ঋণে জর্জরিত হাওরের কৃষক

Date:

অসময়ের বৃষ্টি আর উজানের ঢলে হাওরের বহু বোরো চাষি আজ নিঃস্ব। একদিকে ফসলের ক্ষতি, অন্যদিকে ধানের দামে ধস—এই দুইয়ে মিলে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

ঋণের ভারে অনেকেই ন্যুব্জ হয়ে পড়েছেন। সেই চাপ সামলে পরিবারের সারা বছরের অন্নসংস্থান নিশ্চিত করা কীভাবে সম্ভব হবে, তা নিয়েই এখন তাদের চরম উৎকণ্ঠা।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশের সাতটি হাওর জেলায় দুই লাখ ৩৬ হাজারের বেশি কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এই জেলাগুলো হলো—সিলেট, সুনামগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ।

সাধারণত শুষ্ক মৌসুমে সেচের ওপর নির্ভর করে বোরো ধানের আবাদ করা হয়। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে এই চারা রোপণ করা হয় এবং এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে ধান কাটা হয়।

বাংলাদেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশই আসে এই বোরো ফসল থেকে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্প্রসারণ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. সেলিম খান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘প্রতি বছর মৌসুমের মধ্যেই ফসল কাটার কাজ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এবার বাঁধ ভেঙে যাওয়া আর এপ্রিলে অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।’

তিনি আরও জানান, হাওরাঞ্চলের মোট ফসলি জমির প্রায় ১১ শতাংশ বা ৪৯ হাজার ৭৩ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া আরও সাড়ে ১৭ শতাংশ জমির ফসল ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, এই সাতটি হাওর জেলায় মোট চার লাখ ৫৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছিল, যার মধ্যে এ পর্যন্ত ৮০ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষতির পরিমাণ টাকার অংকে প্রায় এক হাজার ৪৭ কোটি টাকা।

সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের জন্য জরুরি সহায়তা কার্যক্রম শুরু হবে এবং তা পরবর্তী তিন মাস পর্যন্ত চলবে।

জাতীয় পর্যায়ে বোরো আবাদের পরিধি গত বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫০ দশমিক ৫০ লাখ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে।

এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ দশমিক ২৪ কোটি টন। এর আগে, ২০২২ অর্থবছরের ২ দশমিক ০১ কোটি টন থেকে উৎপাদন বেড়ে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষ মৌসুমে ২ দশমিক ১৩ কোটি টনে দাঁড়িয়েছিল।

ঋণের বোঝা আর হতাশা

এই প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে দ্য ডেইলি স্টার হাওরাঞ্চলের সাতটি জেলার ৪০ জনেরও বেশি কৃষকের সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের মধ্যে ২৫ জনেরও বেশি কৃষক জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি তাদের ঋণের এক অন্তহীন জালে বন্দি করে ফেলেছে।

নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি উপজেলার মুলাদাইর হাওরের কৃষক বিধান সরকার জানান, তার পাঁচ একর জমির পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের হাওর এলাকায় বছরে মোটে একটা ফসল হয়। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা আর চিকিৎসা খরচসহ সারা বছরের সব পারিবারিক খরচ মেটাতে আমরা এই ধান বিক্রির টাকার ওপরই ভরসা করে থাকি।’

কোমর সমান পানিতে দাঁড়িয়ে কোনোমতে নিজের ভাগের কিছু ধান কাটেন তিনি। বাকি ধান কাটার জন্য দিনমজুর লাগালেও তাদের মজুরি মেটাতে গিয়ে ভেজা ধান মাত্র ৬০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করতে বাধ্য হন। অথচ এই দাম উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম।

ধান চাষের জন্য তিনি ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। বিধান বলেন, ‘এখন ঘরে যে ধান আছে, তা দিয়ে পরিবারের খাবারই জুটবে না। ওদিকে পাওনাদার (মহাজন) টাকা শোধের জন্য জমি বিক্রি করার চাপ দিচ্ছে। জমি বিক্রি করা ছাড়া আমার আর কোনো পথ খোলা নেই।’

মদন উপজেলার ফুলু মিয়া দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন, যা সুদে-আসলে ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা শোধ করার কথা ছিল। তিনি বলেন, ‘এখন ধান বিক্রি করে সেই ঋণ শোধ করার কোনো উপায় নেই। আসল টাকাটা কোনোভাবে দিলেও সুদের বাকি ৬০ হাজার টাকা ঋণের বোঝাই থেকে যাবে।’

বারহাট্টা উপজেলার শামীম মিয়া সুদে ৫০ হাজার টাকা ধার নিয়ে দুই একর জমি লিজ নিয়েছিলেন। কথা ছিল, ধান কাটার পর সুদে-আসলে ৭০ হাজার টাকা শোধ করবেন। কিন্তু তার চাষ করা জমির ৪০ শতাংশই এখন পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

