৮ বছরের শিশু ফারহান আহমেদ আনাস। চট্টগ্রামের হালিশহরে গ্যাস বিস্ফোরণে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী এই শিশুটি হারিয়েছে নিজের মা-বাবা, চাচা-চাচি ও চাচাতো ভাইকে।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে আনাস-আয়েশার বাবা সামির আহমেদ সুমন মারা যান। মাত্র দুই সপ্তাহ আগে পোল্যান্ড থেকে দেশে ফিরেছিলেন সামির। পরিবারের সঙ্গে রমজান ও ঈদ উদযাপন শেষে পর্তুগালে যাওয়ার টিকিটও কাটা ছিল তার।
রাত ১১টার দিকে না ফেরার দেশে চলে যান আনাস-আয়েশার মা আশুরা আক্তার পাখিও।
সেই খবর তখনো পৌঁছায়নি আনাসের কাছে। চার বছরের ছোট বোন আয়েশা, চাচাতো বোন উম্মে আইমান স্নিগ্ধা ও চাচা শিপন হোসাইনের মতো ছোট্ট আনাসও লড়ে যাচ্ছেন মৃত্যুর সঙ্গে।
অথচ পোড়া শরীরের যন্ত্রণা ছাপিয়ে আনাসের চোখ দুটো প্রতিনিয়ত খুঁজে বেড়ায় বাবা-মাকে। তার ‘আম্মু’ ‘আম্মু’ ডাকে ভারি হয়ে উঠছে হাসপাতালের বাতাস।
গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন আনাস-আয়েশাকে দেখতে গিয়েছিলেন বড় মামা আবুল কাশেম।
আজ বুধবার দ্য ডেইলি স্টারকে কাশেম শোনান সেই হৃদয়বিদারক মুহূর্তের কথা।
আইসিইউতে মামাকে দেখতে পেয়েই আনাসের প্রথম প্রশ্ন— ‘মা-বাবা আসে না কেন?’
কাশেম বলেন, ‘২৫ শতাংশ দগ্ধ আনাসের কণ্ঠস্বরে ছিল না কোনো জোর। ওই ক্ষীণ কণ্ঠেই আমার কাছে একটু খানি পানি খেতে চাইল। প্রথম দিকে অনুমতি না দিলেও, আনাসের করুণ মুখের দিকে চেয়ে এক চামচ পানি খাওয়ানোর সুযোগ দেন নার্স।’
‘ওই অতটুকু পানিতে তৃপ্তি মেটেনি, ছটফটানি বেড়ে যায় ওর। আরও পানির জন্য আবদার করতে থাকে। সেই আবদার মেটানোর ক্ষমতা না থাকায় ভাগ্নের ভালোর জন্য বেড়িয়ে আসি রুম থেকে,’ বলেন কাশেম।
কাশেম জানান, এর পরই ‘আম্মু’ ‘আম্মু’ বলে চিৎকারের চেষ্টা করতে থাকে আনাস। বলেন, ‘সে-ও বোঝে, আমার জায়গায় ওর মা থাকলে ছেলের আবদার ফেলতে পারত না।’
এর কয়েক ঘণ্টা পরই মারা যান আনাস-আয়েশার মা পাখি।
দ্য ডেইলি স্টারকে কাশেম আরও বলেন, ‘আমরা দোয়া করে যাচ্ছি, ভাগ্নে-ভাগ্নি দুজন যেন সুস্থ হয়ে ওঠে। ওদের সুচিকিৎসার জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ও সহকারী অধ্যাপক শাওন বিন রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘শিশু দুটির অবস্থা আশঙ্কাজনক। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
গত সোমবার ভোর সাড়ে ৪টায় হালিশহর এইচ ব্লকের ‘হালিমা মঞ্জিল’ নামের ছয়তলা ভবনের একটি ফ্ল্যাটে বিকট শব্দে বিস্ফোরণের পর আগুন ধরে যায়। ওই সময় একই পরিবারের সদস্যরা সেহরি করছিলেন।
আনাস-আয়েশার বাবা-মা সামির ও পাখি, বড় ভাই সাখাওয়াত হোসেন, তার স্ত্রী নূরজাহান বেগম রানী ও তাদের ১৬ বছরের ছেলে শাওন এ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন।