বৃহস্পতিবারের এক বিকেল। ঢাকার সোনারগাঁও মোড়ে তখন যানবাহনের প্রচণ্ড চাপ। বাসগুলো ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে থামা বা চলাচল করলেও পুলিশকে সেই আগের মতোই হাত নেড়ে ট্রাফিক সামলাতে হচ্ছিল।
রাজধানীতে সম্প্রতি যে আধা-স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু হয়েছে, এই একটি দৃশ্যই তার সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা—দুটো দিকই স্পষ্ট করে দেয়।
পাইলট প্রকল্পের আওতায় কয়েকটি মোড়ে এই নতুন পদ্ধতি চালু হওয়ায় যানজট কিছুটা কমেছে। কিন্তু সমস্যা হলো, অনেক চালক ও পথচারী এখনও লাল বাতি তোয়াক্কা করেন না। ফলে বাধ্য হয়েই ট্রাফিক পুলিশকে আবারও সেই হাতের ইশারায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
সরেজমিনে ওই মোড়ে গিয়ে আরও দেখা যায়, কিছু বাস যাত্রী তোলার জন্য রাস্তার মাঝখানেই হুটহাট দাঁড়িয়ে পড়ছে। এতে করে গাড়ির গতি তো কমছেই, সেই সঙ্গে সিগন্যালের সবুজ বাতির মূল্যবান সময়টুকুও নষ্ট হচ্ছে।
ট্রাফিক সার্জেন্ট অমিত চৌধুরী বলেন, যেহেতু সময় নির্ধারণের বিষয়টি ম্যানুয়াল ও অটোমেটিক—উভয় পদ্ধতিতেই বজায় রাখা হচ্ছে, তাই সিস্টেমটি ভালো কাজ করছে। সমন্বিতভাবে সিগন্যাল কাজ করায় যানবাহনকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হচ্ছে না।
তবে তিনি জানান, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো চালক ও পথচারীদের সিগন্যাল মেনে চলা নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, অনেকেই সিগন্যাল ভাঙার চেষ্টা করেন। এ কারণে ট্রাফিক পুলিশকে প্রায়ই হাতের ইশারায় তা নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
তিনি আরও যোগ করেন, এই সিস্টেম চালুর পর থেকে এলাকায় যানচলাচল অনেক উন্নত হলেও পাবলিক বাসগুলো ট্রাফিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে এখনও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
যেসব মোড়ে এই সিস্টেম বসানো হয়েছে সেখানে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পটি বড় ধরনের বিলম্বের সম্মুখীন হয়েছে।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, উদ্বোধনের সাত মাস পেরিয়ে গেলেও কর্তৃপক্ষ পাইলট প্রকল্পের আওতায় বাকি ১৫টি মোড়ে সিগন্যাল বসাতে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বলেন, শুরুতে ফলাফল খুব ভালো ছিল। কিন্তু কেনাকাটা সংক্রান্ত জটিলতা, প্রশাসনিক রদবদল ও প্রকৌশলীদের পরিবর্তনের কারণে আমরা বাকিগুলো বাস্তবায়ন করতে পারিনি।
তার মতে, সিভিল কাজ সম্পন্ন করা ও সিগন্যাল বসানোর জন্য জায়গা প্রস্তুত করার দায়িত্ব ছিল দুই সিটি করপোরেশনের। তবে তারা এখনও সব জায়গার টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করতে বা কার্যাদেশ দিতে পারেনি।
তিনি বলেন, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্পে কেনাকাটা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে আমরা প্রায় সাত থেকে আট মাস সময় হারিয়েছি।
পাইলট প্রকল্পের আওতায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ১৪টি মোড়ে ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৮টি মোড়ে এই সিগন্যাল বসানোর কথা ছিল।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫ সালের ৩০ আগস্ট হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, বাংলামটর, সোনারগাঁও, ফার্মগেট, বিজয় সরণি, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও জাহাঙ্গীর গেট—এই সাতটি মোড়ে আধা-স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল উদ্বোধন করে।
পরের ছয় মাসের মধ্যে আরও ১৫টি মোড়ে এই সিগন্যাল স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল কর্তৃপক্ষের।
অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, আগে পরিস্থিতি যেমন ছিল, তার তুলনায় আমরা খুব ভালো ফল পাচ্ছি। যদি আরও বেশি এলাকায় এই সিস্টেম চালু করা যায়, তবে এর উপযোগিতা অনেক বাড়বে। সীমিত এলাকায় বাস্তবায়ন করলে এই সিস্টেমের সম্পূর্ণ প্রভাব বোঝা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, মূলত ২২টি মোড়ের কাজ গত বছরের জুলাই বা আগস্টের মধ্যে শেষ হওয়া উচিত ছিল, বড়জোর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এতদিনে ঢাকার একটি পূর্ণাঙ্গ করিডোর এই ব্যবস্থার আওতায় চলে আসার কথা ছিল। যদি আশেপাশের আরও প্রায় ৫০টি মোড় এর সঙ্গে যুক্ত করা যেত, তবে শহরের বেশিরভাগ অংশই ইতোমধ্যে এর আওতায় চলে আসত।
তার মতে, এই দেরি বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর সদিচ্ছার অভাবকেই ফুটিয়ে তোলে। তিনি আরও বলেন যে, কর্তৃপক্ষ ও রাস্তা ব্যবহারকারীরা সহযোগিতা না করলে শুধু প্রযুক্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
এই সিস্টেমটি অটোপাইলটের মতো সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে পারে, তবে আধা-স্বয়ংক্রিয় নকশার কারণে বিশেষ অনুষ্ঠান বা অস্বাভাবিক ট্রাফিক পরিস্থিতিতে ম্যানুয়ালি তদারকি করার সুযোগ থাকে।
তিনি আইন প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, একটি মোড় বা ইন্টারসেকশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। সেখানে বিশৃঙ্খলা থাকলে কোনো কিছুই কাজে আসবে না। ট্রাফিক পুলিশকে অবশ্যই মোড়গুলো বাধাহীন রাখতে হবে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, বিজয় সরণিতে এই সিস্টেম ভালো কাজ করছে, কারণ এলাকাটি হকার ও রাস্তার ধারের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা থেকে তুলনামূলকভাবে মুক্ত। অন্যান্য মোড়গুলোও যদি একইভাবে বাধাহীন রাখা যায়, তবে যানজট পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে।
অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেনের মতে, এই সিস্টেমের বিস্তার খুব বেশি ব্যয়বহুল হবে না। সিভিল কাজসহ প্রতিটি মোড়ে খরচ এক কোটি টাকারও কম। ১০০টি মোড়ের জন্য এই প্রকল্পে প্রায় ৬০ থেকে ৮০ কোটি টাকা খরচ হতে পারে। সঠিক সদিচ্ছা থাকলে আমরা এই সময়ের মধ্যেই ১০০টি মোড়ের কাজ শেষ করতে পারতাম।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) ডেপুটি ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ার ডিএম গিয়াস মালিক জানান, ইতোমধ্যে স্থাপিত বেশ কয়েকটি সিগন্যাল সঠিকভাবে কাজ করছে। বিজয় সরণি, কারওয়ান বাজার ও ফার্মগেটে আমি দেখেছি যে লাইটিং সিস্টেমটি রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে ও সচল আছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সরকারের নীতি অনুযায়ী, ভিভিআইপি মুভমেন্টের প্রটোকলের জন্য এখন আর ট্রাফিক সিগন্যাল বন্ধ রাখার কথা নয়। সিগন্যাল ব্যবস্থা স্বাভাবিক নিয়মেই চলা উচিত।
পাইলট প্রকল্প সফল হলে কর্তৃপক্ষ পুরো শহরে এই সিস্টেম ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। বর্তমানে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ মিলিয়ে প্রায় ৩৩৮টি মোড় রয়েছে, যার বেশিরভাগই ট্রাফিক পুলিশ ম্যানুয়ালি নিয়ন্ত্রণ করে। তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো পর্যায়ক্রমে এই সমস্ত মোড়কে সিগন্যালিং সিস্টেমের আওতায় নিয়ে আসা।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রাজিব খাদেম জানান, শিক্ষা চত্বর, কদম চত্বর, মৎস্য ভবন, কাকরাইল মসজিদ, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, বাংলামটর ও শাহবাগসহ আটটি জায়গায় সিগন্যাল বসানো হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের কাজ শেষ। এখন বুয়েট বাতি ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামগুলো স্থাপন করছে এবং পরীক্ষামূলকভাবে চালাচ্ছে।
তবে ডিএনসিসি কর্মকর্তারা জানান, সমন্বয়হীনতা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে বাস্তবায়নে দেরি হয়েছে।
ডিএনসিসির ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খোন্দকার মাহবুব আলম বলেন, দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে সমন্বয়, টেন্ডার প্রক্রিয়া ও ঘন ঘন প্রশাসনিক পরিবর্তনই ছিল প্রধান সমস্যা।
তিনি বলেন, বাজেট বরাদ্দ, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং অন্যান্য প্রশাসনিক জটিলতার কারণে টেন্ডারে দেরি হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে খুব অল্প সময়ের মধ্যে কয়েকবার প্রশাসক পরিবর্তন হয়েছে। তিনি আরও জানান, বুয়েটের নকশা অনুযায়ী আমরা পাঁচটি স্থাপনার কাজ শেষ করেছি। বাকিগুলোর জন্য আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছি।
ডিএনসিসির অন্য এক কর্মকর্তা জানান, নকশা তৈরিতে দেরি হওয়ার কারণেও প্রকল্পের গতি কমে গেছে। তিনি বলেন, গত এক বছরে বাংলাদেশে প্রায় সবকিছুতেই দেরি হয়েছে। কোথাও কাজ দ্রুত এগোয়নি।
তবে বাকি মোড়গুলোর কাজ খুব শীঘ্রই শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে জানান তিনি। তিনি বলেন, এক সপ্তাহের মধ্যেই আমরা মাঠে কাজ শুরু করতে পারব।