মসনদ রক্ষা করা যায় না—এ ইঙ্গিত রবীন্দ্রনাথ তার মৃত্যুর আগেই করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ অবশ্য রেজা শাহ পাহলভির চূড়ান্ত পতন (১৯৪১) দেখে যেতে পারেননি। সম্রাট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে (১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট) কবির মহাপ্রয়াণ ঘটে। তবে ‘পারস্যে’ গ্রন্থ এবং তার সমসাময়িক বিভিন্ন চিঠিপত্র বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, রেজা শাহের ওই ধরনের পরিণতির একটা দার্শনিক পূর্বাভাস তিনি অনেক আগেই পেয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের কাছে এশিয়া-ইউরোপের পার্থক্য ছিল শুধু মানচিত্র বা ভূগোলের। কিন্তু মহান আত্মার সম্মিলন ঘটতে কোনোই বাধা ছিল না। তিনি মনে করতেন, মানুষের ওড়ার জন্য পাখির মতো দুটি ডানা দরকার—একটিতে থাকবে তার নিজের দেশের সংস্কৃতি, আর অন্যটিতে থাকবে সমগ্র বিশ্বের আধুনিক শিক্ষা। এই দুইয়ের মিলন হলেই মানুষ সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠতে পারে।
আজ যখন পৃথিবী হিংসা-বিদ্বেষ ও বিভেদের সম্মুখীন, তখন রবীন্দ্রনাথের ভাবনা অন্ধকারে বাতি জ্বালাতে শেখায়। অন্যের সংস্কৃতিকে নিজের করে নিতে শেখায়। তেমনি নিজের সংস্কৃতিকে অন্যের কাছে আপন করাতে শেখায়। তার সাধনা ‘বিশ্বমানব’ হয়ে ওঠার সাধনা। সেখানে কোনো সংকীর্ণতার আশ্রয় নেই।
রবীন্দ্রনাথ এক বিশাল মহীরুহের নাম, যার কাছে শিখি—অজ্ঞানতাই অন্ধকারের নামান্তর। জ্ঞানের আলো জ্বললে অন্ধকার দূর হয়, অন্তর মুক্তি পায়। আর কেবল মুক্ত অন্তরই বয়ে আনতে পারে শান্তির বার্তা।
বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়