১৯৩০ থেকে ২০২২— ফিফা বিশ্বকাপের ২২টি আসরের ৯৬৪টি ম্যাচে গোল হয়েছে মোট ২৭২০টি। কিন্তু এই হাজারো গোলের ভিড়ে কিছু গোল স্রেফ পরিসংখ্যান নয়, বরং একেকটি অমর গল্প। ভাবুন তো, স্রেফ ১১ সেকেন্ডের মধ্যে লক্ষ্যভেদ করে চমকে দেওয়া সেই হাকান সুকুর কিংবা বন্ধুর জুতো ধার করে এক আসরেই অবিশ্বাস্য ১৩ গোল করা জুস্ত ফঁতেনের কথা! কিংবা মনে করুন সেই ১৭ বছরের কিশোর পেলেকে, যাকে মনস্তাত্ত্বিকরা দলে নিতেই বারণ করেছিলেন। অথবা ৪২ বছর বয়সে গোল করে ইতিহাস গড়া রজার মিলা থেকে শুরু করে অনন্য ধারাবাহিকতা দেখিয়ে পাঁচটি ভিন্ন বিশ্বকাপে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর জাল খুঁজে নেওয়া— বিশ্বমঞ্চের এমন সব স্মরণীয় গোল ও গোলদাতাদের ওপর একবার নজর বুলিয়ে নেওয়া যাক।
লুসিয়েঁ লরাঁ: ইতিহাসের সেই ‘প্রথম’
আসর: ১৯৩০
ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম অমর করে রাখতে লরাঁ সময় নিয়েছিলেন মাত্র ১৯ মিনিট। ১৯৩০ সালের ১৩ জুলাই উরুগুয়ের মন্তেভিদিওর পোসিতোস স্টেডিয়ামে মেক্সিকোর জালে বল পাঠিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসের প্রথম গোলদাতা হন এই ফরাসি। তখন উদযাপনে কোনো আড়ম্বর ছিল না, সতীর্থরা শুধু হাত মিলিয়ে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, ইউরোপ থেকে দক্ষিণ আমেরিকায় সেই সমুদ্রযাত্রায় একটি গাড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে কাজ করা লরাঁসহ চারজন একসঙ্গে জাহাজে চড়ে বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েছিলেন। তার সেই ভলিটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় অর্জনগুলোর একটি হলেও তিনি কীর্তিটি নিয়ে পরবর্তীতে খুব একটা কথা বলতেন না। পেশাদার ফুটবল ছেড়ে লরাঁ একটি মদের বার কিনেছিলেন, সেখানেও গোলটি নিয়ে আলাপ করতে তিনি দ্বিধা করতেন।
পেলে: ফুটবল সম্রাটের রাজত্বের শুরু
আসর: ১৯৫৮
১৯৫৮ বিশ্বকাপে ১৭ বছরের এক কিশোরের অর্ন্তভুক্তি নিয়ে খোদ ব্রাজিলের মনস্তত্ত্ববিদ জোয়াও কারভালেস আপত্তি জানিয়েছিলেন। তার মতে, পেলে ছিলেন বড্ড ‘শিশুসুলভ’ এবং তার মধ্যে ‘আন্তর্জাতিক ফুটবলের জন্য প্রয়োজনীয় লড়াকু মানসিকতার অভাব রয়েছে’। কিন্তু কারভালেসের কথা না শুনে কোচ ভিসেন্তে ফিওলা ঝুঁকি নিয়েছিলেন সানন্দে। ভাগ্যক্রমে ১০ নম্বর জার্সি পাওয়া পেলে ওয়েলসের বিপক্ষে একক নৈপুণ্যে গোল করে মাত্র ১৭ বছর ২৩৯ দিন বয়সে বিশ্বকাপের কনিষ্ঠতম গোলদাতা হন। ডি-বক্সে বুক দিয়ে বল নামিয়ে তা মাটিতে ছোঁয়ার আগেই আলতো করে টোকা দিয়ে শরীর ঘুরিয়ে ফেলেন তিনি। ওভাবে জায়গা বানিয়ে নেওয়ার পর হাফ ভলিতে কাঁপান জাল। সেই সঙ্গে সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক এবং ফাইনালে সুইডেনের বিপক্ষে জোড়া গোল করে পেলে নাড়িয়ে দেন গোটা দুনিয়াকে। ওই কিশোরই এরপর ফুটবল সম্রাট হিসেবে নন্দিত হন, ফুটবল নামক খেলায় চিরস্থায়ী আসন গড়ে নেন।
জুস্ত ফঁতেন: ১৩ গোলের অবিশ্বাস্য মহাকাব্য
আসর: ১৯৫৮
