মাকুম্বা নাচ ও এক গোলের পর জন্ম নেওয়া কিংবদন্তি

Date:

ইতালির গ্রীষ্ম, ফিফা বিশ্বকাপ ১৯৯০; মাঠে তখন কৌশল, পরিকল্পনা আর কঠোর প্রতিযোগিতার দাবানল। ইউরোপ আর দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলো নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত। সেই প্রেক্ষাপটে ক্যামেরুন যেন ছিল এক দূরবর্তী গল্প। অপরিচিত, অবহেলিত, কিন্তু অন্তরে বহন করে আনা এক প্রাচীন শক্তি। আর সেই শক্তির প্রতীক হয়ে উঠলেন আটত্রিশ বছর বয়সী এক প্রবীণ ফুটবলার, যাকে অনেকেই তখন ‘শেষ অধ্যায়ের মানুষ’ ভেবে রেখেছিল।

কিন্তু বিশ্ব ফুটবলের মহারথীদের পদচারণায় মুখর। দিয়েগো ম্যারাডোনা, লোথার ম্যাথাউস কিংবা রবার্তো ব্যাজ্জিওদের মতো তারকারা তখন মাঠ মাতাচ্ছেন, তবে সমস্ত হিসাব-নিকাশ আর বয়সের সমীকরণ পালটে দিলেন সেই প্রবীণ ফুটবলার।

তার তো এই মহাকাব্যিক মঞ্চে থাকারই কথা ছিল না। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিয়ে তিনি তখন ভারত মহাসাগরের তীরে রিইউনিয়ন দ্বীপে নিরিবিলি জীবন কাটাচ্ছেন। কিন্তু ক্যামেরুনের রাষ্ট্রপতির এক বিশেষ অনুরোধে বুট জোড়া পায়ে গলিয়ে তিনি আবারও ফিরে এলেন। মাঠে নেমেই বিশ্ববাসীকে উপহার দিলেন এমন এক জাদুকরী মুহূর্ত, যা ফুটবলের ইতিহাসে চিরকালের জন্য এক অমলিন শিল্প হয়ে খোদাই হয়ে গেল। তিনি আর কেউ নন, ক্যামেরুনের অদম্য সিংহ রজার মিলা।

বল যখন প্রতিপক্ষের জালে শেষ চুম্বন এঁকে দিত, তখন রজার মিলা মেতে উঠতেন এক অদ্ভুত আনন্দোৎসবে। গোলপোস্টের কাছ থেকে একগাল চওড়া, নির্ভেজাল হাসি নিয়ে তিনি ছুটে যেতেন মাঠের প্রান্তরে, ঠিক সেই কর্নার ফ্ল্যাগটির কাছে। এরপর এক হাত পেটের কাছে রেখে, অন্য হাত শূন্যে তুলে, এক পায়ের ওপর ভর দিয়ে অদ্ভুত এক সাবলীল ছন্দে কোমর দোলাতেন তিনি।

তার এই উদ্‌যাপনকে ফুটবলপ্রেমীরা আবেগের বশবর্তী হয়ে ‘মাকুম্বা’ বলে ডাকলেও, এর শেকড় মূলত ক্যামেরুনের ঐতিহ্যবাহী ‘মাকোসা’ নৃত্যের গভীরে প্রোথিত। তবে নাম যাই হোক, ইতালির সেই সবুজ গালিচায় মুহূর্তের জন্য যেন নেমে আসত আফ্রিকার আদিম, বন্য ও প্রাণোচ্ছল এক স্পন্দন। তার সেই নাচের তালে তালে গ্যালারির হাজারো দর্শক থেকে শুরু করে টিভির পর্দার সামনে বসে থাকা কোটি কোটি মানুষের হৃদয় যেন এক অদ্ভুত জাদুতে মেতে উঠত।

ফুটবলের ব্যাকরণে আটত্রিশ বছর বয়সটা হলো অবসরের পর চায়ের কাপে পুরোনো স্মৃতির রোমন্থন করার সময়। কিন্তু রজার মিলা যেন এই বয়সেই তার দ্বিতীয় যৌবনের খোঁজ পেয়েছিলেন। রোমানিয়ার বিপক্ষে তার সেই অবিস্মরণীয় জোড়া গোল কিংবা প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে সেই জাদুকরী মুহূর্তটির কথা ভাবুন।

