এআই কি আমাদের মধ্যে ফারাক বাড়াচ্ছে?

Date:

বৈশ্বিক পরিস্থিতি জানতে নিয়মিত বিশ্বব্যাংকের টেলিযোগাযোগ সম্পর্কিত প্রতিবেদনগুলো পড়ি। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি) গেলে বিশ্বব্যাংক আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি হ্যান্ডবুকের সঙ্গে। পৃথিবীর সেরা আইডিয়াগুলো দিয়ে বানানো একটা হ্যান্ডবুক। টেলিকম রেগুলেশন যে আসলে পিএইচডি-লেভেলের বিষয়, সেটা ওই বইটা পড়ে বুঝেছিলাম। এখন এই বইটা ডিজিটাল সার্ভিস প্রোভাইডারদের হ্যান্ডবুক হিসেবেও পরিচিত।

গত সপ্তাহে সেরকমই একটা মিটিং ছিল বিশ্বব্যাংকে।

আলাপে আলাপে একটা জিনিস পরিষ্কার হলো—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) যত এগোচ্ছে, দুনিয়ায় ডিজিটাল বিভক্তি তত বাড়ছে। এটা নতুন কথা না। কিন্তু, যে গতিতে বাড়ছে সেটা অপ্রত্যাশিত। উচ্চআয়ের দেশগুলোতে প্রতি দুজনের একজন এআই টুল ব্যবহার করে, আর গরিব দেশগুলোতে সেটা প্রায় শূন্যের কোটায়। মানে শুরুর জায়গাটাই ভিন্ন।

কম্পিউটিং পাওয়ারের ছবিটা আরও কঠিন। আমেরিকায় পৃথিবীর সেরা ৫০০টি সুপার কম্পিউটারের মধ্যে ১৭৫টা আছে। আর গরিব দেশগুলোর ভাগে আছে কার্যত শূন্য। উচ্চআয়ের দেশগুলো পৃথিবীর ৮৭ শতাংশ উল্লেখযোগ্য এআই মডেল বানিয়েছে, ৮৬ শতাংশ এআই স্টার্টআপ তাদের, আর ৯১ শতাংশ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডিং তাদের কাছে। অথচ তারা পৃথিবীর মাত্র ১৭ শতাংশ মানুষ।

এই ফারাকটা বোঝার জন্য একটা উদাহরণ দিই।

একই অফিসে দুজন কর্মী। একজন এআই দিয়ে প্রতিবেদন বানায়, তথ্য বিশ্লেষণ করে, ইমেইল লেখে। পাঁচ মিনিটের কাজ। আরেকজন সেটা করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেটে। বছর দুয়েক পরে একজনের পদোন্নতি হবে, আরেকজনকে হয়তো ছাঁটাই করা হবে।

এই পার্থক্যটাকে দেশের স্তরে নিয়ে যান। ইউএনডিপির প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এই পরিস্থিতিতে তৈরি হচ্ছে ‘নেক্সট গ্রেট ডাইভার্জেন্স’, যা সম্ভাব্য একটা নতুন যুগ যেখানে দেশে দেশে বৈষম্য আরও বাড়তে শুরু করবে।

ইতিহাসে একটা ‘গ্রেট ডাইভার্জেন্স’ আগেও এসেছিল শিল্প বিপ্লবের সময়। তখন যে দেশগুলো বাষ্পীয় ইঞ্জিন আর কারখানার সঙ্গে তাল মেলাতে পেরেছিল, তারা এগিয়ে গেল। যারা পারেনি, তারা পিছিয়ে পড়ল এতটাই যে সেই পার্থক্য আজও পূরণ হয়নি—২০০ বছর পরেও না।

এআই বিপ্লব সেই একই গল্প লিখছে। শুধু গতিটা অনেক বেশি। এআইকে গ্রহণ করায় ধীরগতি মানে শুধু দেরি না, প্রতিদিন পিছিয়ে পড়া। একজন আমেরিকান ইঞ্জিনিয়ার এআই দিয়ে এক ঘণ্টায় যা করছে, একজন বাংলাদেশি ইঞ্জিনিয়ার যদি সেটা এক সপ্তাহে করে, তখন দুইজনের আউটপুটের পার্থক্য শুধু সময়ের না, মূল্যের। এই মূল্যের পার্থক্যটা জমতে জমতে একদিন পাহাড় হয়ে যাবে।

এআই যে চাকরিগুলো নিয়ে নেবে, সেগুলোর বেশিরভাগ এখন আছে মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। ডেটা এন্ট্রি, কাস্টমার সার্ভিস, বেসিক অ্যাকাউন্টিং, রুটিন কোডিং—বাংলাদেশের লাখো তরুণ এই ধরনের কাজ করছে। তারা এআই ব্যবহার শেখেনি, কিন্তু এআই তাদের জায়গাটা নেওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে।

উন্নত দেশগুলোতে যারা চাকরি হারাবে, তাদের জন্য রিট্রেনিং প্রোগ্রাম আছে, সামাজিক সুরক্ষা জাল আছে, নতুন এআইকেন্দ্রিক চাকরির সুযোগ আছে। বাংলাদেশে সেটা নেই।

তাহলে কী হবে? চাকরি যাবে, নতুন চাকরি আসবে না, আর সরকারের কাছে সমাধানের রাস্তাও নেই। এটাই ঝুঁকি তৈরি করছে।

ভালো খবর হলো, বিশ্বব্যাংক বলছে, ছোট এআই বা সাধারণ ডিভাইসে চলতে পারে এমন ছোট মডেল উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটা বড় সুযোগ। কৃষি, স্বাস্থ্য, ছোট ব্যবসার মতো খাতে এই ধরনের এআই এখনই কাজে লাগছে। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এটা একটা সুযোগ। এভাবে বড় অবকাঠামো ছাড়াই এআইয়ের কিছু সুবিধা নেওয়া যেতে পারে।

মিটিং থেকে ফেরার পথে ভাবছিলাম একটাই কথা—২০০৭ সালে বিটিআরসিতে থেকে পাওয়া সেই হ্যান্ডবুকটা পড়ে বুঝেছিলাম পৃথিবীটা কোথায় যাচ্ছে এবং ২০২৬ সালের এই মিটিং থেকে বেরিয়ে একই অনুভূতি হচ্ছে। পার্থক্য একটাই—তখন সময় ছিল, এখন আর নেই।

 

রকিবুল হাসান; টেলিকম, অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় মানবিক রাষ্ট্র’ বইয়ের লেখক

Popular

More like this
Related

নগরকান্দায় ২ পক্ষের সংঘর্ষে আহত ১১, বাড়িঘর ভাঙচুর

ফরিদপুরের নগরকান্দায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত...

দীর্ঘ যাত্রা শেষে পৃথিবীর পথে নভোচারীরা

পৃথিবী থেকে প্রায় ৪ লাখ ৬ হাজার ৭৮৮ কিলোমিটার...

কোহলির কারণেই এখন ক্রিকেট অনুসরণ করেন জোকোভিচ!

বিরাট কোহলি—ক্রিকেট বিশ্বের এমন এক নাম যার জনপ্রিয়তা এখন...

৫ তারকার স্মৃতিতে পহেলা বৈশাখ

আজ পহেলা বৈশাখ। নতুন বছরের প্রথম দিনটি বাঙালির জীবনে...