ট্রাফিক সিগন্যাল থেকে বিশ্বকাপের মঞ্চে: যেভাবে এলো হলুদ ও লাল কার্ড

Date:

ফুটবল মাঠে রেফারির পকেট থেকে হলুদ বা লাল কার্ড বের করার দৃশ্যটি এখন চিরচেনা। কিন্তু একটা সময় ছিল, যখন ম্যাচ পরিচালনার ক্ষেত্রে খেলোয়াড়দের সতর্ক করতে বা শাস্তি দিতে এরকম কোনো দৃশ্যমান সংকেতের ব্যবস্থা ছিল না। রেফারিরা তখন কেবল মুখেই হুঁশিয়ারি দিতেন কিংবা মাঠ ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিতেন। তবে ভাষার ভিন্নতাসহ নানা কারণে তৈরি হতো চরম বিশৃঙ্খলা। আশ্চর্যজনক হলেও সেই সংকটের সমাধান মিলেছিল ট্রাফিক সিগন্যাল থেকে। হলুদ ও লাল বাতির অনুপ্রেরণায় জন্ম নেয় ফুটবল ইতিহাসের এই বৈপ্লবিক রঙিন কার্ড প্রথা, যা মাঠের ভেতরে ভাষা ও সংকেতকে এক সুতোয় গেঁথে দিয়েছে।

১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে প্রথমবার হলুদ ও লাল কার্ডের প্রবর্তন করা হয়। পরবর্তীতে তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করায় ফুটবল ছাপিয়ে অন্যান্য অনেক খেলাতেও এটি গৃহীত হয়। অথচ ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ থেকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত এই রঙিন কার্ডের মাধ্যমে ফুটবলারদের শাস্তি দেওয়ার কোনো রীতির অস্তিত্বই ছিল না।

কেনেথ অ্যাস্টনের বৈপ্লবিক উদ্ভাবন

এই বৈপ্লবিক উদ্ভাবনটি ছিল ইংলিশ রেফারি কেন অ্যাস্টনের মস্তিষ্কপ্রসূত। পেশায় স্কুলশিক্ষক হলেও মাঠের মাঝখানে বাঁশি হাতে ম্যাচ পরিচালনা করাটা তিনি বেশ উপভোগ করতেন। ১৯৩৬ সালে তিনি পেশাদার রেফারির যোগ্যতা অর্জন করেন। প্রায় তিন দশকের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ১৯৬৩ সালে তিনি মর্যাদাপূর্ণ এফএ কাপের ফাইনাল পরিচালনা করে অবসরে যান। তবে মাঠ ছাড়লেও ফুটবলের শৃঙ্খলা রক্ষায় তিনি এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখে যান।

১৯৬০-এর দশকের শুরুতে ফুটবল কেবল আর পায়ের জাদুতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা রূপ নিয়েছিল চরম এক আগ্রাসনে। খেলোয়াড়দের মেজাজ এতটাই চড়া হয়ে উঠছিল যে, খোদ রেফারির পক্ষেও ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। ৯০ মিনিটের লড়াই অনেক সময়ই বল ছেড়ে হাতাহাতি আর মারামারিতে গিয়ে ঠেকত। মাঠের সেই দৃশ্যগুলো তাই কোনো যুদ্ধবিগ্রহের মহড়া বলেই বেশি মনে হতো। এই সহিংসতা কখনও কখনও ভয়াবহ রূপ নিত। ফলে অনেক ফুটবলারকে গুরুতর আহত অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সে করে সোজা হাসপাতালেও পাঠাতে হতো। সেসব ঘটনাই মূলত বাধ্য করেছিল নতুন কোনো নিয়মের কথা ভাবতে।

২০০১ সালে মৃত্যুর আগে ফিফার ওয়েবসাইটে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘ইউরেকা’ মুহূর্তটির স্মৃতিচারণ করে অ্যাস্টন বলেছিলেন, ‘আমি যখন কেনসিংটন হাই স্ট্রিট দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন ট্রাফিক লাইটটি লাল হয়ে গেল। আমি ভাবলাম, “হলুদ মানে হলো সাবধান হওয়া; আর লাল মানে থেমে যাওয়া”, অর্থাৎ তুমি মাঠের বাইরে!’

