মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের একমাস: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কতটা এগিয়ে ইরান?

Date:

গত এক মাস ধরে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরানের যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অভাবনীয় মাত্রায় সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করেছে, ধ্বংস করেছে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা। তা স্বত্বেও, ইরান তার ‘অসম’ ও বিদ্রোহী কৌশলের মাধ্যমে এখনো টিকে রয়েছে।

বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে ইরান কার্যত বৈশ্বিক অর্থনীতিকে জিম্মি করেছে, যার ফলে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। অন্যদিকে, কোনো সুস্পষ্ট বিজয় বা কার্যকর এক্সিট স্ট্র্যাটেজি না থাকায় ট্রাম্প প্রশাসন এখন দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে।

আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভয়াবহ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি, ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) শীর্ষ কমান্ডার এবং একাধিক জেনারেল নিহত হন। জবাবে ইরান শত শত মিসাইল ও ড্রোন ছোড়ে এবং হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে। যুদ্ধে হিজবুল্লাহ যোগ দেয় এবং ইসরায়েল লেবাননে স্থল অভিযান শুরু করে।

 

নিহত নেতার ছেলে মোজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। এই সপ্তাহে ইরানের প্রায় ১০ হাজার বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) ৪০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলও ছাড়তে সম্মত হয়।

যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে জ্বালানি অবকাঠামোগুলোতে। ইরানের সাউথ পারস গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালায় ইসরায়েল এবং শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানিকে গুপ্তহত্যা করে। এর প্রতিশোধ হিসেবে ইরান কাতারের রাস লাফান এলএনজি ফ্যাসিলিটি এবং ইসরায়েলের তেল শোধনাগারে হামলা চালায়। এছাড়া ইরানের দুটি ভারী মিসাইল ইসরায়েলের দিমোনা এবং আরাদ শহরের আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করে আঘাত হানে।

 

পাকিস্তানের মাধ্যমে একটি ১৫ দফার যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইরান তা ‘অবাস্তব’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করে। ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি খোলার আল্টিমেটাম কয়েক দফায় পিছিয়ে দেন। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও শিল্প কারখানাগুলোতে হামলা চালায় ইসরায়েল। এ সময় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা (ভারী পানি ও ইয়েলোকেক প্ল্যান্ট) এবং একাধিক ইস্পাত কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

উভয় পক্ষের সামরিক কৌশল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তবে যুদ্ধের ব্যয়ভার, কৌশল আর সম্মুখ সমরে এক মাসে হিসাব নিকাশ বদলে গেছে ব্যাপক।

তুরস্কভিত্তিক সংবাদসংস্থা আনাদোলু এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, জোট বাহিনী আকাশে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং ইরানের নৌবাহিনীর ১৫০টিরও বেশি নৌযান ধ্বংস করেছে। তবে এই সামরিক অভিযানের ব্যয়ভার বিশাল। প্রথম ১৬ দিনেই জোট বাহিনী ১১ হাজার ২৯৪টি মারণাস্ত্র ব্যবহার করেছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার। এত বিপুল পরিমাণ উচ্চ-প্রযুক্তির অস্ত্র ব্যবহারের ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্যাট্রিয়ট, থাড, টমাাহক এবং অ্যারো আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টরের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

বার্তাসংস্থা এপি জানায়, প্রথাগত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে না পেরে ইরান ‘শুট অ্যান্ড স্কুট’ বা ছায়াযুদ্ধের কৌশল গ্রহণ করেছে। পাহাড় ঘেরা ভৌগোলিক অবস্থান এবং ভূগর্ভস্থ ঘাঁটির সুযোগ নিয়ে তারা সস্তা শাহেদ-১৩৬ কামিকাজি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক মিসাইল ব্যবহার করছে।

ট্রাম্প ইতোমধ্যে দাবি করেছেন, ইরানের ৯০ শতাংশ মিসাইল সক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গেছে। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান এখনো তাদের মজুতের মাত্র ৩০-৪০ শতাংশ ব্যবহার করেছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। একইসঙ্গে অস্ত্র উৎপাদনে তাদের বিশাল সক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রয়েছে। তাদের বার্ষিক ১ হাজার ৫০০ মিসাইল ও ২ হাজার ড্রোন উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।

