ডিজেল পেতে কৃষকের নাভিশ্বাস, ঝুঁকিতে বোরো আবাদ

Date:

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের জেরে সরকার জ্বালানি সরবরাহে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করায় দেশজুড়ে কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন। ধানসহ অন্যান্য ফসলে পানি দিতে না পেরে ব্যাহত হচ্ছে সেচ কার্যক্রম, যা বোরো চাষ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, দেশের অনেক এলাকায় স্থানীয় খুচরা বাজার থেকে ডিজেল রীতিমতো উধাও। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ফিলিং স্টেশন থেকে চাহিদামতো জ্বালানি মিলছে না, কারণ পাম্পগুলো থেকে ডিজেল বিক্রির পরিমাণ সীমিত করে দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে বিধিনিষেধের কারণে একজন ক্রেতা মাত্র দুই লিটার জ্বালানি কিনতে পারছেন। অভিযোগ উঠেছে, এই সুযোগে খুচরা দোকানগুলোতে প্রতি লিটারে বাড়তি ৫ থেকে ১০ টাকা গুণতে হচ্ছে কৃষকদের।

সাধারণত ডিসেম্বর থেকে জুন মাস পর্যন্ত বোরো মৌসুম চলে। এ সময় বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও সিলেটের হাওর এলাকায় সেচ কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় ডিজেলচালিত পাম্প।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৭৫৪টি ডিজেলচালিত গভীর নলকূপ, ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৭টি অগভীর নলকূপ এবং ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪টি লো-লিফট পাম্প সচল রয়েছে।

দেশের প্রধান ধান বোরোর আবাদ লক্ষ্যমাত্রা এবার ধরা হয়েছে ৫০ দশমিক ৫৪ লাখ হেক্টর। গত ৮ মার্চ পর্যন্ত এর মধ্যে ৪৮ দশমিক ৫৩ লাখ হেক্টরে চাষাবাদ সম্পন্ন হয়েছে।

কেবল রংপুর অঞ্চলেই ৫ লাখ ৯ হাজার ৯৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এর মধ্যে লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, নীলফামারী ও গাইবান্ধার প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ চাষযোগ্য জমি পুরোপুরি ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল।

বিদ্যুৎহীন প্রত্যন্ত এলাকা, বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ধরলা নদীর চরাঞ্চলের কৃষকরা জানিয়েছেন, পানির অভাবে খেত শুকিয়ে যাচ্ছে। 

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ি গ্রামের কৃষক মোস্তাক আলী জানান, ১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি মাত্র দুই লিটার ডিজেল পেয়েছেন। অথচ তার ৩৩ বিঘা জমিতে প্রতিদিন অন্তত ১৩ লিটার ডিজেল প্রয়োজন।

একই অবস্থা কুড়িগ্রামের চিলমারী ও চরাঞ্চলেও। সেখানে দোকানগুলোতে তেল নেই, আর পাম্পে পাওয়া যাচ্ছে প্রয়োজনের তুলনায় নামমাত্র। কৃষকদের আশঙ্কা, দ্রুত সেচ নিশ্চিত করা না গেলে ফসল মাঠেই মারা পড়বে।

কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার চর জোরগাছ এলাকার সেকেন্দার আলী জানান, স্থানীয় দোকানগুলোতে ডিজেল শেষ হওয়ায় তাকে সাত কিলোমিটার দূরে একটি ফিলিং স্টেশনে যেতে হয়েছে। সেখান থেকে তিনি তার ৩৫ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির সামান্য অংশ মাত্র পেয়েছেন।

একই চরের খুচরা বিক্রেতা মনির হোসেন জানান, গত রোববার পর্যন্ত তার স্টকে থাকা ডিজেল তিনি বিক্রি করেছেন, কিন্তু এরপর থেকে আর সংগ্রহ করতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘কৃষক এবং মাঝিরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।’

লালমনিরহাট সদরের ফিলিং স্টেশনের মালিক মেসের আলী জানান, সরকারের বিধিনিষেধের কারণে তারা কম বিক্রি করছেন।

রাজশাহী, বগুড়া, সিলেট ও কুষ্টিয়ার কৃষক, খুচরা বিক্রেতা এবং পাম্প অপারেটররাও একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চর ভুবন পাড়ার কৃষক তবারক হোসেন জানান, ওই এলাকায় বিদ্যুৎ নেই, তাই কৃষকরা পুরোপুরি ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। তিনি বলেন, ‘এখন ধানের ভরা মৌসুম। এখনই যদি পানি দিতে না পারি, তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।’

