ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: গ্রামের তুলনায় শহরে ভোটদানের হার কম

Date:

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে শহরাঞ্চলের ভোটারদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম ছিল—এমন চিত্র সামনে এসেছে।

১২টি সিটি করপোরেশন এলাকার নির্বাচনী আসনগুলোতে ভোটদানের হার গ্রামীণ এলাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম দেখা যায়। জাতীয় গড় ভোট ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশের বিপরীতে অধিকাংশ সিটি করপোরেশন এলাকার আসনগুলো এই লক্ষ্যমাত্রা ছোঁয়া দূরে থাক, বেশ বড় ব্যবধানে পিছিয়ে ছিল।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় মোট ৪৫টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে একটি আসনের ফলাফল আদালতের আদেশে স্থগিত থাকায় ৪৪টি আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষিত এসব আসনের মধ্যে মাত্র পাঁচটিতে ভোটদানের হার জাতীয় গড় ভোট অতিক্রম করতে পেরেছে।

রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয় থেকে সংকলিত চূড়ান্ত ফলাফল শিটে দেখা যায়, বাকি ৩৯টি আসনে ভোটার উপস্থিতি জাতীয় গড়ের চেয়ে ২২ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ পর্যন্ত কম ছিল।

সবচেয়ে বেশি ভোট পড়া (৭৭ শতাংশের বেশি) শীর্ষ পাঁচটি আসনের একটিও সিটি করপোরেশন এলাকায় ছিল না। এই আসনগুলো হলো—চুয়াডাঙ্গা-২ (৭৮ দশমিক ২৭ শতাংশ), যশোর-৬ (৭৭ দশমিক ৯০ শতাংশ), ঝিনাইদহ-৩ (৭৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ), নওগাঁ-১ (৭৭ দশমিক ৫২ শতাংশ) ও পঞ্চগড়-১ (৭৭ দশমিক ৪১ শতাংশ)।

অন্যদিকে, সবচেয়ে কম ভোট পড়া পাঁচটি আসনের মধ্যে চারটিই ছিল শহরাঞ্চলে। ঢাকা-১২ আসনে ভোট পড়েছে ৩৭ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের চেয়ে ২২ শতাংশেরও বেশি কম। এরপর ছিল গোপালগঞ্জ-২ (৩৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ), চট্টগ্রাম-৯ (৪১ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ), চট্টগ্রাম-১১ (৪১ দশমিক ৭৩ শতাংশ) ও চট্টগ্রাম-১০ (৪৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ)।

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের পরিচালক অধ্যাপক এস কে তৌফিক এম হক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, শহরাঞ্চলে ভোটার উপস্থিতি আসলে একটি বৈশ্বিক প্রবণতারই প্রতিফলন। গ্রামীণ ভোটারদের তুলনায় শহরের মানুষ সাধারণত কম ভোট দেন।

তিনি বলেন, শহরের বাসিন্দারা মনে করেন, তারা ভোট দিন বা না দিন, রাজনীতির তেমন কোনো পরিবর্তন হবে না এবং দেশ আগের মতোই চলতে থাকবে।

এর বিপরীতে গ্রামীণ ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার ক্ষেত্রে এক ধরনের জোরালো তাগিদ অনুভব করেন। অনেকেই আশঙ্কা করেন, ভোট না দিলে সরকারি সুবিধাভোগীর তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ পড়তে পারে। শহরে সাধারণত এমন ভয় কাজ করে না।

তিনি আরও বলেন, এই নির্বাচনটি একটি বিশেষ কারণে ভিন্ন ছিল। আওয়ামী লীগের বহু সমর্থক ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। শহরাঞ্চলে তাদের পক্ষে ভোটকেন্দ্র এড়িয়ে চলা তুলনামূলক সহজ ছিল। কিন্তু গ্রামীণ এলাকায় চিহ্নিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এবং সুযোগ-সুবিধা হারানোর ভয়ে তাদের জন্য দূরে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা শহরে ভোটার উপস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য ধস দেখা গেছে।

ঢাকার আসনগুলোর পরিসংখ্যান জাতীয় গড়ের তুলনায় ধারাবাহিকভাবে কম অংশগ্রহণের চিত্র তুলে ধরে। প্রকৃতপক্ষে, ঢাকার কোনো আসনই জাতীয় গড় ভোটের হার অতিক্রম করতে পারেনি।

ঢাকা-৪ আসনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৪৫ দশমিক ৪১ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের চেয়ে ১৪ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ কম। অন্যান্য আসনেও একই ধরনের ব্যবধান লক্ষ্য করা গেছে: ঢাকা-৫ আসনে ৪৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ (গড়ের চেয়ে ১০ দশমিক ৬৯ শতাংশ কম), ঢাকা-৬ আসনে ৪৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ (১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ কম) এবং ঢাকা-৭ আসনে ৪৮ দশমিক ১৬ শতাংশ (১১ দশমিক ২৮ শতাংশ কম)।

