এ দেশের চলচ্চিত্রের সাদাকালো যুগের নায়ক আজিম। একাধারে তিনি ছিলেন নায়ক, পরিচালক ও প্রযোজক। ষাট ও সত্তর দশকের এই নায়ক রোমান্টিক, সামাজিক ও লোককাহিনি নির্ভর সিনেমায় অভিনয় করে সব শ্রেণির দর্শকের মন জয় করেছিলেন। আজ এই নায়কের প্রয়াণ দিবস। ২০০৩ সালের এই দিনে তিনি না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
অনেকগুলো সিনেমায় অভিনয় করে আজিম স্মরণীয় হয়ে আছেন। সুজাতা, কবরী, শবনমসহ অনেক নায়িকার বিপরীতে তিনি অভিনয় করেছেন। রুপালি পর্দায় তার অনবদ্য অভিনয় আজও দর্শকদের হৃদয়ে গেঁথে আছে।
বিশেষ করে নায়িকা সুজাতার বিপরীতে ‘ডাকবাবু’, ‘মালা’, ‘ভেলুয়া সুন্দরী’, ‘আমির সওদাগর’, ‘মধুমালা’, ‘রাখাল বন্ধু’সহ বেশ কয়েকটি সিনেমায় তিনি নায়ক হয়েছিলেন। একসঙ্গে অভিনয় করতে গিয়েই দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা পরে বিয়ের মাধ্যমে পরিণতি পায়।
চলচ্চিত্র অঙ্গনে আজিমের হাত ধরে অনেকেই অভিনয়ে ও পরিচালনায় এসেছেন। সবার জন্য তার ভালোবাসার হাত বাড়ানো থাকত। ঢাকাই চলচ্চিত্রে সবার বন্ধু ছিলেন তিনি।
বিখ্যাত পরিচালক এহতেশামের ‘রাজধানীর বুকে’ সিনেমা দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় আজিমের। এরপর একসময় তিনি হয়ে ওঠেন এ দেশের সিনেমার অন্যতম দর্শকপ্রিয় নায়ক। কবরী, সুজাতাসহ অনেক নায়িকার বিপরীতে অভিনয় করে ব্যাপক সাড়া ফেলেন। এখানো তার অভিনীত পুরোনো সাদাকালো সিনেমাগুলো বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে দেখানো হয়।
কবরীর বিপরীতে ‘সন্তান’ সিনেমায় তার অভিনয় বেশ প্রশংসিত হয়েছিল। এই সিনেমার একটি গান আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে—‘তোমারই রূপে এত যে আলো’। গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন খন্দকার ফারুক আহমেদ।
আজিমের ঠোঁটে আরও একটি গান সে সময় তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। ‘বেদের মেয়ে’ সিনেমার সেই গানটি ছিল ‘বাবু সালাম বারে বার’। এতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন আবদুল আলীম ও নীনা হামিদ।
এ ছাড়া ‘অবাঞ্ছিত’ সিনেমার ‘ওরে মন পাপিয়া’ গানটি একসময় সিনেমাপাড়ায় খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। একই সিনেমার আরও দুটি গান দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। বশির আহমেদের কণ্ঠে ‘চোখ ফেরানো যায় গো, তবুও মন ফেরানো যায় না’ এবং ‘প্রিয়তম তুমি এলে, তুমি এলে জীবনে মধুময় লগনে’ গান দুটি সে সময় তরুণ-তরুণীদের হৃদয় কেড়ে নিয়েছিল।
ছোট চরিত্র দিয়ে সিনেমায় এলেও একসময় বিপুল সাড়া ফেলেন আজিম। ‘নতুন সুর’ সিনেমায় তিনি ছিলেন খলনায়ক। এরপরই নায়ক হিসেবে কাজের প্রস্তাব আসতে শুরু করে এবং একসময় তিনি সফল নায়ক বনে যান।
চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও আজিম সফলতা পেয়েছিলেন। তার পরিচালিত সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘টাকার খেলা’, ‘প্রতিনিধি’, ‘জীবন মরণ’, ‘গাদ্দার’, ‘বদলা’ ও ‘দেবর ভাবি’। এর মধ্যে ‘প্রতিনিধি’ সিনেমাটি দারুণ আলোচিত হয়েছিল।
ঢাকাই সিনেমার অনেকের মতেই, নায়ক আজিম একজন অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন। বরেণ্য অভিনেতা সোহেল রানা বলেন, ‘একজন ভালো মানুষ হিসেবে আজিম সাহেবের খ্যাতি ছিল। চলচ্চিত্রের জন্য তার অবদান অনেক। চলচ্চিত্রকে তিনি সমৃদ্ধ করে গেছেন।’
আজিমের পুরো নাম নূরুল আজিম খালেদ। তার জন্ম ১৯৩৭ সালের ২৩ জুলাই বৃহত্তর সিলেটের হবিগঞ্জে। বাবা মুন্সেফ হওয়ার কারণে তার ছেলেবেলা নানা জায়গায় কেটেছে। পরে তিনি ঢাকায় স্থায়ী হন।
২০০৩ সালের ২৬ মার্চ ৬৬ বছর বয়সে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে একটি হাসপাতালে মারা যান এই বরেণ্য অভিনেতা।