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলার ৩১ হাজার ২৭৪টি সেচ পাম্পের মধ্যে ২৬ হাজার ৫০৬টি বা প্রায় ৮৫ শতাংশই ডিজেলচালিত।

বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার বাটির চরের আব্দুল গফুর জানান, বোরো জমিতে সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার সেচ দিতে হয়, আর অন্যান্য ফসলে অন্তত সপ্তাহে একবার পানি লাগে। এখন খুচরা বিক্রেতারা প্রতি লিটার ডিজেলে ৮-১০ টাকা বেশি নিচ্ছেন, ফলে দাম প্রায় ১১০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, অপর্যাপ্ত সেচ বোরো উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে হুমকিতে ফেলতে পারে।

তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, যেসব এলাকায় সেচ ডিজেলচালিত অগভীর মেশিনের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে পর্যায়ক্রমে সব জমিতে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পাম্পগুলোকে প্রতিদিন অন্তত ১২ ঘণ্টা চালাতে হয়।

তিনি বলেন, ‘কৃষকরা যাতে প্রয়োজনীয় ডিজেল পান সেজন্য আমরা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করছি।’

কুষ্টিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকরাও সংকটের কথা জানিয়েছেন। সোনাইডাঙ্গা গ্রামের মোহাম্মদ আলী জানান, বিত্তিপাড়া ফিলিং স্টেশনে গত কয়েকদিন ধরে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে তিনি স্থানীয় দোকানদারদের কাছ থেকে ২০ থেকে ২৫ টাকা বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

তবে কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. শওকত হোসেন ভূঁইয়া জানান, তারা এখনো অতটা বড় মাত্রার কোনো সংকট দেখছেন না।

সিলেটের হাওর এলাকার কৃষকরা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওরের পালের মোড়া গ্রামের সুধীন বিশ্বাস জানান, বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় হাওর স্বাভাবিকের চেয়ে আগেই শুকিয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের বেশি সেচ প্রয়োজন, কিন্তু ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা বড় সংকটে আছি।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম জানান, অধিদপ্তর মাঠ পর্যায়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত সংকট তীব্র নয়। কৃষক ও পাম্প মালিকরা যাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি পান, সেজন্য আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করব।’

তবে তিনি সতর্ক করেন যে, যুদ্ধের কারণে সরবরাহ বিঘ্নিত হলে দীর্ঘমেয়াদে তা কৃষিতে প্রভাব ফেলবে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, বৈশ্বিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের তেল কম দেওয়ার সিদ্ধান্তটি বোধগম্য। তবে কৃষিকে অবশ্যই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। দেশের বোরো আবাদের ৬০ শতাংশের বেশি ডিজেলচালিত সেচের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো কৃষির ডিজেলেও ভর্তুকি দেওয়া জরুরি।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন লালমনিরহাট থেকে এস দিলীপ রায়, বগুড়া থেকে মোস্তফা সবুজ, রাজশাহী থেকে সোহানুর রহমান রাফি, মৌলভীবাজার থেকে মিন্টু দেশোয়ারা এবং কুষ্টিয়া থেকে আনিস মণ্ডল]

 

Popular

More like this
Related

ঈদে টেলিভিশনে দেখা যাবে যে ১৪ সিনেমা

ঈদের আনন্দ বাড়িয়ে দিতে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর থাকে বাড়তি আয়োজন।...

শাকিব খান পেশাদার শিল্পী, সুপারস্টার হয়েও শিল্পী হিসেবেই মেশেন: অপু

আসন্ন ঈদে মুক্তি পাচ্ছে শাকিব খান অভিনীত চলচ্চিত্র ‘প্রিন্স’।...

সুস্থ হয়ে উঠছেন সালমান খানের বাবা, শিগগিরই হাসপাতাল ছাড়বেন

বলিউড অভিনেতা সালমান খানের বাবা ও প্রখ্যাত স্ক্রিপ্টরাইটার সেলিম...

গোপালগঞ্জে কলেজ শিক্ষার্থী খুন, ২ বন্ধুকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া গেল মরদেহ

গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলায় সিয়াম (১৭) নামে এক কলেজ শিক্ষার্থীর...