তৎকালীন ফরাসি মরক্কোর মারাক্কেশে জন্ম নেওয়া ফঁতেন ১৯৫৮ আসরে যখন খেলতে নামেন, তার নিজের একজোড়া বুট পর্যন্ত ছিল না! সতীর্থ স্তেফান ব্রুইয়ের কাছ থেকে ধার করা একজোড়া বুট পায়ে দিয়েই তিনি লিখেছিলেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ‘বড়’ মহাকাব্য। সেমিফাইনালে ব্রাজিলের কাছে ফ্রান্স পরাস্ত হলেও ততক্ষণে তার নামের পাশে ৯ গোল। আগের বিশ্বকাপে হাঙ্গেরির স্যান্দর ককসিসের করা ১১ গোলের রেকর্ড ভাঙতে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে তাই তার প্রয়োজন ছিল ৩ গোল। প্রতিপক্ষ ছিল পশ্চিম জার্মানি। কিন্তু ফঁতেন যেন অপ্রতিরোধ্য! সেদিন তিনি একাই ৪ গোল করে জার্মানদের ধসিয়ে দেন। এরপর পেরিয়ে গেছে প্রায় ৬৮ বছর, কেউ সেই ১৩ গোলের কীর্তি স্পর্শ করতে পারেনি। বর্তমান যুগে যেখানে ৬ বা ৭ গোল করলেই গোল্ডেন বুট নিশ্চিত হয়ে যায়, সেখানে ফঁতেন আজও ফুটবলের এক অজেয় চূড়া।
ওলেগ সালেঙ্কো: একাই যখন একটি দল
আসর: ১৯৯৪
১৯৯৪ সালের ২৮ জুন ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড স্টেডিয়ামে রাশিয়া বনাম ক্যামেরুন ম্যাচটি কাগজ-কলমে ছিল গুরুত্বহীন, কারণ দুই দলই টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়ের পথে ছিল। কিন্তু ২৫ বছর বয়সী ওলেগ সালেঙ্কো সেই ম্যাচকেই বানিয়ে নিলেছিলেন ইতিহাসের মঞ্চ। ম্যাচের আগের রাতে তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন— অনেক গোল করবেন। তবে বাস্তবে যা ঘটান তা ছিল স্রেফ অবিশ্বাস্য। ক্যামেরুনের জালে একে একে তিনি পাঁচবার বল পাঠিয়ে বিশ্বকাপের এক ম্যাচে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটি নিজের করে নেন। যদিও রাশিয়া নকআউট পর্বে যেতে পারেনি, কিন্তু মোট ৬ গোল করে বুলগেরিয়ার রিস্টো স্টইচকভের সাথে যৌথভাবে গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন সালেঙ্কো। তবে ট্র্যাজেডি হলো, এই অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের পর কোচের সঙ্গে মনোমালিন্য ও ফর্মহীনতায় আর কখনোই রাশিয়ার জার্সিতে মাঠে নামা হয়নি তার। এক ম্যাচেই কিংবদন্তি হয়ে বিদায় নেন তিনি।
রজার মিলা: ৪২ বছরের ‘তরুণ’ যোদ্ধার হুঙ্কার
আসর: ১৯৯৪
সেই একই ম্যাচে যেখানে সালেঙ্কো গোল উৎসব করেছিলেন, সেখানেই ইতিহাস গড়েন ক্যামেরুনের ‘বুড়ো সিংহ’ রজার মিলা। রাশিয়ার বিপক্ষে গোল করে ৪২ বছর ৩৯ দিন বয়সে বিশ্বকাপের প্রবীণতম গোলদাতার রেকর্ড গড়েন তিনি, যা অক্ষুণ্ণ আছে। ১৯৮৭ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিলেও ১৯৯০ বিশ্বকাপের আগে দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পল বিয়ার সরাসরি অনুরোধে ৩৯ বছর বয়সে দলে ফিরেছিলেন তিনি। সেবার চার গোল করে ক্যামেরুনকেও কোয়ার্টার ফাইনালে তুলেছিলেন মিলা। এরপর ১৯৯৪ বিশ্বকাপে তার সেই গোলটি দলের হার এড়াতে না পারলেও কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে কোমর দুলিয়ে তার উদযাপন ফুটবল বিশ্ব কোনোদিন ভুলবে না। গোলরক্ষক বাদে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ খেলোয়াড় হওয়ার গৌরবও তার দখলে।
হাকান সুকুর: ১১ সেকেন্ডের ঝড়
