অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নতুন অধ্যাদেশের মাধ্যমে গঠিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) বর্তমান কাঠামোয় কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। সংসদের একটি বিশেষ কমিটি সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশটি অনুমোদনের বিপক্ষে সুপারিশ করায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সংবিধান অনুযায়ী, কোনো অধ্যাদেশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন না পেলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। সে অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহে অধ্যাদেশটি বিল আকারে সংসদে উত্থাপন না হলে এটি অকার্যকর হয়ে পড়বে।
এ বিষয়ে এনএইচআরসির সদস্য মো. নূর খান বলেন, ‘নতুন অধ্যাদেশে কমিশনের পাঁচ সদস্যের নির্বাচন ও নিয়োগের যে কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা আর বহাল থাকবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারি কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে তদন্ত চালানোর যে ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল, সেটিও বাতিল হয়ে যাবে।’
নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী কমিশন নিজ উদ্যোগে তদন্ত শুরু করতে পারত এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সংস্থার কাছ থেকে নথিপত্র তলব করার ক্ষমতা পেয়েছিল।
নূর খান বলেন, ‘ফলে কমিশন স্বাভাবিকভাবেই ২০০৯ সালের আইনের অধীনে আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।’
তার মতে, এতে কমিশনের স্বাধীনতা গুরুতরভাবে খর্ব হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
যদিও সরকার জানিয়েছে, পরবর্তী সময়ে আরও আলোচনা ও পর্যালোচনার ভিত্তিতে সংশোধিত আইন আনা হবে, তবে এই অনিশ্চয়তা মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে বলে জানান তিনি।
‘মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা আর নেই। নতুন আইনে কমিশনের স্বাধীনতা বজায় থাকবে কি না এ মুহূর্তে বলা কঠিন,’ বলেন নূর খান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিশনের চেয়ারম্যান এবং সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘এ বিষয়ে কমিশন কোনো সিদ্ধান্ত নিলে শিগগিরই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হবে।’
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই শেষে গত বৃহস্পতিবার একটি প্রতিবেদন সংসদে জমা দিয়েছে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। কমিটির সভাপতি জয়নুল আবদিন ফারুক সংসদে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন।
কমিটি চারটি অধ্যাদেশ বাতিল এবং আরও ১৬টি (যার মধ্যে এনএইচআরসি অধ্যাদেশও রয়েছে) তাৎক্ষণিকভাবে বিল আকারে উত্থাপন না করার সুপারিশ করেছে। এসব অধ্যাদেশ পরবর্তীতে পর্যালোচনা করে আরও শক্তিশালী আকারে নতুন বিল হিসেবে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এর ফলে মোট ২০টি অধ্যাদেশ আগামী ১০ এপ্রিলের পর কার্যকারিতা হারাতে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রথম গঠিত হয় ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জারি করা এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে। পরে সেটি ২০০৯ সালে আইনে রূপান্তরিত হয়। দীর্ঘদিন সমালোচিত এই আইনের অধীনেই কমিশন পরিচালিত হয়ে আসছিল। ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার কমিশনটি বিলুপ্ত করে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের নভেম্বরে কমিশন পুনর্গঠন ও ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নতুন অধ্যাদেশ জারি করা হয়।