‘ব্যাটল অফ সান্তিয়াগো’

অ্যাস্টনের ক্যারিয়ারের অন্যতম কঠিন পরীক্ষা ছিল ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপে স্বাগতিক চিলি ও ইতালির মধ্যকার গ্রুপ পর্বের সেই কুখ্যাত ম্যাচ, যা ইতিহাসে ‘ব্যাটল অফ সান্তিয়াগো’ নামে পরিচিত। প্রায় ৬৬ হাজার দর্শকের সামনে সেদিন ফুটবল মাঠ যেন সত্যিই পরিণত হয়েছিল লড়াইয়ের ময়দানে।

ম্যাচের আগেই দুই ইতালিয়ান সাংবাদিক চিলিকে নিয়ে অত্যন্ত অপমানজনক দুটি নিবন্ধ লেখেন। এর একটিতে দেশটির রাজধানী সান্তিয়াগোকে ‘বিশ্বের অনগ্রসর দেশগুলোর এক করুণ প্রতিচ্ছবি, যা সম্ভাব্য সকল সামাজিক ব্যাধিতে জর্জরিত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই লেখাগুলো চিলির সাধারণ মানুষের মনে চরম ক্ষোভ তৈরি করে। পরিস্থিতি ভীষণ উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় ওই দুই সাংবাদিককে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চিলি ছেড়ে ইতালিতে ফিরে যেতে হয়। এমনকি দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার উপক্রমও হয়।

২ জুন অনুষ্ঠিত ম্যাচটিতে মাঠে ঢোকার সময় ইতালির খেলোয়াড়রা গ্যালারিতে থাকা দর্শকদের শান্ত করতে তাদের দিকে সাদা রঙের ফুল ছুড়ে দেন। তবে চিলির ভক্ত-সমর্থকরা তা প্রত্যাখ্যান করেন। শুরু থেকেই ফুটবল গৌণ হয়ে পড়ে, আর মুখ্য হয়ে দাঁড়ায় দুই দলের ব্যক্তিগত আক্রমণ। একে অপরকে লাথি ও ঘুষি মারা ৯০ মিনিট জুড়ে নিয়মিত দৃশ্যে পরিণত হয়। উত্তেজনাপূর্ণ ও আবেগময় লড়াইয়ের প্রথমার্ধেই দুজন ইতালিয়ান খেলোয়াড়কে মাঠ থেকে বের করে দেন অ্যাস্টন।

শেষ পর্যন্ত চিলি ২-০ গোলে জয়লাভ করে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয়। এই জয় চিলিয়ানদের জন্য ফুটবলের চেয়েও বড় এক সম্মানের লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অনেক বছর পরে অ্যাস্টন মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমি কোনো ফুটবল ম্যাচ পরিচালনা করছিলাম না, আমি যেন সামরিক মহড়ার আম্পায়ার হিসেবে কাজ করছিলাম।’

ক্রাইটলাইনের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভ্রান্তি ও রাতিনের সেই চাউনি

‘ব্যাটল অফ সান্তিয়াগো’ ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিলেও কার্ড প্রথার মূল তাড়নাটি আসে ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে। ২৩ জুলাই ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে স্বাগতিক ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার ম্যাচটি এতটাই উত্তপ্ত ছিল যে, রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ততদিনে বাঁশি তুলে রাখলেও ফুটবলের সঙ্গ ছাড়েননি অ্যাস্টন। তিনি ১৯৬৪ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত ফিফার রেফারি কমিটির সদস্য ছিলেন। এর মধ্যে ১৯৬৬ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত চার বছর ছিলেন কমিটির চেয়ারম্যান। আর ১৯৬৬, ১৯৭০ এবং ১৯৭৪— টানা তিনটি বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সকল রেফারির অভিভাবক ছিলেন তিনি।

ওই ম্যাচে দুই দলের খেলোয়াড়দের আগ্রাসী শরীরী ভাষা ও তর্কের কারণে বারবার খেলায় বিঘ্ন ঘটছিল। ৩৫তম মিনিটে আন্তোনিও রাতিনকে মাঠ থেকে বের করে দেওয়া হয় রেফারির একটি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করায়। জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রাইটলাইন পরবর্তীতে আর্জেন্টিনার অধিনায়ককে সাজা দেওয়ার পেছনে এক অদ্ভুত কারণ দর্শান। তার ভাষ্যমতে, ‘রাতিন যেভাবে আমার দিকে তাকিয়েছিল, সেই চাউনিটা আমার একদম পছন্দ হয়নি!’

