দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল: কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া স্টেডিয়ামে ইতালির বিশ্বজয়

Date:

আজ রোমের মানচিত্রে স্তাদিও নাজিওনালে দেল পিএনএফের (ন্যাশনাল স্টেডিয়াম অফ দ্য ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টি) কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। ১৯১১ সালে নির্মিত এই স্টেডিয়ামটি ১৯৫৩ সালে বন্ধ করে দেওয়ার পর সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা হয়। তবে ইতিহাসের ধুলো ঝাড়লে দেখা যায়, এই বিলীন হয়ে যাওয়া মাঠেই রচিত হয়েছিল ইতালির প্রথম বিশ্বজয়ের গল্প।

১৯৩৪ সালের ১০ জুন। ফিফা আয়োজিত দ্বিতীয় বিশ্বকাপের ফাইনালে দেখা মিলেছিল এক রোমাঞ্চকর শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ের। শুধু তাই নয়, এটি ছিল ইতালির প্রধানমন্ত্রী বেনিতো মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট শাসনের শক্তি প্রদর্শনের এক রাজনৈতিক মঞ্চ!

দুটি বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি কোচ ভিত্তোরিও পোজোর অধীনে স্বাগতিক ইতালি ছিল ফুটবল বিশ্বে উদীয়মান শক্তি। অন্যদিকে, চেকোস্লোভাকিয়া শৈল্পিক ফুটবলের জন্য পরিচিত ছিল। প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার তীব্র দাবদাহে দল দুটি মুখোমুখি হয়েছিল শিরোপা যুদ্ধে। গ্যালারিতে উপস্থিত ৫৫ হাজার দর্শক তখন হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি যে, এই ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসের প্রথম অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ফাইনাল হতে যাচ্ছে।

স্বাগতিক হয়েও বাছাইপর্বে অংশগ্রহণ ও ‘প্রতারণা’র অভিযোগ

বিশ্বকাপের ইতিহাসে ১৯৩৪ সালের আসরটি ছিল অনন্য এক কারণে— সেবারই প্রথম দলগুলোকে বাছাইপর্ব খেলে চূড়ান্ত পর্বে আসতে হয়েছিল। এমনকি আয়োজক হলেও ইতালিকে ছাড় দেওয়া হয়নি। ঘরের মাঠে সান সিরোয় গ্রিসকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে মূল পর্বে জায়গা করে নিলেও সেই জয় নিয়ে আজও বিতর্কের শেষ নেই

অভিযোগ রয়েছে, ফিফার তৎকালীন নিয়ম লঙ্ঘন করে ওই ম্যাচে ইতালি এমন তিনজন খেলোয়াড়কে (লুইস মন্তি, এনরিকে গুয়াইতা ও আনফিলোজিনো গুয়ারিসি) খেলিয়েছিল, যাদের ইতালির জার্সিতে খেলার বৈধতা ছিল না। নিয়ম অনুযায়ী, এক দেশের হয়ে খেলা কোনো ফুটবলারকে নতুন আরেকটি দেশের হয়ে খেলতে হলে অন্তত তিন বছর সেখানে বসবাস করতে হতো। কিন্তু আর্জেন্টিনার হয়ে খেলা মন্তি ও গুয়াইতা বা ব্রাজিলের গুয়ারিসি— কেউই সেই শর্ত পূরণ করেননি। মজার ব্যাপার হলো, একই সময়ে রোমানিয়ার ইউলিউ বারাতকির ক্ষেত্রে ফিফা কঠোর নিয়ম মানলেও ইতালির এই ‘প্রতারণা’র ব্যাপারে তারা রহস্যজনকভাবে চোখ বন্ধ করে রেখেছিল।

সেখানেই শেষ নয়। বাছাইপর্বের দ্বিতীয় লেগের ম্যাচটি এথেন্সে হওয়ার কথা থাকলেও তা আর কখনও অনুষ্ঠিতই হয়নি। তখন বলা হয়েছিল, প্রথম লেগে বিধ্বস্ত গ্রিস ঘরের মাঠে আর লজ্জা পেতে চায়নি। কিন্তু দীর্ঘ ৬০ বছর পর জানা যায়, আর্থিক সংকটে থাকা গ্রিক ফুটবল ফেডারেশনকে একটি দোতলা বাড়ি কিনে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল ইতালি। সেটার বিনিময়েই ম্যাচটি বাতিল করে বিশ্বকাপ থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছিল গ্রিস।

