২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে উদ্বেগ বাড়িয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কার কথা জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, উত্তর আমেরিকার তিন দেশে আয়োজিত এই আসর ‘দমন-পীড়নের মঞ্চে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
সোমবার প্রকাশিত ‘হিউমিনিটি মাস্ট উইন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে লন্ডনভিত্তিক এই মানবাধিকার সংস্থা আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো এবং ফিফাকে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে সমর্থক, খেলোয়াড় এবং সংশ্লিষ্ট সবার নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা যায়।
ফিফা আগে থেকেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, এমন একটি বিশ্বকাপ আয়োজন করা হবে, যেখানে সবাই নিরাপদ, অন্তর্ভুক্ত এবং নিজেদের অধিকার চর্চায় স্বাধীন বোধ করবে। তবে অ্যামনেস্টির দাবি, বাস্তব পরিস্থিতি সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে ‘স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক’, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে মোট ১০৪ ম্যাচের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘মানবাধিকার জরুরি পরিস্থিতির’ মধ্যে থাকা দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশেষ করে ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সময়কার নীতির প্রেক্ষাপটে। সেখানে ব্যাপক অভিবাসী বহিষ্কার, নির্বিচার গ্রেপ্তার এবং ‘প্যারামিলিটারি ধাঁচের’ ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) অভিযানের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্বকাপের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে আইসিই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও সম্প্রতি সংস্থাটির এক ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জানিয়েছেন। অথচ মিনিয়াপোলিসে চলতি বছরের জানুয়ারিতে আইসিই অভিযানের প্রতিবাদে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া দুই মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনার পর বিষয়টি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে।
অ্যামনেস্টি আরও বলেছে, আয়োজক শহরগুলোর প্রকাশিত পরিকল্পনায় কোথাও উল্লেখ নেই, আইসিই অভিযানের মতো পরিস্থিতি থেকে কীভাবে সমর্থক বা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া হবে।
এছাড়া অংশগ্রহণকারী চার দেশ—আইভরি কোস্ট, হাইতি, ইরান ও সেনেগালের সমর্থকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকির কথাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। একই সঙ্গে ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের এলজিবিটিকিউ প্লাস সমর্থক গোষ্ঠীগুলো নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচ দেখতে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, বিশেষ করে ট্রান্সজেন্ডার সমর্থকদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কারণে।
অ্যামনেস্টি সতর্ক করে বলেছে, ‘ফিফা যেভাবে এটিকে “মাঝারি ঝুঁকির” টুর্নামেন্ট হিসেবে মূল্যায়ন করেছিল, বাস্তবে তা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার এই ব্যবধান কমাতে এখনই জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন।’
এদিকে ফিফা চলতি মাসের শুরুতেই জানিয়েছে, ৪৮ দলের এই আসর নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ীই অনুষ্ঠিত হবে এবং সব দল অংশ নেবে। যদিও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ট্রাম্পকে নতুন চালু করা ‘পিস প্রাইজ’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনার মুখে পড়ে ফিফা। এদিকে পুরো টুর্নামেন্ট চক্র থেকে সংস্থাটির প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
অ্যামনেস্টির অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার বিভাগের প্রধান স্টিভ ককবার্ন বলেন, ‘ফিফা যখন রেকর্ড পরিমাণ আয় করছে, তখন সমর্থক, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, খেলোয়াড়, সাংবাদিক ও শ্রমিকদের যেন সেই মূল্য দিতে না হয়। ফুটবল আসলে তাদেরই সরকার, স্পন্সর বা ফিফার নয়।’
আগামী ১১ জুন মেক্সিকো সিটির স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের পর্দা উঠবে এবং ১৯ জুলাই নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালের মধ্য দিয়ে পর্দা নামবে এই আসরের।