ভোটের অধিকার যথেষ্ট নয়, চাই অর্থনীতির গণতন্ত্রও

Date:

জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন আশা ও ঐতিহাসিক মোড় তৈরি করেছে। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের পর মানুষ আবার ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিমূলক সরকারের কথা বলছে। সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন ঘিরে প্রত্যাশা তাই শুধু ক্ষমতা বদলের নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন বদলেরও।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো আলোচনার কেন্দ্রে নেই—রাজনৈতিক গণতন্ত্রের পাশাপাশি আমরা কি অর্থনীতিতে গণতন্ত্র চাইছি? যদি না চাই, তাহলে এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছাবে?

ভোটাধিকার ফিরে এলেও মানুষের জীবনে কি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যদি তার জীবিকা, আয় ও সুযোগের অর্থনীতি আগের মতোই বৈষম্যপূর্ণ থাকে?

বাস্তবতা হলো, রাজনৈতিক অধিকার আর অর্থনৈতিক অধিকার আলাদা করে দেখা যায় না। একজন নাগরিক যদি চাকরি না পান, ঋণ বা ব্যবসার সুযোগ রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে, তাহলে গণতন্ত্র তার কাছে কেবল ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ থাকে।

তাই আজ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা দরকার অর্থনীতির গণতন্ত্র—যেখানে সবার জন্য সমান সুযোগ থাকবে, ন্যায্যতা হবে মূলনীতি এবং আর্থিক ব্যবস্থা পরিচালিত হবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে।

অর্থনীতিতে গণতন্ত্র কোনো জটিল তত্ত্ব নয়। এর অর্থ সহজ—সবার জন্য সমান অধিকার ও সুযোগ, ন্যায্য বণ্টন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আর্থিক ব্যবস্থা। কে ব্যবসা করবে, কে ঋণ পাবে, কে চাকরি পাবে—এসব যেন রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতার নৈকট্য বা আনুগত্যের ওপর নির্ভর না করে। যোগ্যতা, পরিশ্রম ও উদ্যোগই হবে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।

গত ১৫ বছরের বেশি সময়ে দেশে আয় ও সম্পদের বৈষম্য বিপুলভাবে বেড়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে বিপুল সম্পদ ও সুযোগ কেন্দ্রীভূত হয়েছে। ব্যাংকখাতের অনিয়ম, খেলাপি ঋণ, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়—এসবের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব মূল ভূমিকা রেখেছে।

যখন ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক পরিচয় প্রধান হয়, বড় ঋণ দেওয়া হয় ক্ষমতার কাছের মানুষকে, তখন অর্থনীতি আর গণতান্ত্রিক থাকে না। সাধারণ উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও তরুণ কর্মসংস্থানপ্রার্থী ক্রমেই পিছিয়ে পড়ে।

অর্থনীতিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রথম শর্ত হলো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আর্থিক ব্যবস্থা। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ না হলে তার বোঝা পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর—কর বাড়ে, মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। এই বাস্তবতায় ভোটাধিকার থাকলেও মানুষের দৈনন্দিন জীবন ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক গণতন্ত্র মানে সুযোগের সমতা। একজন কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা তরুণ যেন শুধু পরিচয় বা যোগাযোগের অভাবে পিছিয়ে না পড়ে। সহজ শর্তে ঋণ, ন্যায্য সুদের হার, প্রযুক্তি ও বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হলে অর্থনীতি বড় ব্যবসা ও প্রভাবশালীদের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। এতে কর্মসংস্থান বাড়ে, গ্রাম ও শহরের ব্যবধান কমে, মানুষের নিজস্ব সক্ষমতা বিকশিত হয়।

তৃতীয়ত, ন্যায্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। কর-ব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে এখনও প্রত্যক্ষ করের পরিধি সীমিত, কিন্তু ভোগ্যপণ্যে পরোক্ষ করের বোঝা সবার ওপর সমানভাবে পড়ে। ফলে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অর্থনীতিতে গণতন্ত্র মানে কর-ব্যবস্থায় ন্যায্যতা আনা—যাদের আয় বেশি, তাদের কর-দায়িত্বও বেশি হবে। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি যেন প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনী ইশতেহারে শুধু প্রবৃদ্ধির হার বা বড় প্রকল্পের তালিকা নয়, অর্থনৈতিক গণতন্ত্র কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—সে বিষয়ে স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে। ব্যাংক সংস্কার, কর সংস্কার, শ্রমিকের অধিকার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকের সুরক্ষা—এসব বিষয়কে রাজনৈতিক অঙ্গীকারে রূপ দিতে হবে।

তবে দায়িত্ব শুধুমাত্র রাজনৈতিক দলের নয়। নাগরিকদেরও সচেতন ভূমিকা রাখতে হবে। ভোট দেওয়ার সময় কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়, অর্থনৈতিক নীতির প্রশ্ন তুলতে হবে। ব্যাংক লুট, দুর্নীতি বা বৈষম্যকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিলে অর্থনীতিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে না।

গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের ধারাবাহিক চাপ ছাড়া আর্থিক ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আসে না।

রাজনৈতিক গণতন্ত্র অর্থনীতির গণতন্ত্র ছাড়া অসম্পূর্ণ। ভোটাধিকার ফিরে এসেছে, কিন্তু জীবনের খরচ কমেনি; সরকার বদলেছে, কিন্তু সুযোগ একই গোষ্ঠীর হাতে—এমন হলে মানুষের হতাশা বেড়ে যাবে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান যে আশা জাগিয়েছে, তা বাস্তবে রূপ দিতে হলে অর্থনীতিকেও গণতান্ত্রিক করতে হবে। এই নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলের নয়, অর্থনৈতিক ন্যায্যতা ও সমান অধিকারের নতুন সামাজিক চুক্তির সুযোগ।

সেই সুযোগ কাজে লাগালে গণতন্ত্র মানুষের জীবনে সত্যিকারের অর্থ বহন করবে।

এস এম রাশিদুল ইসলাম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)

Popular

More like this
Related

একদিনে পড়ল ১৫ উইকেট, স্পিনারদের নৈপুণ্যে জয়ের পথে ভারত

দক্ষিণ আফ্রিকাকে অল্পতে গুটিয়ে দেওয়ার পর ভারতও পারল না...

সবাই যদি ভাবেন আমরা ৯ মাসে কুইক ফিক্স করে ফেলবো, সেটা তো হয় না: শফিকুল আলম

বাংলাদেশের মানুষ ভালো শাসনতন্ত্র চায়, বাংলাদেশের মানুষ সুশাসন চায়।...

গালফ ফুড ফেয়ারে ৫৫ লাখ ডলারের রপ্তানি ক্রয়াদেশ পেল প্রাণ

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খাদ্যপণ্যের মেলা গালফ ফুড ফেয়ারে ৫৫...

‘আমি আমজনতার অভিনেতা, পরিচালকও হতে চাই আমজনতার’

ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত আছেন কয়েক দশক ধরে। হুমায়ূন...