মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি ‘গভীর কৃতজ্ঞতা’ জানালেন জামায়াত আমির

Date:

একাত্তরের রণাঙ্গনে লড়াকু মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি ‘অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে গভীর কৃতজ্ঞতা’ জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘তারা (মুক্তিযোদ্ধারা) আমাদের জন্য একটি স্বাধীন মানচিত্র ও সম্মানজনক পতাকা এনে দিয়েছেন। এই পতাকা ও মানচিত্রের হাত ধরে বাংলাদেশ বদলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে শুধু ভূতল পরিবর্তন হয়েছে, ভেতরের পরিবর্তন হয়নি।’

আজ বুধবার বিকেলে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসকে সামনে রেখে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার উদ্যোগে এই সভার আয়োজন করা হয়।

সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমির বলেন, ‘এই মহান দিবসকে সামনে রেখে প্রিয় দেশবাসী এবং প্রবাসে অবস্থানরত সকল বাংলাদেশি ভাই-বোনকে স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে এ দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করেছেন এবং যারা শহীদ হয়েছেন—আল্লাহ তাদের শহীদ হিসেবে কবুল করুন। যারা আহত হয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেও হার মানেননি—আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের উচ্চ মর্যাদা দান করুন।’

শফিকুর রহমান আরও বলেন, স্বাধীনতা একটি জাতির জন্য কত বড় সম্পদ—তা স্বাধীন জাতি সব সময় উপলব্ধি করে না; পরাধীন জাতিই এর প্রকৃত মূল্য বোঝে। আমাদের পূর্বপুরুষরা প্রায় ১৯০ বছর স্বাধীনতা হারিয়ে গোলামির শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিলেন। তখনই তারা স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ অনুভব করেছিলেন। তাদের আন্তরিক আকুতি, সংগ্রামী প্রচেষ্টা এবং তৎকালীন নেতাদের বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার ফলে আমরা একটি দেশ পেয়েছিলাম। আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল—পাকিস্তানের নামে এই দেশে কোনো বৈষম্য থাকবে না, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং মানুষ স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে সম্মানের সঙ্গে বসবাস করবে। কিন্তু সে লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়নি; বরং পদে পদে তা লঙ্ঘিত হয়েছে। ফলে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘এই যুদ্ধের আগে একটি সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল, সামরিক শাসনের অধীনে। সংবিধান তখন স্থগিত ছিল এবং সামরিক ফরমানের ভিত্তিতেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু জনগণের রায়কে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও সামরিক বাহিনী সম্মান জানাতে ব্যর্থ হয়। বরং সেই জনরায়কে অগ্রাহ্য করে বিপুল জনমানুষের আকাঙ্ক্ষাকে তারা গুলি দিয়ে, বুলেট দিয়ে দমিয়ে রাখতে চেয়েছে। নির্বিচারে মানুষ খুন করেছে, মানুষের ইজ্জত লুণ্ঠন করেছে, সম্পদ ধ্বংস করেছে, দেশকে পোড়া মাটির দেশে পরিণত করেছে।’

কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছরে মানুষ স্বাধীনতার সেই কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি বলে মন্তব্য করেন জামায়াত আমির। বলেন, এক এক করে ৫৪ বছর পেরিয়ে গেছে; আমরা ৫৫তম বছরে পদার্পণ করছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের অবস্থা কী ছিল—তা সবারই জানা। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তারা ঘুরে দাঁড়ায় এবং শিল্পোন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্বকে চমকে দেয়। আজ তারা উন্নত ও মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তাহলে আমরা কেন পারলাম না? এর প্রধান কারণ নেতৃত্বের ব্যর্থতা, লোভ, অদূরদর্শিতা এবং সীমাহীন দুর্নীতি।

‘দুর্নীতি শুধু অর্থ আত্মসাৎ নয়; মানুষের অধিকার হরণ করা, অযোগ্যদের যোগ্য স্থানে বসানো এবং যোগ্যদের অবমূল্যায়ন করাও বড় দুর্নীতি। এই দুর্নীতির বিষবাষ্প সমাজ থেকে দূর না হলে স্বাধীনতার কাঙ্ক্ষিত সুফল ভোগ করা সম্ভব নয়।’

সভায় প্রধান বক্তা ছিলেন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। তিনি বলেন, ‘(একাত্তরে) আমি একজন তরুণ ক্যাপ্টেন হিসেবে কেন বিদ্রোহ করেছিলাম? বৈষম্য একটা কারণ। দুই নম্বর কারণ হলো সুশাসন ছিল না। আজ দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর আমরা অতিক্রম করেছি। শুধু স্বল্প সময়ের জন্য ছাড়া—প্রেসিডেন্ট জিয়ার সময় ছাড়া, দলীয়করণ তো কখনো বন্ধ হয় নাই। সুশাসন তো আমরা নিশ্চিত করতে পারি নাই। যোগ্যতার ভিত্তিতে আমরা পদায়ন করতে পারি নাই।’

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘কোনো দেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম, স্বাধিকারের সংগ্রাম, বৈষম্য-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম, জুলুম-অত্যাচার-শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম কেন হয়? মানুষের স্বাধিকারের যে চেতনা, বৈষম্যমুক্ত চেতনা, স্বাধীন জীবন যাপন ও আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে যখন শাসকগোষ্ঠী অত্যাচার এবং জুলুমের খড়গ চাপিয়ে দেয়, তখনই জনবিদ্রোহ শুরু হয়।’

পরওয়ার আরও বলেন, ‘আমাদের স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের দিকে তাকালে মনে হয়, নয় মাসের মধ্যে আমরা এই দেশটাকে স্বাধীন করেছিলাম। নয় মাসজুড়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। আসলেই কি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস এই নয় মাসেই সীমাবদ্ধ? না। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। আমরা তিনবার এই ভূখণ্ডের মানুষ স্বাধীন হয়েছি। স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছি।’

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সংসদ সদস্য মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বলেন, ‘২৬ মার্চ এই বাংলাদেশের জন্য অনেক গৌরবের, অনেক গুরুত্বপূর্ণ, অনেক তাৎপর্যময়। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের প্রিয় এই বাংলাদেশ। কিন্তু যে লক্ষ্যে এই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, যে লক্ষ্যে বাংলাদেশের মানুষ লড়াই-সংগ্রাম করে জীবন দিয়ে এই দেশকে স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান করে দিয়েছিল, আজও বাংলাদেশের মানুষের সেই লক্ষ্য অর্জিত হয় নাই।’

জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ও সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঞ্চালনায় সভায় দলের অন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি মহানগর নেতারাও বক্তব্য দেন।

Popular

More like this
Related

অস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে প্রতিরক্ষা কোম্পানির সঙ্গে পেন্টাগনের চুক্তি

মার্কিন সামরিক বাহিনীকে যুদ্ধকালীন প্রস্তুতির আওতায় আনতে অস্ত্র উৎপাদন...

সিলেটে মোটরসাইকেলের জ্বালানি কিনতে পুলিশের ৩ শর্ত

সিলেট নগরীতে মোটরসাইকেলের জ্বালানি তেল সংগ্রহে তিনটি শর্ত দিয়েছে...

২৫ মার্চ গণহত্যা নিয়ে সাইমন ড্রিংয়ের প্রতিবেদনের পেছনের গল্প

‘আল্লাহ ও ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের’ নামে ঢাকা আজ একটি বিধ্বস্ত...

পদ্মার ৮০ ফুট গভীরে বাসটি, বৈরী আবহাওয়ায় ব্যাহত উদ্ধার কাজ

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে তলিয়ে যাওয়া...