এই প্রবণতা অন্য আসনগুলোতেও দেখা গেছে। ঢাকা-৯ আসনে ভোট পড়েছে ৪৭ দশমিক ২৩ শতাংশ, ঢাকা-১১ আসনে ৪৪ দশমিক ৭২ শতাংশ, ঢাকা-১৩ আসনে ৪৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং ঢাকা-১৪ আসনে ৪৬ দশমিক ১২ শতাংশ।

ঢাকা-১৬ আসনে ৪৬ দশমিক ০৮ শতাংশ, ঢাকা-১৭ আসনে ৪৪ দশমিক ৩০ শতাংশ, ঢাকা-১৮ আসনে ৪৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ, ঢাকা-৮ আসনে ৪৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ, ঢাকা-১০ আসনে ৪৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং ঢাকা-১৫ আসনে ৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে।

অন্যান্য এলাকার মধ্যে গাজীপুর-২ আসনে ৪৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ ভোট পড়েছে, যা জাতীয় গড়ের চেয়ে ১৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ কম। নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে ভোট পড়েছে ৫৭ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে ৫৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ।

সিলেটের তিনটি আসনও জাতীয় গড়ের নিচে ছিল: সিলেট-১ আসনে ৪৭ দশমিক ৮১ শতাংশ (জাতীয় গড়ের চেয়ে ১১ দশমিক ৬৩ শতাংশ কম), সিলেট-২ আসনে ৪৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং সিলেট-৩ আসনে ৪৯ দশমিক ২০ শতাংশ।

বন্দরনগরীতে চট্টগ্রাম-৫ আসনে ৪৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ ভোট পড়েছে, যা গড়ের চেয়ে ১৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ কম। চট্টগ্রাম-১০ আসনে ৪৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং চট্টগ্রাম-৮ আসনে ৪৭ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ ভোট পড়েছে।

বরিশাল-৫ আসনে ভোট পড়েছে ৫২ দশমিক ৩৬ শতাংশ (গড়ের চেয়ে ৭ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ কম), কুমিল্লা-৬ আসনে ৫২ দশমিক ৮৪ শতাংশ, গাজীপুর-১ আসনে ৫৩ দশমিক ০২ শতাংশ এবং ময়মনসিংহ-৪ আসনে ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ।

খুলনা-৩ আসনে ৫৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ ভোট পড়েছে, যা জাতীয় গড়ের চেয়ে সামান্য বেশি।

তবে উত্তরাঞ্চলের আসনগুলোর চিত্র ছিল ভিন্ন। রংপুর-১ আসনে ৬০ দশমিক ৭১ শতাংশ ভোট পড়েছে (গড়ের চেয়ে ১ দশমিক ২৭ শতাংশ বেশি), রংপুর-৩ আসনে ৬৩ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং রাজশাহী-২ আসনে ৬৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ। সবচেয়ে ভালো ফলাফল দেখা গেছে রংপুর-২ আসনে, যেখানে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৬৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ; যা জাতীয় গড়ের চেয়ে ৯ দশমিক ১৫ শতাংশ বেশি এবং যেকোনো সিটি করপোরেশন আসনের মধ্যে সর্বোচ্চ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, অনেক শহুরে ভোটার ভোটকেন্দ্রে সহিংসতার আশঙ্কা করেছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, কোনোভাবে আওয়ামী লীগ পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই আশঙ্কা থেকেই অনেকে ভোটকেন্দ্রে যাননি।

তিনি আরও বলেন, ভোটার উপস্থিতি কমার আরেকটি কারণ ছিল আওয়ামী লীগের নিজস্ব সমর্থক গোষ্ঠীর আচরণ। দলের একটি ছোট অংশ ভোট দিতে গেলেও নিম্ন-মধ্যবিত্ত সমর্থকদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক বেশি ছিল। এর বিপরীতে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত সমর্থকদের বড় অংশ ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। তাদের এই অনুপস্থিতি সামগ্রিক ভোটের হারে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে।

নির্বাচন চলাকালে টানা চার দিনের ছুটির বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন। শহরের বাসিন্দারা সাধারণত এত দীর্ঘ ছুটি পান না, তাই অনেকেই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে ভ্রমণে বের হয়ে যান। এতে ভোটার উপস্থিতি আরও কমে যায়। অনেকেই ভেবেছেন, আমার একটা ভোটে কী-ই বা আসে যায়? এই মনোভাবও শহর ছেড়ে বাইরে চলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত ভোটার অংশগ্রহণ কমাতে ভূমিকা রাখে।

Popular

More like this
Related

বগুড়ার স্পোর্টিং উইকেটে খুশি তাসকিন

গত বছরের অক্টোবরে সবশেষ ওয়ানডে খেলেছিলেন। এরপর লম্বা সময়...

জাতীয় সংগীত লিখতে না পারায় তেঁতুলিয়ায় গ্রামপুলিশ নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় গ্রামপুলিশের শূন্য পদে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া...

সন্তানস্নেহে বীজ রক্ষা: করুণা মন্ডলের চার দশকের লড়াই

‘এই বীজগুলো আমার সন্তানের মতো, এগুলো আমার জীবনের সঙ্গী।...

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ভণ্ডুল করে দিতে পারে যে নিয়োগ

ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে, প্রথমে ট্র্যাজেডি হিসেবে, পরে প্রহসন...