কলম্বিয়ার কিংবদন্তি এবং কিছুটা খামখেয়ালি গোলরক্ষক রেনে হিগুইতা যখন মাঝমাঠে বল নিয়ে কারুকাজ করার দুঃসাহস দেখালেন, তখন চিতার ক্ষিপ্রতায় বলটি ছিনিয়ে নিয়ে মিলা যখন ফাঁকা জালে জড়িয়ে দিলেন, স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল গোটা বিশ্ব। আর প্রতিটি গোলের পরই ক্যামেরার লেন্স মুগ্ধ হয়ে খুঁজত কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে থাকা সেই জাদুকরকে। তার সেই শারীরিক ভাষায় কোনো অহংকার ছিল না, ছিল না কোনো আগ্রাসন; ছিল কেবল বিশুদ্ধ আনন্দের এক নিখাদ প্রকাশ। বয়সের ভার যে একজন প্রকৃত শিল্পীর সত্তাকে এতটুকুও ম্লান করতে পারে না, রজার মিলা যেন নিজের শরীরী ছন্দ দিয়ে সেই কবিতাই লিখে যাচ্ছিলেন।

রজার মিলার এই উদ্‌যাপন কেবল একজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত উল্লাস বা একটি গোলের আনন্দ ছিল না; এটি ছিল একটি ঘুমন্ত মহাদেশের জাগরণের গান, আফ্রিকার আত্মবিশ্বাসের এক মূর্ত প্রতীক। ক্যামেরুন সেই বিশ্বকাপে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার যে অভাবনীয় ইতিহাস গড়েছিল, তার প্রধান রূপকার ছিলেন এই মিলাই। বিশ্বমঞ্চে আফ্রিকান ফুটবলের যে একটা নিজস্ব সৌন্দর্য, নিজস্ব ছন্দ এবং এক স্বতন্ত্র, বাঁধভাঙা পরিচয় আছে, তা তিনি তার ওই নাচের মাধ্যমেই বিশ্বের দরবারে সগৌরবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার সেই মাকোসা বা মাকুম্বা নৃত্য প্রমাণ করেছিল যে, ফুটবল কেবল পেশিশক্তি বা ইউরোপীয় কৌশল নয়, এটি হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত এক উদ্‌যাপনও বটে।

আজ সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। ফুটবলের নিয়মে, কৌশলে এবং উদ্‌যাপনে এসেছে হাজারো পরিবর্তন। কিন্তু নব্বইয়ের বিশ্বকাপের কথা উঠলেই চোখের সামনে সবার আগে ভেসে ওঠে সেই হাসিমুখ আর কর্নার ফ্ল্যাগের তলে অবিস্মরণীয় সেই কোমর দোলানো নৃত্য। শিল্পের যেমন কোনো সীমারেখা নেই, আনন্দ প্রকাশেরও যে কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই, রজার মিলা তার সেই জাদুকরী ছন্দে তা চিরকালের জন্য ফুটবলের ক্যানভাসে এঁকে দিয়ে গেছেন। সেই অবিস্মরণীয় নাচ ফুটবলের মহাকাব্যে এক চিরসবুজ পঙ্‌ক্তি হয়েই বেঁচে থাকবে অগণিত ফুটবলপ্রেমীর মনে।
 

Popular

More like this
Related

ঈদের ছুটিতে তারকারা কে কোথায়

ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই মহোৎসব। এই ছুটির আবহে...

অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে নারী এশিয়ান কাপ চ্যাম্পিয়ন অদম্য জাপান

সিডনির রেকর্ডগড়া গ্যালারির সামনে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো নারী...

শোলাকিয়ায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত, লাখো মুসল্লির সমাগম

পাকিস্তান আমল থেকেই ময়মনসিংহ জেলা থেকে হেঁটে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক...

হামলার ঝুঁকির মধ্যেই খোলা আকাশের নিচে ইরানিদের ঈদের নামাজ

যেকোনো সময় বোমা হামলার ঝুঁকি আর অনিশ্চয়তা। এর মধ্যেই...