ঢাকা-১৪: সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনীতির নতুন ধারা তৈরির আশায় প্রার্থীরা

Date:

পড়ন্ত বিকেলে মিরপুর চিড়িয়াখানা সংলগ্ন রাইনখোলা ঢালে একটি চায়ের দোকানে বসে নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন জল্পনা-কল্পনা করছেন কয়েকজন তরুণ। তাদের আলোচনার মূল বিষয়, ভোটযুদ্ধ ব্যক্তি-সম্পর্কে কতটুকু প্রভাব ফেলে।

ঠিক সেসময়েই গণভবনে নির্মাণাধীন জুলাই স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শনে একই এলাকার (ঢাকা-১৪ আসন) বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দুই প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলি ও মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান।

তারা অন্তর্বর্তী সরকারের আমন্ত্রণে জাদুঘরটি ঘুরে দেখার সময় উপস্থিত হন প্রতীকী গুমঘরের সামনে। সেখানে প্রদর্শিত হচ্ছিল গুম থেকে ফেরা আরমানের ওপর নির্মিত তথ্যচিত্র। তারই একপাশে সাজিয়ে রাখা ছিল তুলির ভাই গুম হওয়া বিএনপি নেতা সাজেদুল সুমনের প্রিয় রঙিন ফতুয়া।

নিজেদের অজান্তেই চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছিল আরমান ও তুলির। এমন স্মৃতিকাতর মুহূর্তে দুজনেই বেমালুম ভুলে গেলেন, আসন্ন নির্বাচনে তারা পরস্পরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।

দুজনের জীবনের সঙ্গে মিশে যাওয়া দুঃসময়ের কথা স্মরণ করতে একটুও ভোলেননি একই আসনের অপর প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক সাজু। মিরপুর নিউমার্কেটের সামনের পথসভায় অপর দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়ে নিজের গণসংযোগ চালিয়ে গেলেন।

মিরপুর-১, কল্যাণপুর এবং সাভার উপজেলার কাউন্দিয়া ইউনিয়ন ও বনগাঁও ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৪ আসনে আছে শাহ আলী মাজার, গাবতলী বাস টার্মিনাল, চিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেন, মিরপুর স্টেডিয়াম।

মিরপুর থেকে সাভারের কাউন্দিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এ আসনে মধ্যবিত্ত, শ্রমজীবী, ভাড়াটে বাসিন্দা ও তরুণ ভোটারের সংখ্যা বেশি। কিশোর গ্যাং, মাদক ও নিরাপত্তা ইস্যু এ আসনের নির্বাচনী আলোচনায় প্রভাব ফেলছে।

রাইনখোলার চা দোকানি বাপ্পী দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, তার দোকানে যারা চা খেতে আসেন, তারা এখন নির্বাচনী আলাপ নিয়েই মেতে থাকেন। বিশেষ করে তরুণ ভোটাররা এই নির্বাচন নিয়ে খুবই উৎসাহী। তারা খেয়াল রাখছেন কোন প্রার্থীর আচরণ কেমন, কোন দল দেশের মানুষের জন্য নতুন কী নীতি গ্রহণ করবে।

বাপ্পী বলেন, ‘প্রার্থীরা তাদের মতো করে বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছেন, ভোটারদের সঙ্গে কথা বলছেন। বিএনপি প্রার্থী, জামায়াত প্রার্থী দুজনের প্রতি মানুষের যথেষ্ট সহানুভূতি আছে। নির্বাচনের পরিবেশ ভালোই থাকবে আশা করি, কোনো সংঘাত-সংঘর্ষ হবে না।’

মিরপুর-৬ এলাকার এক নারী ভোটারের মতে, সমাজ ও দেশজুড়ে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা জরুরি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই নারী বলেন, ‘দেশে ভিন্ন ধর্ম ও ভিন্ন মতের ওপর বিভিন্ন এলাকায় হামলার ঘটনা ঘটছে। এগুলো বন্ধ হওয়া দরকার। আমি মনে করি নির্বাচিত সরকার এগুলো রোধ করতে পারবে।’