নতুন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের খোঁজে

১৯৩০ সালের বিশ্বকাপে অধিকাংশ ইউরোপিয়ান দেশ অংশ না নেওয়ায় আয়োজক ও শিরোপাজয়ী উরুগুয়ে ক্ষুব্ধ ছিল। তাই ইতালির আয়োজনটি তারা পুরোপুরি বয়কট করে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটিই প্রথম ও একমাত্র ঘটনা, যেখানে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা তাদের মুকুট রক্ষায় মাঠে নামেনি। ফলে শুরুতেই নিশ্চিত হয়ে যায় যে ফুটবল এক নতুন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন পেতে যাচ্ছে। অন্যদিকে, আগের আসরের রানার্সআপ আর্জেন্টিনাও খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। শেষ ষোলোতেই (মূলত প্রথম রাউন্ড) সুইডেনের কাছে হেরে তারা বিদায় নেয়।

ফাইনালের পথে

দ্বিতীয় বিশ্বকাপে ১৬টি দল নকআউট পদ্ধতিতে অংশগ্রহণ করে। অর্থাৎ কোনো গ্রুপ পর্বের ব্যবস্থা ছিল না। ইতালি যাত্রা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রকে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত করে। কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের সাথে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র (তখন টাইব্রেকারের নিয়ম চালু হয়নি) হওয়ার পর ফের অনুষ্ঠিত ম্যাচে ১-০ গোলে জিতে সেমিফাইনালে ওঠে তারা। সেখানে ভীষণ ছন্দে থাকা অস্ট্রিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট কাটে আজ্জুরিরা।

বিপরীতে, চেকোস্লোভাকিয়া প্রথম ম্যাচে রোমানিয়ার বিপক্ষে ২-১ গোলে জেতে। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে ৩-২ এবং সেমিফাইনালে শক্তিশালী জার্মানিকে ৩-১ গোলে হারিয়ে তারা শিরোপা নির্ধারণী মঞ্চে পৌঁছায়।

মুখোমুখি লড়াইয়ের পরিসংখ্যান

এই ফাইনালটি ছিল দুই দলের ফুটবল ইতিহাসে ১১তম সাক্ষাৎ। আগের ১০ ম্যাচে তাদের পরিসংখ্যান ছিল সমানে সমান— প্রত্যেকেরই তিনটি করে জয় পেয়েছিল এবং বাকি চারটি ম্যাচ ড্র হয়েছিল। সবশেষ সাক্ষাতে জয়ের তৃপ্তি নিয়ে মাঠে নেমেছিল ইতালি। ১৯৩৩ সালের মে মাসে সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান ইন্টারন্যাশনাল কাপে ঘরের মাঠে ফ্লোরেন্সে তারা ২-০ গোলে হারিয়েছিল চেকোস্লোভাকিয়াকে।

ফাইনাল: ফুটবলের আড়ালে ফ্যাসিবাদের মহড়া

বিশ্বকাপ শুরুর দিন কয়েক আগে ইতালিয়ান কোচ পোজোকে এক কঠিন সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন মুসোলিনি। তিনি স্পষ্ট বলে দেন, ‘সাফল্যের জন্য একমাত্র আপনিই দায়বদ্ধ, তবে ব্যর্থ হলে ঈশ্বর যেন আপনার সহায় হোন।’ এই প্রচ্ছন্ন কিন্তু ভয়ংকর হুমকি খেলোয়াড়দের কানেও পৌঁছে যায়। এমনকি এক ভোজসভায় নিজের গলায় আঙুল চালিয়ে মুসোলিনি তাদের ইশারা করেন— ‘হয় তোমরা জিতবে, নয়তো…(মরবে)’। ফ্যাসিস্ট শাসকের কাছে এই বিশ্বকাপ ছিল স্রেফ একটি ট্রফি জেতার চেয়ে অনেক বড় কিছু, নিজের শক্তিমত্তার এক বিশাল রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন!

৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্রখর রোদে হওয়া ম্যাচের ৭১তম মিনিটে আন্তোনিন পুচের গোলে পিছিয়ে পড়ে ইতালি। পরাজয় যখন চোখ রাঙাচ্ছিল, তখন ৮১তম মিনিটে রাইমুন্দো ওরসির লক্ষ্যভেদে সমতায় ফেরে আজ্জুরিরা। বাকি সময়ে আর কোনো গোল না হওয়ায় প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনাল গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। এরপর সেন্টার-ফরোয়ার্ড অ্যাঞ্জেলো শিয়াভিও ৯৫তম মিনিটে ইতালির পক্ষে জয়সূচক গোলটি করেন। তখন তিনি এতটাই নিস্তেজ হয়ে পড়েছিলেন যে, মাঠেই কিছু সময়ের জন্য জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন!

এই বিশ্বজয়ের পেছনে মাঠের বাইরে থেকে কলকাঠি নাড়ার গুঞ্জনও কম নয়। মন্তি পরবর্তীতে জানান, ফাইনালের আগের রাতে সুইডিশ রেফারি ইভান একলিন্দ মুসোলিনির সঙ্গে নৈশভোজে অংশ নেন। আর প্রথমার্ধ গোলশূন্যভাবে শেষ হওয়ায় ‘ইল দুচে’ (দ্য লিডার) খোদ ড্রেসিংরুমে ঢুকে তাকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, একলিন্দ ‘সহযোগিতা’ করছেন ঠিকই, কিন্তু মন্তি যেন অতিরিক্ত ফাউল করে রেফারির কাজ কঠিন না করেন। শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলের সেই জয়ে ইতালির হাতে প্রথমবারের মতো ওঠে জুলে রিমে ট্রফি। পাশাপাশি দলটি পেয়েছিল দানবীয় আকৃতির ‘কোপা দেল দুচে’, যা মুসোলিনি তৈরি করিয়েছিলেন নিজের ও ফ্যাসিস্ট শাসনের মহিমা প্রচারের জন্য।

এই সাফল্যকে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো তুলে ধরেছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট আঙ্গিকে। লা গাজেত্তা দেল্লো স্পোর্ত তাদের প্রচ্ছদে শিরোনাম করে, ‘মুসোলিনির উপস্থিতিতে আজ্জুরিদের বিশ্বজয়’। আর লা স্তাম্পার শিরোনাম ছিল, ‘দুচের উপস্থিতিতে ইতালিয়ান ফুটবলারদের বিশ্বজয়’।

অক্ষুণ্ণ রেকর্ড

মিডফিল্ডার মন্তি ফুটবল ইতিহাসের এক অনন্য চরিত্র, যিনি ভিন্ন দুটি দেশের হয়ে দুটি বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলার রেকর্ডের মালিক। ১৯৩০ সালে আয়োজক উরুগুয়ের বিপক্ষে জন্মভূমি আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে নেমে হেরে যান তিনি। তবে চার বছর পর ১৯৩৪ সালে (পূর্বপুরুষদের সূত্রে) ইতালির জার্সিতে খেলে ঠিকই পান শিরোপার স্বাদ।

Popular

More like this
Related

পটুয়াখালীর ১৮ লাখ বাসিন্দার জন্য চিকিৎসক মাত্র ১২১ জন

পটুয়াখালীর জেলা সদর, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের সরকারি স্বাস্থ্য...

আরও ৫ সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ

দেশের পাঁচটি সিটি করপোরেশনে পূর্ণকালীন প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার।বরিশাল,...

তারাবির পর পরিবারের সঙ্গে কথা, সেহরির সময় অগ্নিকাণ্ডে মালদ্বীপ প্রবাসীর মৃত্যু

মালদ্বীপের দিঘুরা দ্বীপে অগ্নিকাণ্ডে নিহত পাঁচ বাংলাদেশির একজন ছিলেন...

হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা পেতে ইরানের সঙ্গে ফ্রান্স-ইতালির আলোচনা শুরু

জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে...