সবাইকে সাহসী করে তুলেছিল যে ভাষণ

Date:

এই জাতির মুক্তি-সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণটি আমাদের স্মরণ করতে হবে। এই ভাষণ আমাদের ঐক্যবদ্ধ করেছিল, নানা বিভ্রান্তির মধ্যেও দিকনির্দেশনা দিয়েছিল, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি জাগিয়ে তুলেছিল, অবাধ্য হওয়ার সাহস ও আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল এবং এমন এক চেতনা উন্মুক্ত করেছিল, যা আমাদেরকে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের জন্য প্রস্তুত করেছিল। সেখানে উপস্থিত ও রেডিওতে শোনা সবার মধ্যে সেই ভাষণের শব্দগুলোর তীক্ষ্ণ শক্তি, কণ্ঠের বিজয়ী উদ্দীপনা, বক্তৃতার ছন্দ ও তেজের স্রোত ছড়িয়ে পড়েছিল।

ভাষণটি মুহূর্তেই হতাশ জনগণকে সাহস, দৃঢ়তা ও বীরত্বে ঐক্যবদ্ধ এক দুর্গে পরিণত করেছিল। তাদের সামনে তখন ছিল মাতৃভূমিকে মুক্ত করার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার স্পষ্ট ও তাৎক্ষণিক লক্ষ্য। সেই দিনের কোনো তুলনা হয় না, সেই মুহূর্ত কল্পনা করা যায় না, সেই সময়ের পুনরাবৃত্তি হবে না, সেই ভাষণ অনুকরণ করা যায় না এবং এর ফলাফল বোঝা যায় কেবল বাংলাদেশের জন্মের আলোকে।

অনেকেই ভাষণটি শুনে সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি করতে পারেননি। কিন্তু, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা অনুভব করেছি যে পৃথিবীর বুকে আমাদের প্রাপ্য স্থান অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় সব নির্দেশনাই সেই ভাষণে ছিল। যখন আমরা সম্পূর্ণ অচেনা পরিস্থিতির মুখোমুখি, তখন সেই ভাষণ আমাদের দিকনির্দেশনা দিয়েছে। যখন মৃত্যু সম্ভাবনার মুখোমুখি, তখন সেই ভাষণ আমাদের হৃদয় ও মনে আত্মত্যাগের চেতনা জাগিয়েছে। সেই ভাষণই বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছাড়াই অজানার পথে ঝাঁপিয়ে পড়ার সাহস আমাদের দিয়েছে।

এই ভাষণের প্রশংসা করতে গেলে অবশ্যই আমরা সেই মানুষটিকেও স্মরণ করি। কিন্তু, তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই ভাষণ আমাদের যে গৌরব অর্জনে সহায়তা করেছে তার উজ্জ্বলতায় আমরা আলোকিত হই। বাঙালিদের নিয়ে নানা ধরনের কথা প্রচলিত ছিল—তারা সবসময় ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে না, একসঙ্গে কাজ করতে পারে না, এমনকি কোনো হুমকি বা বিপদের মুখে দাঁড়ানোর সাহস তাদের নেই। কিন্তু এই ভাষণ আমাদের শত্রুদের জানান দিয়েছিল যে আমরা ভীত নই, আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারি এবং আমরা প্রতিরোধ করতে প্রস্তুত।

ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে বছরের পর বছর আমরা যে নির্যাতন সহ্য করেছি সেটা যারা দেখেননি, তাদের পক্ষে এই ভাষণের মানসিক প্রভাব পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। যখন মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়, তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মনের শক্তি ও সাহস। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ সেই সাহস জুগিয়েছে। যারা ভাষণটি শোনেননি, তাদের জন্য এর মূল্য বোঝা কঠিন হতে পারে। কিন্তু যেসব মুক্তিযোদ্ধা এই ভাষণকে হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন এবং যারা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে বারবার এটি শুনেছিলেন, তাদের কাছে এটি ছিল অমূল্য এবং আমাদের অনুপ্রাণিত করে রাখার শক্তি ছিল স্পষ্ট।

যারা সেদিন রমনা রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত ছিলাম, প্রত্যেকেরই নিজস্ব স্মৃতি রয়েছে। সেই স্মৃতি মনে পড়লে আজও আমাদের রক্ত উষ্ণ হয়ে ওঠে এবং সেই গর্বের অনুভূতি স্বাভাবিকভাবেই আমাদের শির উচ্চ করে তোলে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য লাখো মানুষের ঢল সেই দিনটিকে আসন্ন সংগ্রামে আমাদের অংশগ্রহণকে স্বতঃস্ফূর্ত করে তোলার এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে পরিণত করে।

লাখো মানুষের সেই সমাবেশ আমাদের মাঝে এক তুলনাহীন শক্তি ও অনন্য অনুভূতি জাগিয়েছিল যে, কোনো শক্তিই আমাদের দমিয়ে রাখতে পারবে না। কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর, ফেরিওয়ালা, ছোট দোকানদার, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিভিন্ন মতাদর্শ ও রাজনৈতিক চেতনার কর্মীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ সেই সমাবেশে উপস্থিত হয়েছিলেন। এরপর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যখন বঙ্গবন্ধু আমাদের এমন এক ভবিষ্যতের পথে যাত্রা শুরু করালেন—যেখানে আমরা স্বাধীন হব, হাসতে পারব, খেলতে পারব, বাঁচতে পারব এবং বেড়ে উঠতে পারব নিজের দেশে।

তার সেই ভাষণ বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর তালিকায় স্থান করে নিয়েছে এবং ইতিহাস বদলে দেওয়া ভাষণ হিসেবে ইউনেস্কোর ঐতিহ্য তালিকায় স্বীকৃতি পেয়েছে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একইসঙ্গে এই ভাষণ এক পরম গর্বের অমোচনীয় অংশ। সেই গর্ব আমরা অনুভব করি এমন এক দেশের নাগরিক হিসেবে, যে দেশ গড়ে উঠেছে লাখো নারী-পুরুষ, তরুণ ও শিশুর আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে—যারা হয়েছিলেন বাঙালিদের ওপর চালানো অকল্পনীয় নির্মমতার শিকার।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের জনগণের কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ম্যান্ডেট পান। প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান সেটা মেনে নিয়ে তাকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীও ঘোষণা করেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে শুরু হয় ষড়যন্ত্র। পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়া জুলফিকার আলী ভুট্টো এতটাই অহংকারী ও আত্মকেন্দ্রিক ছিলেন যে, শেখ মুজিব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন, সেটা তিনি মেনে নিতে পারেননি। কয়েকজন পাকিস্তানি জেনারেলের সঙ্গে মিলে তিনি শেখ মুজিবের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ বন্ধ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। ভুট্টো সিন্ধুর লারকানায় নিজের বাড়িতে ইয়াহিয়াকে নিয়ে যান এবং সেখানে কয়েকদিন ধরে চেষ্টা করে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার জন্য তাকে রাজি করান। ১ মার্চ ইয়াহিয়া তার প্রথম অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। এর মধ্য দিয়েই বাঙালিদের বৈধ ক্ষমতার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার চূড়ান্ত অধ্যায় শুরু হয়।

বঙ্গবন্ধু সঙ্গে সঙ্গেই অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন এবং ঘোষণা দেন, ৭ মার্চ রমনা রেসকোর্স ময়দান থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। এর মধ্য দিয়েই ঐতিহাসিক সেই ভাষণের মঞ্চ প্রস্তুত হয়।

আমরা বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই সমাবেশের প্রচারণায় কাজ শুরু করি। মানুষকে এই সমাবেশে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাতে আমাদের সামনে আর কোনো উপায় না থাকায় সড়কে বিক্ষোভ, সমাবেশ, মিছিল ও পথসভা করতে শুরু করি।

আমরা ডজন ডজন ট্রাক জোগাড় করেছিলাম। এর বেশিরভাগই আমাদেরকে ধার দেওয়া হয়েছিল। ট্রাকগুলোর পেছনে কয়েকটি মাইক ও একজন তবলাবাদকের সঙ্গে শিল্পীদের বসানো হতো এবং তাদের সঙ্গে থাকতেন রাজনৈতিক কর্মীরা। আমরা সেই ট্রাক নিয়ে ব্যস্ত সড়কের মোড় ও পার্কগুলোতে যেতাম। শিল্পীরা দেশাত্মবোধক গান গাইতে শুরু করলে মানুষ জড়ো হতো। ভিড় যথেষ্ট বড় হলে আমরা গান থামিয়ে বক্তৃতা শুরু করতাম, মানুষকে মহাসমাবেশের কথা জানাতাম, এর গুরুত্ব তুলে ধরতাম এবং উপস্থিত জনসাধারণের প্রশ্নের উত্তর দিতাম।