আসর: ২০০২
২০০২ বিশ্বকাপে তুরস্কের ‘গোল্ডেন বয়’ হাকান সুকুর প্রথম ৮ ঘণ্টা ২২ মিনিট মাঠে থেকেও কোনো গোলের দেখা পাননি। তাকে একাদশ থেকে বাদ দেওয়ার গুঞ্জন উঠলেও কোচ সেনল গুনেস তার ওপর আস্থা রাখেন দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে। আর প্রতিদান দিতে সুকুর ১১ সেকেন্ডও সময় নেননি! আরও স্পষ্ট করে বললে— তার লেগেছিল মাত্র ১০.৮ সেকেন্ড। প্রতিপক্ষ কিক-অফ করার পর বল যখন ডিফেন্ডার হং মিয়ং বোর কাছে যায়, তখন ছোঁ মেরে তা কেড়ে নেন তুরস্কের ইলহান মানসিজ। তার পাস থেকে বল পেয়েই জালে জড়ান সুকুর। তখনও স্টেডিয়ামের অনেক দর্শক ঠিকমতো আসনই গ্রহণ করেননি। ১৯৬২ সালের আসরে চেকোস্লোভাকিয়ার ভাক্লাভ মাসেকের ১৫ সেকেন্ডের লক্ষ্যভেদের রেকর্ড ভেঙে এটিই এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের দ্রুততম গোল।
মিরোস্লাভ ক্লোসা: ১৬ গোলের সিংহাসন
আসর: ২০০২-২০১৪
ফুটবল বিশ্বে অদম্য সংকল্পের অপর নাম যেন ক্লোসা। ২০০২ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক দিয়ে তার বিশ্বমঞ্চে যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেই থেকে টানা চারটি বিশ্বকাপে (২০০২ সালে পাঁচটি, ২০০৬ সালে পাঁচটি, ২০১০ সালে চারটি ও ২০১৪ সালে দুটি) জার্মানির আক্রমণভাগের প্রধান সেনানী হিসেবে খেলেন তিনি। ক্লোসা তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছান ২০১৪ সালের ৮ জুলাই, নিজের শেষ বিশ্বকাপে। সেমিফাইনালে আয়োজক ব্রাজিলের ঘরের মাঠে খোদ ব্রাজিলকেই ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত করার ঐতিহাসিক ম্যাচে তিনি নিজের ১৬তম গোলটি করেন, হয়ে যান বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। যার রাজত্ব ভেঙে দিয়েছিলেন, সেই ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদো গ্যালারিতে বসে দেখেছিলেন ক্লোসার উল্লাস।
ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো: ধারাবাহিকতার প্রতিচ্ছবি ‘গোলমেশিন’
আসর: ২০০৬-২০২২
২০০৬ সালে ফ্রাঙ্কফুর্টের মাঠে ইরানের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে যখন ফুটবলের মহাযজ্ঞে প্রথম গোলের দেখা পেয়েছিলেন ২১ বছরের তরুণ রোনালদো, তখন হয়তো কেউই ভাবেননি তিনি ফুটবল ইতিহাসকে নতুন করে লিখবেন। এরপর একে একে ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা, ২০১৪ সালের ব্রাজিল, ২০১৮ সালের রাশিয়া ও সর্বশেষ ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ঘানার বিপক্ষে গোল করে তিনি গড়েন এক অতিমানবীয় কীর্তি। বিশ্বকাপের পাঁচটি ভিন্ন আসরে গোলের নজির নেই রোনালদো ছাড়া আর কারও। বিশেষ করে, ২০১৮ বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে ৩৩ বছর বয়সে করা তার সেই অসাধারণ হ্যাটট্রিকটি ফুটবল ইতিহাসের পাতায় সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে। দীর্ঘ ২০ বছরের এই ঘটনাবহুল পথচলায় রোনালদো বারবার প্রমাণ করেছেন— মাঠ কিংবা বয়স কিংবা প্রতিপক্ষ যা-ই হোক না কেন, জাল খুঁজে নেওয়াটাই তার চিরন্তন ধর্ম।