‘শান্তিতে নোবেল প্রত্যাশী’ ট্রাম্প কেন যুদ্ধে নামলেন

Date:

গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র সময় বিকেলে এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর নির্দেশ দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। টেক্সাসের ‘আমেরিকান এনার্জি ডমিন্যান্স’ নামে একটি অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে যাচ্ছিলেন তিনি।

তিন ঘণ্টার ফ্লাইটে টেক্সাসের রিপাবলিকান রাজনীতিকদের সঙ্গে ইরানে সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করছিলেন ট্রাম্প। সেখানে ছিলেন টেক্সাস রাজ্যের দুই কট্টরপন্থী সিনেটর জন করনিন ও টেড ক্রুজ।

অপারেশন এপিক ফিউরি শুরুর সময় ওই বিমানে উপস্থিত ছিলেন অভিজ্ঞ চলচ্চিত্র তারকা ডেনিস কোয়েইডও।

ফ্লাইটের একপর্যায়ে টেড ক্রুজ একটি ভিডিও ধারণ করেন। সেখানে অভিনেতা ডেনিস কোয়েইডকে ট্রাম্পের পাশে বসে থাকতে দেখা যায়। ২০২৪ সালের এক বায়োপিকে তার অভিনীত রোনাল্ড রিগানের চরিত্রটি কোয়েইডকে আবারও করে দেখাতে অনুরোধ করেন ক্রুজ।

এরপর রিগানের কণ্ঠস্বর অনুকরণ করে কোয়েইড বলেন, ‘ট্রাম্প আমারই শক্তিশালী সংস্করণ।’ এটি ছিল রিপাবলিকান কট্টরপন্থীদের প্রতীকী অভিভাবক রিগান থেকে বর্তমান নায়ক ট্রাম্পের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতীকী এক নাটকীয় মুহূর্ত।

তবে, ২০০৬ সালের ‘আমেরিকান ড্রিমজ’ চলচ্চিত্রে যুদ্ধংদেহী ও তেললোভী উপদেষ্টাদের প্ররোচনায় ইরাক আক্রমণকারী জর্জ ডব্লিউ বুশের একটি প্রহসনধর্মী চরিত্রে কোয়েইডের অভিনয়ের বিষয়টি এখানে তোলা হয়নি।

মধ্যপ্রাচ্যে গত সপ্তাহের ঘটনাবলীর পর ট্রাম্পের মধ্যে বুশের ছায়া স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যদিও অবশ্যম্ভাবী এই তুলনাগুলো হোয়াইট হাউস প্রত্যাখ্যান করেছে।

কিন্তু ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণায় নিজেকে এমন এক নেতা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন যিনি যুদ্ধের অবসান ঘটাবেন। আফগানিস্তান, ইরাকসহ বিভিন্ন স্থানে বুশ যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। সেই পথে না যাওয়ার অঙ্গীকার ছিল তার বক্তব্যে।

বিদেশি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার বিরোধিতা করে ট্রাম্পের ‘মাগা’ বা মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। আর ২০২৫ সালের বড় একটি সময় নিজেকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করার প্রচারণায় ব্যয় করেছিলেন তিনি।

কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই সেই ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ বুশের পর বড় কোনো যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া প্রথম মার্কিন নেতায় পরিণত হন। সেটিও আবার ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে।

বিদেশি শক্তিশালী নেতাদের প্রতি ট্রাম্পের দুর্বলতা, নজর ঘোরানোর দক্ষতা, এক জেদি প্রতিপক্ষ এবং সক্রিয় সামরিক যন্ত্রের অধিকারী হওয়ার মতো নানাবিধ কারণ অপারেশন ‘এপিক ফিউরির’ আগে এই দৃশ্যত পরিবর্তনের পেছনে কাজ করেছে।

বাস্তবে ট্রাম্পের এই যাত্রাপথ যতটা দীর্ঘ মনে হয়েছিল, ততটা ছিল না। যুদ্ধের প্রতি তার বিরোধিতা ছিল আংশিক। বৃহৎ আকারের স্থলযুদ্ধের বিরুদ্ধে তিনি অবস্থান নিলেও শত্রুকে শাস্তি দিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল বিমানশক্তি ব্যবহার করতে তিনি সবসময় তৈরি ছিলেন।

প্রথম মেয়াদে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরানের সবচেয়ে প্রভাবশালী জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার মাধ্যমে তিনি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়েছিলেন। গত জুনে অপারেশন ‘মিডনাইট হ্যামারে’ ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতেও বোমা হামলা চালান।

দ্বিতীয় মেয়াদে এসে ট্রাম্প যেন তার হাতে থাকা বিপুল সামরিক সক্ষমতার মোহে মুগ্ধ হয়ে পড়েছেন।

চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী কোনো মার্কিন সেনার প্রাণহানি ছাড়াই ভেনেজুয়েলায় গভীর রাতের অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পথে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

অভিযানটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। মাদুরোর ঘাঁটিতে যাওয়ার সময় একটি হেলিকপ্টারের পাইলট একাধিকবার গুলিবিদ্ধ হয়েও বিমানটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখেন। হেলিকপ্টারটি ভেঙে পড়ে ভেতরে থাকা সবাই নিহত হলে অভিযানটি বাতিল হয়ে যেতে পারত। ট্রাম্প সম্ভবত সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আগ্রহও হারিয়ে ফেলতেন।