মাঠের মাঝখানে দুজনের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ চলে। মজার ব্যাপার ছিল, ক্রাইটলাইন স্প্যানিশ ভাষা জানতেন না, আর রাতিন জানতেন না জার্মান। খেলা প্রায় ১০ মিনিট বন্ধ রাখতে হয় একজন অনুবাদক না পৌঁছানো পর্যন্ত। শেষ পর্যন্ত রাতিন যখন গালমন্দ ও বাজে অঙ্গভঙ্গি করতে করতে মাঠ ছাড়েন, তখন দর্শক ও ধারাভাষ্যকাররা পুরো বিষয়টি নিয়ে চরম বিভ্রান্তিতে পড়ে যান। সেখানেই শেষ নয়, ঘটনার রেশ গড়ায় শৃঙ্খলা কমিটি পর্যন্ত। রাতিনকে চার ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়।

বিতর্কিত সেই ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত দুই ভাই ববি চার্লটন ও জ্যাক চার্লটনকেও সতর্ক করেছিলেন ক্রাইটলাইন। কিন্তু তার সংকেত বা ভাষা কাউকে স্পষ্ট ধারণা দিতে পারেনি। ফলে আর কোনো ভুল করলে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হওয়ার শঙ্কা থাকলেও চার্লটন ভাইয়েরা তা টেরই পাননি। পরিস্থিতি এতটাই ঘোলাটে ছিল যে, খোদ ইংল্যান্ডের কোচ আল্ফ রামসে বিষয়টি পরিষ্কার হতে পরবর্তীতে ফিফার দ্বারস্থ হয়েছিলেন।

ওই যুগে সতর্ক করার সময় রেফারিরা তাদের পকেটে থাকা ছোট নোটবুক বা ডায়েরিতে সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়ের নাম ও অপরাধের কথা টুকে রাখতেন। সমস্যাটা ছিল সেখানেই, ভাষাগত ব্যবধানের কারণে অনেক সময়ই খেলোয়াড়রা কিংবা গ্যালারির দর্শকরা বুঝতে পারতেন না আসলে কী ঘটছে। রেফারি কাকে সতর্ক করছেন, তা নিয়েও চরম ধোঁয়াশা তৈরি হতো।

ট্রাফিক সিগন্যাল থেকে সমাধান

ওয়েম্বলির চরম বিশৃঙ্খলার পর অ্যাস্টন গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেন, কীভাবে ভবিষ্যতে এই ধরনের বিভ্রান্তি এড়ানো যায়। একদিন ওয়েম্বলি থেকে ল্যাঙ্কাস্টার গেটে নিজের বাড়িতে গাড়ি চালিয়ে ফিরছিলেন তিনি। পথে ট্রাফিক সিগন্যালের হলুদ ও লাল বাতি দেখে হঠাৎ সেই চমৎকার বুদ্ধি খেলে যায় তার মাথায়।

বাড়ি ফিরে স্ত্রী হিল্ডার কাছে নতুন ভাবনার কথা খুলে বলেন অ্যাস্টন। সব শুনে হিল্ডা ঘর থেকে বেরিয়ে যান এবং কিছুক্ষণ পর ফিরে আসেন সাধারণ আর্ট পেপার কেটে তৈরি করা দুটি রঙিন কার্ড নিয়ে— একটি হলুদ, অন্যটি লাল। কার্ডগুলো এমন মাপে কাটা হয়েছিল যেন সেগুলো অনায়াসেই রেফারির পকেটে এঁটে যায়। কাগজের সেই টুকরো দুটিই ছিল ফুটবলের নতুন যুগের সূচনা। অত্যন্ত সাধারণ উদ্ভাবনটি প্রমাণিত হলো এক জাদুকরী সমাধান হিসেবে। এক জোড়া রঙিন কার্ডই শেষ পর্যন্ত মাঠের ভেতরে ভাষাগত দূরত্বের দেয়াল ভেঙে রেফারিদের হাতে তুলে দিল এক সর্বজনীন ক্ষমতা।

Popular

More like this
Related

ঝড়-বৃষ্টিতে জয়পুরহাটের ৮২১ হেক্টর জমির আলু নষ্ট, ক্ষতির মুখে জামালপুরের ভুট্টা চাষি

উত্তরবঙ্গের জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলায় গত চার দিনের বৃষ্টি...

নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে ২৫ বছরে ৩ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় সম্ভব বাংলাদেশের

বাংলাদেশ এক গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা উন্নয়নের মাধ্যমে ২৫ বছরে...

জামালপুরে থানার নির্মাণাধীন ভবনের ছাদধসে ৮ শ্রমিক আহত

জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলায় নির্মাণাধীন থানা ভবনের ছাদের একটি অংশ...

ক্ষতিকর ফেসবুক কনটেন্টে বাংলাদেশে মানবাধিকার ঝুঁকিতে: অ্যামনেস্টি

যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ফেসবুকে ক্ষতিকর কনটেন্ট...