জ্বালানি সংকটে হিমশিম খাচ্ছেন ভাড়ার মোটরসাইকেল চালকরা

Date:

খুলনার উপকূলীয় অঞ্চলে জেলা শহর থেকে উপজেলা, ইউনিয়ন কিংবা গ্রামে যেতে বহু মানুষ ভাড়ার মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভর করেন। দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা, অন্য যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী সড়ক, দুর্গম এলাকায় দ্রুত পৌঁছানোর প্রয়োজন—সব মিলিয়ে এসব এলাকায় ভাড়ার মোটরসাইকেল গুরুত্বপূর্ণ বাহন হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

খুলনার দাকোপ, কয়রা ও পাইকগাছা; বাগেরহাটের শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ, মোংলা ও রামপাল এবং সাতক্ষীরার আশাশুনি, তালা, কলারোয়া, শ্যামনগর ও মুন্সিগঞ্জের মতো এলাকায় সড়কের দুরবস্থা ও গণপরিবহনের সীমিত সুযোগের কারণে হাজারো মানুষ মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরশীল।

খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলায় ভাড়ার মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন হাজার হাজার মানুষ। তবে চলমান জ্বালানি সংকটের কারণে তাদের অনেকেই এখন জীবন-জীবিকা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন।

অলকেশ গোলদারের বাড়ি খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার চক শৈলমারী গ্রামে। ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি খুলনা নগরীর গল্লামারি এলাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের বটিয়াঘাটা, দাকোপ, কয়রা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন করেন। দুর্গম পথ হওয়ায় এসব অঞ্চলে মোটরসাইকেলের মাইলেজও কম পাওয়া যায়। এর ওপর বর্তমান তেল সংকট তার মতো চালকদের জন্য নতুন বিপদ ডেকে এনেছে।

অলকেশ বলেন, ‘খুলনার দক্ষিণে কালাবগী এলাকায় একবার যেতে কমপক্ষে তিন লিটার তেল লাগে। যাওয়া-আসা মিলিয়ে লাগে প্রায় পাঁচ লিটার। কিন্তু এখন তিনি কোনোভাবেই সেই পরিমাণ তেল সংগ্রহ করতে পারছেন না। ফলে বাধ্য হয়ে কাছাকাছি এলাকায় যাতায়াত করছেন। আবার প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা শুধু তেল নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। গত ১৫ দিনে আমার আয় প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে।’

‘আগে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা আয় করতাম। এখন তা নেমে এসেছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকায়। কবে এই সমস্যার সমাধান হবে, সেটাও বলতে পারছি না। এই গাড়ি চালানো ছাড়া অন্য কোনো কাজও তো করতে পারি না,’ বলেন অলকেশ।

চালনা ডাকবাংলা মোটরসাইকেল চালক সমবায় সমিতির সভাপতি জয় প্রকাশ রায় ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘খুলনা জেলায় বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়নে ৭০টির মতো মোটরসাইকেল চালকদের সংগঠন রয়েছে। সেখানে কমপক্ষে সাড়ে ৯ হাজারের মতো চালক রয়েছে। শুধু দাকোপ উপজেলায় বটবনিয়া, পোদ্দারগঞ্জ, মোজামনগর, বাজুয়া, ঘাটাইল, লক্ষীখোলা, সুতারখালীসহ ১৬টি সংগঠনের দেড় হাজারের বেশি মোটরসাইকেল চালক আছেন। যাদের শতকরা ৭০ শতাংশ এখন কর্মহীন হয়ে পড়েছে শুধুমাত্র জ্বালানি তেলের অভাবে।’

এদিকে ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরাও। কয়রার উত্তর বেদকাশী এলাকার উন্নয়নকর্মী সালমা বেগম জানান, যাতায়াত এখন দিন দিন অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।

দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘আগে খুব সহজেই মোটরসাইকেল পাওয়া যেত। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়, তারপরও অনেক সময় যাতায়াতের জন্য মোটরসাইকেল পাওয়া যায় না। যদিও দুই একটা পাওয়া যায় তার ভাড়া অনেক বেশি।’

সাতক্ষীরা জেলায় পাঁচ হাজারের বেশি মোটরসাইকেল চালক রয়েছেন। 

জেলার মোটরসাইকেলচালক সমিতির সভাপতি শাহিনুর রহমান বলেন, ‘জেলায় পাঁচ হাজারের বেশি চালক রয়েছেন, যারা শুধু মোটরসাইকেল চালিয়েই জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের অনেকেই ঋণ নিয়ে মোটরসাইকেল কিনে এই পেশায় এসেছেন।’

অর্থনীতিবিদ ও সুন্দরবন একাডেমির পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির জানান, বেকার তরুণরা সাধারণত রাইড-শেয়ারিং মোটরসাইকেল সেবার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। এই সংকটে তারা আরও বেশি অর্থনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে পড়বেন।

দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘সরকারের উচিত যেকোনো উপায়ে এই পেশায় নিয়োজিত মানুষদের সহায়তা দেওয়া। আয় কমতে থাকলে শুধু তাদের পরিবারই নয়, দুর্গম এলাকার মানুষের জরুরি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়বে।’

Popular

More like this
Related

ইরান যুদ্ধে ইউরোপ কি প্রচ্ছন্ন প্রতিরোধ গড়ে তুলছে?

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান এক মাসব্যাপী সংঘাত ক্রমেই আন্তর্জাতিক...

বিমানবন্দর থেকে ফেরার পথে প্রবাসীর গাড়িতে ডাকাতি, গুলিবিদ্ধ চালক

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলায় সৌদি ফেরত এক প্রবাসীর গাড়িতে ডাকাতির...

মধ্যপ্রাচ্যে মেটা, গুগল ও অ্যাপলসহ মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিতে হামলার হুমকি ইরানের

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) মধ্যপ্রাচ্যে মেটা, গুগল...

ইসরায়েলকে আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি ফ্রান্স, সমালোচনায় মুখর ট্রাম্প

ইরানে হামলায় ইউরোপীয় মিত্রদেশগুলোকে পাশে না পেয়ে আবারও তাদের...