কিন্তু বাস্তবে মাদুরোকে অপহরণ অভিযানটি ট্রাম্পের জন্য টেলিভিশনে দেখানোর উপযোগী সফলতা হয়ে ওঠে। এই ঘটনা তার দেশের ভেতরে জমতে থাকা সংকট থেকে মনোযোগও সরিয়ে দেয়। বিশেষ করে কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিনের নথি প্রকাশের জন্য তার প্রশাসনের ওপর যে চাপ বাড়ছিল, তা থেকে মনোযোগ ঘুরে যায়।

ওই নথিতে প্রেসিডেন্টের নাম ৩৮ হাজারেরও বেশি বার এসেছে। তবে এ বিষয়ে কোনো ধরনের অনিয়মের অভিযোগ তিনি ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করে আসছেন।

বিদেশে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া ছিল আকর্ষণীয় ঘটনা। কিন্তু ইরানের পারমাণবিক বা সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমিত হামলার বদলে শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে সর্বাত্মক হামলার সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের জন্য এক বিশাল ঝুঁকিই ছিল।

যুদ্ধ শুরুর সময় ও পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্ধারণ করতে পেরেছেন। কিন্তু যুদ্ধ কখন শেষ হবে, তা অন্যরাও নির্ধারণ করতে পারবে। বিশেষ করে এখন যুদ্ধ শেষ হওয়া না হওয়ার বিষয়টি ইরানের শাসকগোষ্ঠীর ওপরও নির্ভর করছে।

শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে ট্রাম্পকে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ফ্লোরিডার মার-আ-লাগোতে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলোতে আবারও ইসরায়েলি হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন চান তিনি।

ট্রাম্প শুরুতে শুধু সমর্থন দিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে পরিসর বেড়ে তা ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতনের জন্য যৌথ হামলার অঙ্গীকারে পরিণত হয়।

মাদুরো অভিযানের সফলতা ট্রাম্পের সামরিক আকাঙ্ক্ষা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছিল। ইরানের ভেতরের ঘটনাবলিও এতে প্রভাব ফেলেছিল। ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন। ইরানকে ‘চড়া মূল্য’ দিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে তখন এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অবস্থানে তিনি ছিলেন না।

ওই সময় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিমানবাহী রণতরী ছিল না, যুদ্ধবিমানের সংখ্যাও ছিল সীমিত। আর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে ছড়িয়ে থাকা তাদের প্রায় ৪০ হাজার সেনার কাছে সম্ভাব্য ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলার মতো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও ছিল না।

বিক্ষোভের ব্যাপকতা ও তীব্রতা সিআইএ ও মোসাদের কাছে শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা সম্পর্কে তাদের ধারণা বদলে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই গোয়েন্দা সংস্থা সরকারকে উৎখাতের বিষয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।

তারা ধারণা করতে শুরু করে, আয়াতুল্লাহদের হাত থেকে ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের জেনারেলদের হাতে ক্ষমতা চলে গেলে তারা আরও ধর্মনিরপেক্ষ হবে। এমনকি বাস্তববাদী এবং সমঝোতায় আগ্রহী হতে পারে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশও যুদ্ধের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিজুড়ে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান একাধিকবার ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পকে ফোন করে গোপনে ইরানে হামলার আহ্বান জানান। প্রকাশ্যে তিনি অবশ্য শান্তিপূর্ণ সমাধানের কথা বলে আসছিলেন।

কয়েক সপ্তাহ পর, ১১ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের জন্য নেতানিয়াহু আবার যুক্তরাষ্ট্রে যান। তখন ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনই সবচেয়ে পছন্দের বিকল্প হয়ে ওঠে।

এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী কয়েক সপ্তাহ ধরে যৌথভাবে পরিকল্পনা করছিল। প্রস্তুতি পুরোপুরি শেষ হতে আরও প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লাগে—বিশেষ করে ক্যারিবিয়ান অঞ্চল থেকে দ্বিতীয় মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড সেখানে পৌঁছাতে। ওই রণতরী আগে ভেনেজুয়েলায় মাদুরোকে অপসারণের অভিযানে যুক্ত ছিল।

প্রকাশ্যে ট্রাম্প বলছিলেন, ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে তৈরি হওয়া কথিত হুমকির কূটনৈতিক সমাধানই তিনি বেশি পছন্দ করেন। অথচ জুনে তিনি দাবি করেছিলেন, সেই কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করে দেওয়া হয়েছে। পরে আবার বলেন, সেগুলো নতুন করে গড়ে তোলা হয়েছে।

ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও তার জামাতা জ্যারেড কুশনার তিনবার ইরানি কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে এই আলোচনা শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সামরিক প্রস্তুতি নেওয়ার সময় দেওয়ার কৌশল ছিল কি না—এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। যাই হোক, দুই পক্ষের অবস্থানের পার্থক্য এতটাই বড় ছিল যে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

Popular

More like this
Related

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের জেরে আমিরাতে শ্রীলঙ্কা-আফগানিস্তান সিরিজ স্থগিত

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতে হতে...

তেল না পেয়ে পাম্পের কর্মীকে ছুরিকাঘাত, সিলেটে অর্ধদিবস প্রতীকী ধর্মঘট মঙ্গলবার

সিলেট নগরীতে তেল না পেয়ে পেট্রল পাম্পের এক কর্মীকে...

৫ অতিরিক্ত আইজিপি বাধ্যতামূলক অবসরে

পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) পদমর্যাদার পাঁচজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে...

ইরানে কেন হামলা চালাল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল, যুদ্ধ কতদিন চলতে পারে?

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাত দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। ২৮...