‘আমরা ভোট দেবো। আমাদের প্রত্যাশা, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারবেন,’ বলেন তিনি।

নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। নির্বাচনী এলাকায় ঘুরে ঘুরে বাসিন্দাদের সমস্যা-ভোগান্তির কথা শুনছেন; জয়ী হলে কী করবেন, তার রূপরেখা জানাচ্ছেন; দলীয় বৈঠকে নির্ধারণ করছেন কর্মপরিকল্পনা।

জামায়াত প্রার্থী ব্যারিস্টার আরমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘প্রায় আট মাস হয়ে গেল ভোটের মাঠে আছি। বস্তিতে যাচ্ছি, বাসা-বাড়িতে যাচ্ছি, শ্রমজীবী মানুষের কাছে যাচ্ছি। সবচেয়ে বেশি সাড়া পাচ্ছি নারী ভোটার ও তরুণদের কাছ থেকে।’

‘আমি মনে করি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর একটা বিপ্লবের শুরু হয়েছে। এটা পরিবর্তনের শুরু। আপনারা আগামী দিনে ঢাকা-১৪ আসন থেকে পরিবর্তিত রাজনীতির ধারা দেখতে পাবেন,’ বলেন তিনি।

প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী সানজিদা তুলিকে ‘বোন’ সম্বোধন করে আরমান বলেন, ‘আমরা কেউ কারও প্রতিদ্বন্দ্বী নই। আমি জয়ী হলে তুলিকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করব। আর পরাজিত হলে আমি সবার আগে যাব তার কাছে অভিনন্দন জানাতে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী একটি আদর্শিক রাজনীতির দল। আমরা চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, টেম্পুস্ট্যান্ড দখলের মধ্যে নেই। আমাদের ক্লিন ইমেজের কারণে জনগণ ভোট দিয়ে আমাদের ওপর আস্থা জানাবে বলে আমার বিশ্বাস।’

সানজিদা তুলি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমরা মাঠে নেমে দেখছি মানুষ গতানুগতিক রাজনীতির পরিবর্তন চায়—তরুণদের ভেতরে এটা বেশি দেখছি। তাই আমাদের কার্যক্রমে পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছি কি না, কিংবা শিক্ষা-স্বাস্থ্য সবক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তনের জন্য নতুন দিনের রাজনীতিতে কার্যক্রম নিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আমি জাতীয়তাবাদী আদর্শের ৩১ দফা নিয়ে যাচ্ছি জনগণের কাছে। আমার মনে হচ্ছে, বিএনপি ছাড়া অন্য দলগুলো এখন পর্যন্ত পরিষ্কার কোনো ধারণাই দিতে পারছে না।’

ঢাকা-১৪ আসনের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি এই এলাকায় এসে দেখেছি সড়কবাতি নেই। এটা শুধু মেয়েদের জন্য নয়, ছেলেদের জন্যও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে। মাদকের ব্যাপকতা আছে, কিশোর গ্যাং আছে, দুর্নীতি ও দখলদারত্ব আছে। আমি এসব সমস্যা নিয়ে কাজ করব।’

প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী ব্যারিস্টার আরমান প্রসঙ্গে তুলি বলেন, ‘অন্য দলের হলেও তিনি আমার ভাইয়ের মতো। আমরা জুলাই জাদুঘরে গিয়ে টর্চার সেলের সামনে গিয়ে দুজনেই কেঁদেছি। মানবিকতার এই জায়গায় আসলে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে না।’

‘তবে আমি মনে করি, মানুষ জাতীয়তাবাদী আদর্শে আস্থা রেখে আমাকে নির্বাচিত করবেন,’ যোগ করেন সানজিদা তুলি।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন রাজু বলেন, ‘আমরা নির্বাচনী মাঠ দেখছি। কোনো প্রার্থীকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। এ আসনে প্রয়াত বিএনপি নেতা এস এ খালেকের ছেলে সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক সাজুও প্রার্থী হয়েছেন। বিএনপি থেকে তাকে বহিষ্কার করা হলেও গত ১৭ বছর তিনি এ এলাকার বিএনপির কর্মীদের প্রতি নিবেদিত প্রাণ ছিলেন।’

