জয়শ্রী কবির অভিনীত চরিত্রগুলো কী বলেছে সমাজকে

Date:

বাংলা সিনেমার ইতিহাসে কিছু অভিনেত্রী আছেনযাদের কাজ কেবল পর্দায় সীমাবদ্ধ থাকে না। সময় পেরিয়ে তাদের চরিত্রগুলো সমাজের সঙ্গে কথা বলতে থাকে। 

জয়শ্রী কবির ঠিক তেমনই একজন অভিনেত্রী। 

তিনি কখনো উচ্চকণ্ঠের নায়িকা ছিলেন না, ছিলেন না গ্ল্যামারের ঝলমলে প্রতীক। কিন্তু তার অভিনীত নারীরা ছিল জীবনের মতোই বাস্তব—সংযত, গভীর এবং ভেতরে ভেতরে প্রশ্নে ভরা।

সত্তরের দশক থেকে আশির দশকের শুরুর দিকে নারীর মানসিক অবস্থান, দ্বন্দ্ব ও নীরব সংগ্রামকে জয়শ্রী কবির তার চরিত্রের ভেতর দিয়ে তুলে ধরেছেন।

‘সূর্যকন্যা’, ‘সীমানা পেরিয়ে’, ‘রূপালী সৈকতে’, ‘মোহনা’—এই চলচ্চিত্রগুলো কেবল গল্প নয়, এগুলো সময়ের সামাজিক দলিল, যেখানে নারীর চোখ দিয়ে সমাজকে দেখা হয়েছে।

জয়শ্রী কবিরের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তার নীরবতা। এই নীরবতা কোনো দুর্বলতার প্রকাশ নয়, বরং গভীর আত্মবিশ্বাসের চিহ্ন। তার চরিত্রগুলো খুব কমই বড় সংলাপ দেয়, নাটকীয় আবেগও দেখায় কম। অথচ দর্শক অনুভব করে—এই নারীর ভেতরে অনেক কথা জমে আছে।

সেই সময়ের বাংলা সিনেমায় নারী চরিত্র মানে প্রায়শই ছিল কান্না, আত্মত্যাগ অথবা অতিনাটকীয় প্রতিবাদ। জয়শ্রী কবির এই প্রচলিত কাঠামো থেকে আলাদা ছিলেন। 

তিনি দেখিয়েছেন—একজন নারী চুপ থেকেও নিজের অবস্থান বোঝাতে পারেন। চোখের দৃষ্টি, মুখের ভঙ্গি, হাঁটার গতি কিংবা হঠাৎ থেমে যাওয়ার ভেতর দিয়ে তিনি সমাজের সঙ্গে কথোপকথন করেছেন।

সূর্যকন্যা ছবিতে জয়শ্রী কবিরের চরিত্রটি একদিকে আশার প্রতীক, অন্যদিকে বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করতে থাকা এক নারী। নামেই আছে সূর্যের ইঙ্গিত—আলো, উষ্ণতা, শক্তি। কিন্তু এই শক্তি তিনি প্রকাশ করেন ভেতর থেকে।

এই ছবির নারী চরিত্রটি সমাজের বিরুদ্ধে সরাসরি দাঁড়ায় না, আবার পুরোপুরি মেনেও নেয় না। তিনি নিজের অবস্থান বুঝতে চান, নিজের জীবনকে উপলব্ধি করতে চান। এখানে নারী মানে শুধু প্রেমিকা বা পরিবারের অংশ নয়। নারী একজন মানুষ, যার ভেতরে নিজস্ব ভাবনা আছে।

জয়শ্রী কবির এই চরিত্রে দেখান, নারীর শক্তি সবসময় দৃশ্যমান নয়। কখনো কখনো নিজের ভেতর আলো জ্বালিয়ে রাখাটাই সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ।

সীমানা পেরিয়ে শুধু ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক সীমার গল্প নয়। 

এই ছবিতে সীমা মানে সামাজিক নিয়ম, পারিবারিক প্রত্যাশা, আর নারীর নিজের ভেতরের ভয়। জয়শ্রী কবিরের চরিত্রটিও এমন এক নারীর—যিনি বুঝতে পারেন, সব সীমা চোখে দেখা যায় না।

এই চরিত্রের বড় বৈশিষ্ট্য হলো দ্বন্দ্ব। তিনি জানেন কী চান, আবার জানেন সমাজ কী চায়। এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি একধরনের নীরব লড়াই চালিয়ে যান। 

তার মুখে উচ্চস্বরে প্রতিবাদের ভাষা নেই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি সীমা ছুঁয়ে দেখেন, শেষপর্যন্ত তা  অতিক্রম করেন। 

রূপালী সৈকতে জয়শ্রী কবিরের অভিনয় আরও সংযত, আরও আত্মমুখী। এই ছবিতে নারী চরিত্রটি যেন নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথনে ব্যস্ত। জীবনের নানা বাঁক, অপূর্ণতা, না-বলা কথাগুলো এখানে খুব নরমভাবে উঠে আসে।

সৈকতের মতোই এই চরিত্র—কখনো শান্ত, কখনো ঢেউয়ের মতো অস্থির। এখানে নারীকে কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক পরিচয়ে আটকে রাখা হয়নি। তিনি প্রেমিকাও হতে পারেন, স্ত্রীও হতে পারেন, আবার নিঃসঙ্গ একজন মানুষও হতে পারেন।

জয়শ্রী কবির এই চরিত্রে দেখান, নারীর জীবনে এমন সময় আসে, যখন তিনি নিজের কাছ থেকেই উত্তর খোঁজেন।

মোহনা ছবির নামের মধ্যেই এক গভীর অর্থ আছে। নদীর মতো জীবনও বয়ে চলে—কখনো শান্ত, কখনো অস্থির। এই ছবিতে জয়শ্রী কবিরের চরিত্রটি ঠিক তেমনই। তিনি কোনো নাটকীয় নায়িকা নন, বরং জীবনের স্রোতে থাকা একজন নারী।

এই চরিত্রের লড়াই খুব ছোট ছোট ঘটনায়। সংসার, সম্পর্ক, দায়িত্ব—সবকিছুর ভেতর দিয়ে তিনি নিজেকে সামলে রাখেন। এখানে কোনো বড় সিদ্ধান্ত বা হঠাৎ মোড় নেই। আছে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা, নিজের মতো করে টিকে থাকার চেষ্টা।

এই ছবির মাধ্যমে বোঝা যায়—নারীর সংগ্রাম সবসময় দৃশ্যমান নয়, কিন্তু তা গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী।

জয়শ্রী কবিরের চরিত্রগুলো পুরুষকেন্দ্রিক সমাজকে অস্বীকার করে না। বরং খুব স্বাভাবিকভাবে সেই বাস্তবতাকে তুলে ধরে। নারীরা সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে খুব কমই থাকেন, কিন্তু ফল ভোগ করেন সবচেয়ে বেশি এটিই প্রতীয়মান হয়।

তিনি দেখিয়েছেন, পরিবার টিকিয়ে রাখার মানসিক দায়িত্ব প্রায়শই নারীর ওপরই পড়ে। অথচ সিদ্ধান্তের সময় তার মতামত গুরুত্ব পায় না। এই বৈপরীত্য জয়শ্রী কবির সংলাপ নয় শুধু দৈনন্দিন জীবনের দৃশ্যের মধ্যেই তুলে ধরেছেন।

জয়শ্রী কবিরের অভিনয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বয়স। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার চরিত্রগুলো আরও গভীর হয়েছে। 
তিনি প্রমাণ করেছেন, বয়স বাড়া মানেই নারী চরিত্রের গুরুত্ব কমে যাওয়া নয়।

মধ্যবয়সী বা পরিণত বয়সের নারীর চরিত্রে তিনি যে স্থিরতা, বাস্তববোধ ও সংযম এনেছেন, তা বাংলা সিনেমায় বিরল। 
এই চরিত্রগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নারীর জীবন কোনো নির্দিষ্ট বয়সে থেমে যায় না।

জয়শ্রীর পোশাক, সাজ, চলাফেরা—সবকিছুতেই ছিল সাধারণ জীবনের ছাপ। এই বাস্তবতাই তার চরিত্রগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করেছে।

তার অভিনীত নারীরা আমাদের চারপাশের মানুষ—তবে তারা চিন্তায় আধুনিক ও সংস্কারমুক্ত। এই জায়গা থেকেই তার অভিনীত চরিত্রগুলো সমাজের সঙ্গে কথা বলে।

জয়শ্রী কবিরের চরিত্রগুলো আমাদের শেখায়—নারীর গল্প মানে শুধু প্রেম বা ত্যাগ নয়। নারীর গল্প মানে সময়ের সঙ্গে লড়াই, নিজের ভেতরের দ্বন্দ্ব, আর নীরবে টিকে থাকার শক্তি।

তিনি আমাদের দেখিয়েছেন, চুপ করে থাকাও কখনো কখনো সবচেয়ে জোরালো ভাষা হতে পারে। নারীরা তাই আজও সময়ের আয়নায় দাঁড়িয়ে সমাজকে প্রশ্ন করে—আমরা কি সত্যিই নারীর কথা শুনতে শিখেছি?

Popular

More like this
Related

নির্বাচন কমিশন ভবনের পাশে ককটেল-সদৃশ বস্তু উদ্ধার

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ভবনের পাশে স্বর্ণালি চত্বরে...

শাহরুখ খানের ‘কিং’ মুক্তি পাবে ২৪ ডিসেম্বর

বলিউড সুপারস্টার শাহরুখ খান অভিনীত ও সিদ্ধার্থ আনন্দ পরিচালিত...

‘বরফ যুগে’ ঢুকছে সৌদি আরব, কাতার?

সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোয় দেখা গেল—বিস্তীর্ণ উঁচুনিচু এলাকাজুড়ে সাদা...

দুবার জীবন পেয়ে মুমিনুলের ফিফটি, বড় রানের দিকে মুশফিকও 

লাঞ্চ থেকে ফিরেই সহজ ক্যাচ উঠিয়েছিলেন মুমিনুল হক। পরে...