‘আমি অবশিষ্ট ফসল কাটতে হিমশিম খাচ্ছি। ধান খুব ভালো হয়েছিল, ভেবেছিলাম আমার অংশ হিসেবে প্রায় ১০০ মণ ধান পাব। ঋণদাতার টাকা শোধ করার পরও আমি এই ধান দিয়ে চার থেকে পাঁচ মাস আমার পরিবারের খরচ চালাতে পারতাম,’ তিনি বলেন।

‘এখন অবশিষ্ট ধান বিক্রি করলেও আমি ঋণ শোধ করতে পারব না। আমাকে আবার ঋণ নিতে হবে,’ তিনি যোগ করেন।

নেত্রকোনার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আমিরুল ইসলাম বলেন, জেলায় ভারী বর্ষণে প্রায় ৮০ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের সৈয়দ আহমেদ অর্ধেক জমি ইজারা নিয়ে মোট ১ দশমিক ২ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করেছিলেন। তিনি ১০০ মণের বেশি ধান আশা করেছিলেন। কিন্তু ৫০ মণ রক্ষা করতে পেরেছেন।

ইজারা নেওয়া জমির ফসলের অর্ধেক অবশ্যই জমির মালিককে দিতে হবে।

‘আমার পরিবারের জন্য অন্তত ৭০ মণ ধান দরকার। তাছাড়া, ৩০ হাজার টাকা ঋণের বিপরীতে আমাকে ৩৬ হাজার টাকা শোধ করতে হবে।’

‘এই বছর এক মেয়ের বিয়ে বাকি থাকায় সংকট অসহনীয় হয়ে পড়েছে। প্রতি মণ ৭০০ টাকা দরে ধান বিক্রি করে আমি ঋণ ও সুদও শোধ করতে পারছি না। আগামী মৌসুমে আমাকে আরেকটি ঋণ নিতে হবে,’ তিনি বলেন।

কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার আক্কাস মিয়া ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ছয় হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করেছেন। সুদে-আসলে তাকে নয় লাখ টাকা শোধ করতে হবে।

‘এ পর্যন্ত আমি এক কেজি ধানও ঘরে তুলতে পারিনি। ঋণের দুশ্চিন্তায় এখন আমার রাতে ঘুম নেই,’ তিনি বলেন।

কিশোরগঞ্জে ১৩ হাজার ৪৭৯ হেক্টর ধানক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে, এতে ৫২ হাজার ৫০০ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. সাদিকুর রহমান জানান, জেলায় ফসলের ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৩০০ কোটি টাকা।

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার কাউয়াদিঘি হাওরের সুমন নমশূদ্র ৬০০ মণ ধান পাওয়ার আশায় দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন।

ক্ষতির পর আশঙ্কা, তিনি মাত্র ৫০ মণ ধান উদ্ধার করতে পারবেন।

‘গত ১৫ বছরে আমি এমন বিপর্যয় দেখিনি,’ তিনি বলেন। ‘মহাজনদের চাপে এখন আমার পক্ষে বাড়িতে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।’

৩ মাসের সহায়তা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল ক্ষতিগ্রস্ত হাওর কৃষকদের সহায়তায় জরুরি পদক্ষেপ নিতে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন।

সচিবালয়ে এক বৈঠকে তিনি কর্মকর্তাদের প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের শনাক্ত করে একটি সঠিক ও স্বচ্ছ তালিকা তৈরির নির্দেশ দেন বলে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং এক বিবৃতিতে জানিয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু এর আগে ঘোষণা দিয়েছিলেন, একটি বিশেষ কার্ড সিস্টেমের মাধ্যমে তিন মাসের জন্য খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও অর্থনীতিবিদ আবদুল বায়েস সতর্ক করে বলেছেন, কেবল খাদ্য সহায়তা এই সংকট সমাধান করবে না।

তিনি বলেন, ‘মূল উদ্বেগের বিষয় হলো, ফসল কাটার পর বা ফসলহানির শিকার হয়ে কৃষকরা কীভাবে চাষাবাদ সংক্রান্ত ঋণ শোধ করবেন।’

তিনি এই বোঝা লাঘব করতে ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ, কিস্তি-ভিত্তিক পরিশোধ বা সুদ মওকুফের মতো পদক্ষেপের পরামর্শ দেন।

[মিন্টু দেশোয়ারা এবং তাফসিলুল আজিজ এই প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন]

Popular

More like this
Related

ধানের দাম আরও কমেছে, বিপাকে হাওরের কৃষকেরা

টানা বৃষ্টি ও মেঘলা আকাশের কারণে ফসল শুকাতে পারছেন...

ভারত ও চীনে বিশ্বকাপ সম্প্রচার নিয়ে অনিশ্চয়তা

বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দুই দেশ ভারত ও চীনে ২০২৬...

রেশন পাচার মামলায় নুসরাত জাহানকে তলব

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অভিনেত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের  (টিএমসি) সাবেক এমপি...

আর্টেমিস-২ মিশন: চাঁদের যে অংশ এবারই প্রথম দেখবে মানুষ

আর্টেমিস-২ মিশনে চার নভোচারী চাঁদ প্রদক্ষিণ করে এমন অঞ্চল...