‘তবে ধানের শীষের প্রার্থী সানজিদা তুলিও অনেক সম্মানিত মানুষ। জামায়াত প্রার্থী আরমানের প্রতিও মানুষের সহানুভূতি আছে। সবাই যার যার অবস্থান থেকে জয়ী হওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন,’ যোগ করেন তিনি।

স্বতন্ত্র প্রার্থী সাজু দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমি এই এলাকার ছেলে। স্বাভাবিক কারণেই মিরপুরের স্থানীয় হিসেবে এলাকার জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আমাকে এগিয়ে রাখবে।’

বিএনপি থেকে বহিষ্কারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দলের সিদ্ধান্ত আমি মাথা পেতে নিয়েছি। কিন্তু জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস বলে আমি বিশ্বাস করি। তাই জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আমি বাধ্য হয়েছি স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করতে।’

‘তবে আমি মনে করি, এ আসনে ঐতিহাসিক কিছু হতে যাচ্ছে। অপর দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অত্যন্ত যোগ্য। তারা দুজনই মানবাধিকার কর্মী ও নির্যাতিত। তবে আমি আশাবাদী যে আমার সক্ষমতা এবং আমার পরিবারের অতীত ভূমিকা ও এলাকার প্রতি অবদানের কারণে জনগণ আমাকে বেছে নেবে। দিনশেষে ফলাফল যাই হোক, এলাকার সন্তান হিসেবে আমি বরাবরের মতো জনকল্যাণমূলক কাজ করে যাব,’ বলেন তিনি।

প্রার্থীরা অবশ্য নির্বাচনকে ঘিরে কিছু আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন। সানজিদা তুলি জানান, প্রার্থীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়ে গেছে। এ ছাড়া, নারী প্রার্থীরা বুলিং বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এটা নিয়েও সরকারের কাজ করা উচিত।

জামায়াত প্রার্থী আরমানের মতে, নির্বাচন কমিশন (ইসি) পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আশঙ্কাপূর্ণ। জামায়াত আমির বিষয়টি নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং তিনি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতের আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান আরমান।

রাজধানী ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ আসনের মোট ভোটার ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪৪ জন—যার মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৩২ হাজার ৬৬, নারী ২ লাখ ২৩ হাজার ৭ ও হিজড়া ৪ জন।

দ্বাদশ নির্বাচনে এই আসনে ভোটার ছিলেন ৪ লাখ ১৮ হাজার ২১২ জন, অর্থাৎ এ বছর ভোটার বেড়েছে ৩৭ হাজার ৮৩২ জন।

এ আসনে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আবু ইউসুফ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির রিয়াজ উদ্দিন, গণফোরামের মো. জসিম উদ্দিন, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মো. সোহেল রানা, এবি পার্টির মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির নুরুল আমিন, জাতীয় পার্টির মো. হেলাল উদ্দীন, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির মো. লিটন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির মো. ওসমান আলী।

Popular

More like this
Related

তিস্তা সেচ প্রকল্প: খাল ধসে অনিশ্চিত ১০ হাজার হেক্টর বোরো আবাদ

নীলফামারী ও দিনাজপুর জেলার তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতাধীন প্রায়...

নির্বাচন নিয়ে মতামত দেওয়ার সুযোগ নেই ভারতের: রিজওয়ানা হাসান

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ভারত বিশ্লেষণ করতে পারে,...

ফেব্রুয়ারির আগেই হাসিনার দেশে ফেরার দাবিটি সঠিক নয়

মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত দেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফেব্রুয়ারির...

জিরোনার কাছে হেরে শীর্ষস্থান খোয়াল বার্সেলোনা

মন্টিলিভি স্টেডিয়ামে বড় ধাক্কা খেল বার্সেলোনা। স্বাগতিক জিরোনার কাছে...