 

এই যুদ্ধের ফলে ব্যাপক প্রাণহানির পাশাপাশি মানবিক সংকট ও বিশ্ব অর্থনীতির ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে।

 

আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ইরানে নিহতের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ছুঁয়েছে। এর মধ্যে মিনাবে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলায় ১৭০ জনেরও বেশি নারী ও শিশু নিহত হওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনা রয়েছে। ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে ১ হাজার ১১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১২ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এ ঘটনাকে জাতিসংঘেরর শরনার্থী বিষয়ক সংস্থা ( ইউএনএইচসিআর) একটি বড় ‘মানবিক বিপর্যয়’ হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে।

 

হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্বব্যাপী তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ বলে জানায় রয়টার্স। কাতারের এলএনজি টার্মিনালে হামলায় তাদের ১৭ শতাংশ রপ্তানি ক্ষমতা নষ্ট হয়েছে, যার ফলে বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই জ্বালানি সংকটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দাম গ্যালন প্রতি প্রায় ৪ ডলারে পৌঁছেছে। সেইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নাসডাক ও এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর মতো বৈশ্বিক শেয়ার বাজারগুলোতে ব্যাপক দরপতন ঘটেছে।

 

যুদ্ধের ব্যাপ্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। হিজবুল্লাহ, হুতির মতো আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। গোটা মধ্যপ্রাচ্যেই যুদ্ধ ছড়িয়ে গেছে।

 

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনসমর্থন ৩৬ শতাংশে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় রিপাবলিকান দলেও উদ্বেগ বাড়ছে। এছাড়া, ইরানে মার্কিন স্থলবাহিনী পাঠানোর বিষয়ে মিত্র ও দেশের ভেতরে তীব্র আপত্তি রয়েছে। সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ইরানের প্রায় ৯৭০ পাউন্ড সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধার বা ধ্বংস করা, যার জন্য স্থলবাহিনী পাঠানোর প্রয়োজন হতে পারে—যা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

উপসাগরীয় আরব দেশগুলো (যেমন কাতার, সৌদি আরব, ইরাক) যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করলেও ইরানের হামলায় তাদের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে এবং তারা দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থান নিয়ে শঙ্কিত। ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানালেও তারা তাতে সাড়া দেয়নি। অন্যদিকে, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা জানিয়েছিল, সংঘাত আরও বাড়লে তারা যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিতে প্রস্তুত। বার্তাসংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী ইতোমধ্যে হুতিরা ইসরায়েলের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলাও চালিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা শান্তি প্রস্তাব নাকচ হয়ে যাওয়ার পর যুদ্ধ বর্তমানে একটি অচলাবস্থার দিকে এগোচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান বুঝতে পেরেছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে হারাতে পারবে না। তাই তাদের মূল লক্ষ্য হলো যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে টিকে থাকা এবং প্রতিপক্ষকে অর্থনৈতিকভাবে পর্যুদস্ত করা, যা তাদের জন্য চূড়ান্ত বিজয় হিসেবে বিবেচিত হবে।

Popular

More like this
Related

মধ্যপ্রাচ্যে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা চুক্তি, ইরানকে উন্নত ড্রোন দিচ্ছে রাশিয়া

মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব ও কাতারের সঙ্গে ইতোমধ্যে ১০ বছর...

একদুয়ারিয়ার গ্রামীণ সৌন্দর্যে মুগ্ধ বিদেশি পর্যটকরা

নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার একদুয়ারিয়া গ্রামে গত তিন বছরে অন্তত...

হাতে স্কুলব্যাগ, নিহত শিশুদের স্মরণে ইরানের ব্যতিক্রমী শ্রদ্ধা

মাঠে ফুটবল, কিন্তু হৃদয়ে গভীর শোক, এমন আবহেই ম্যাচ...

ডিজেলের অভাবে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না জেলেরা

শরীয়তপুরে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে টানা দুই দিন বন্ধ...