প্রতিদিন সকালে আমরা টিচার্স-স্টুডেন্টস সেন্টারে (টিএসসি) জড়ো হতাম। সেখান থেকে শহরের বিভিন্ন এলাকায় মিছিলের জন্য আমাদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হতো। ৬ মার্চের মধ্যে আমরা পুরো শহর কয়েকবার ঘুরে ফেলি এবং শত শত মিছিল, সমাবেশ ও পথসভা করি।

আগের দিনের মতোই ৭ মার্চ সকাল ৯টার দিকে ইস্ট পাকিস্তান স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (ইপিএসইউ) আমরা সবাই টিএসসিতে জড়ো হই এবং সাড়ে ১০টার দিকে রেসকোর্সে (স্বাধীনতার পর যার নাম হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পৌঁছাই। বিশাল মাঠের উত্তর প্রান্তে মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। আমরা পৌঁছাতে পৌঁছাতে মাঠের প্রায় অর্ধেক ভরে গিয়েছিল। দ্রুতই সেই জনসমুদ্র গিয়ে ঠেকলো একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে হাইকোর্টের কাছাকাছি। আমাদের জায়গা হলো মাঠের মাঝামাঝি।

অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা সেই জনসমুদ্র দ্রুত বাড়তে দেখলাম। আমার মনে আছে, চারদিক থেকে অন্তহীন মিছিলের স্রোত মাঠে ঢুকছিল। লাখো মানুষ প্রবল আবেগে স্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে আসছিল। মাঠে এসেও তারা স্লোগান দিতে থাকে। কিছুক্ষণ পর তারা দলবদ্ধভাবে গান গাইতে শুরু করে এবং আমরা সবাই তাতে যোগ দিই। এক অবর্ণনীয় আনন্দ ও গর্বের অনুভূতি ছড়িয়ে পড়েছিল। আমরা একত্রিত হয়েছিলাম ‘শত্রুর’ বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং বিশ্বকে আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামের কথা জানাতে।

বঙ্গবন্ধু যখন সেখানে পৌঁছালেন, তখন চেতনায় ঐক্যবদ্ধ, সাহসে উজ্জীবিত ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর এক বিশাল জনসমুদ্রের অংশ হিসেবে আমরাও উপস্থিত। সিঁড়ি বেয়ে মঞ্চে ওঠার সময় তিনি দেখেছিলেন, ১০ লাখেরও বেশি মানুষ গভীর আগ্রহ নিয়ে তার অপেক্ষায়। জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা পঞ্চাশ বছর বয়সী এক নেতা সেই মঞ্চে এমন কিছু বলার জন্য দাঁড়ান, যা আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে এবং ইতিহাসে আমাদের স্থান নিশ্চিত করবে।

তার ভাষণ আজ সারা বিশ্বের কাছে পরিচিত এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি গর্বিত নাগরিকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। ইতিহাস সৃষ্টিকারী অন্যান্য নেতাদের মতো বঙ্গবন্ধুও ভুলের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। তাদের অনেকের মতোই তিনিও কিছু ক্ষেত্রে ভুল করেছেন এবং এমন পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা মানুষের জন্যে সবসবময়ে কল্যাণকর হয়নি। জাতি হিসেবে আমাদের ৫৫ বছরের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুকে মূল্যায়ন করতে হবে তার সামগ্রিকতার আলোকে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক হাওয়া বদলের মধ্য দিয়ে সদ্য তৈরি হওয়া ইতিহাসবিদ নয়, বরং বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ ইতিহাসবিদদেরই বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে চূড়ান্ত মূল্যায়ন করতে দেওয়া উচিত। সাময়িক রাজনৈতিক বর্ণনায় ইতিহাসকে আচ্ছন্ন করতে দেওয়া যাবে না।

মাহফুজ আনাম: সম্পাদক ও প্রকাশক, দ্য ডেইলি স্টার

Popular

More like this
Related

নেপালে বিপুল বিজয়ের পথে ‘র‍্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ’ বালেন্দ্র শাহ

নেপালের রাজনীতিতে বড় চমক নিয়ে আসছেন র‍্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ...

সায়েন্স ল্যাবে ট্রাকচাপায় মোটরসাইকেলে থাকা বাবা-মেয়ের মৃত্যু

রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় এলাকায় ট্রাকচাপায় মোটরসাইকেল আরোহী বাবা...

শ্রীপুরে স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রীকে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ

গাজীপুরের শ্রীপুরে স্ত্রীকে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ উঠেছে স্বামীর বিরুদ্ধে।শুক্রবার...

যুদ্ধ শেষ করতে কিছু দেশ মধ্যস্থতার চেষ্টা শুরু করেছে: ইরান প্রেসিডেন্ট

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রথমবারের মতো বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও...