অ্যাপোলো মিশনের দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর আবার চাঁদের পথে পা বাড়িয়েছে মানুষ। চার নভোচারীকে নিয়ে নাসার মহাকাশযান আর্টেমিস-২ উড়াল দিয়েছে গতকাল রাতে। এই নভোচারীরা চাঁদের কক্ষপথে ১০ দিন ভ্রমণ করবেন, তারপর পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। কিন্তু তারা চাঁদের পৃষ্ঠে নামবেন না।
স্পেস.কমের প্রতিবেদনে বলা হয়, আর্টেমিস মিশনের প্রথম চাঁদে অবতরণ হবে আর্টেমিস-৪, যা ২০২৮ সালের আগে সম্ভব নয়। কারণ, আর্টেমিস-২ এর মহাকাশযান অরিয়ন চাঁদে অবতরণ করার মতো করে তৈরি হয়নি। মূলত এই মিশনের মাধ্যমে নাসা ধাপে ধাপে পরীক্ষা চালাচ্ছে, যেন ভবিষ্যতে মানুষ নিরাপদে চাঁদে অবতরণ করতে পারে।
এর আগে ২০২২ সালে আর্টেমিস-১ এর অরিয়ন মহাকাশযান মানুষ ছাড়া চাঁদের কক্ষপথে গিয়েছিল এবং ফিরে এসেছিল। এবার আর্টেমিস-২-তে মানুষসহ অরিয়ন ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রথমবারের মতো এখানে লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম থাকবে এবং মহাকাশচারীরা পৃথিবীর কক্ষপথে ক্যাপসুল ব্যবহারের দক্ষতা যাচাই করবেন। নাসার ভাষায়, এই মিশন ‘মহাকাশের গভীরে মানুষসহ সব সিস্টেম ঠিকভাবে কাজ করছে কি না তা নিশ্চিত করবে’ এবং ভবিষ্যতে চাঁদে অবতরণের পথ তৈরি করবে।
প্রথমে পরিকল্পনা ছিল আর্টেমিস-৩ মানুষ নিয়ে ২০২৭ সালে চাঁদে অবতরণ করবে। তবে এখন পরিকল্পনা পরিবর্তন করা হয়েছে। জানানো হয়েছে, আর্টেমিস-৩-তে পৃথিবীর কক্ষপথে অরিয়ন ও বেসরকারি ল্যান্ডারের মধ্যে ডকিং এবং সংযোগ যাচাই করা হবে। যেমন স্পেসএক্স স্টারশিপ বা ব্লু মুন ল্যান্ডার। তখন সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আর্টেমিস-৪ এর মাধ্যমে ২০২৮ সালে মানুষ চাঁদের মাটিতে পা রাখবে।
আর্টেমিস মিশনের শুরুতে লক্ষ্য ছিল ২০২৪ সালে মানুষকে চাঁদের পৃষ্ঠে পৌঁছে দেওয়া। ২০১৯ সালে তখনকার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এই কর্মসূচির ঘোষণা করেছিলেন। তবে তার আরও আগে থেকে মিশনের অনেক দরকারি জিনিস তৈরি করা হচ্ছিল। যেমন—অরিয়ন মহাকাশযান, এসএলএস রকেট। ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় মানুষকে চাঁদে পাঠানোর পরিকল্পনাকে তাদের সরকারি নীতি হিসেবে ঘোষণা দেন।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরে নাসার একজন সিনিয়র ম্যানেজার এই মিশনের জন্য ‘ডি-মাইনাস পিন’ তৈরি করেছিলেন। যেখানে দেখানো হতো, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর আসতে কত দিন বাকি। তার উদ্দেশ্য ছিল সবাই প্রতিদিন গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করুক, তবে তাড়াহুড়ো না হোক।
কিন্তু ২০২১ সালে এসে নাসা জানাল, ২০২৪ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানো সম্ভব নয়। তার প্রধান কারণ হলো নতুন চন্দ্র স্পেসস্যুট (এক্সইএমইউ) সময়মতো তৈরি হয়নি। পরে নাসা বাণিজ্যিক সমাধান হিসেবে এক্সিওম স্পেসের দিকে মনোযোগ দেয়, যা নিয়ে এখনো কাজ চলছে।
শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের লক্ষ্য ধীরে ধীরে বাদ পড়ে। কারণ নীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করতেন, তাদের লক্ষ্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী হলেও বাস্তবসম্মত নয়। এখন আর্টেমিস মিশন চাঁদের পৃষ্ঠে মানুষের অবতরণের জন্য ২০২৮ সালের আর্টিমিস-৪-কে বেছে নিয়েছে।
২০২১ সালে নাসা থেকে আর্টেমিস-৩ মিশনের জন্য স্টারশিপ ব্যবহার করতে ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি পায় স্পেসএক্স। এই কাজে অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে ছিল ব্লু অরিজিন এবং ডাইনেটিক্স, তারা চুক্তির বিরুদ্ধে আপিল ও মামলা করে। পরে ব্লু অরিজিনকে আর্টেমিস-৫ এর জন্য দ্বিতীয় এইচএলএস ভেন্ডর হিসেবে ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করে।
এরপর ২০২৩ সালে স্টারশিপের প্রথম পূর্ণ ফ্লাইট পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু সফলতার মুখ দেখেনি। কারণ এর দুটি স্তর আলাদা হতে পারেনি। এটি নিয়ে নাসা চিন্তিত ছিল এবং মহাপরিদর্শক জানিয়েছিলেন, এই সমস্যার কারণে চাঁদে অবতরণ দুই বছর পিছিয়ে যেতে পারে।
তবুও ২০২৫ সালে স্পেসএক্স পাঁচটি পরীক্ষা চালিয়েছে। প্রথম তিনটি পুরোপুরি সফল হয়নি, কিন্তু আগস্ট ও অক্টোবরের ফ্লাইট সম্পূর্ণ সফল হয়েছে বলে তারা জানায়। সেই ফ্লাইটে স্টারশিপের ওপরের অংশ মহাকাশ থেকে ফিরে অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম উপকূলে পড়ে, আর সুপার হেভি বুস্টার ঠিকভাবে মেক্সিকো উপসাগরে অবতরণ করে।
আর্টেমিস-১ মিশন ঠিকভাবে শেষ হলেও অরিয়ন মহাকাশযানের হিট শিল্ডে বেশি ক্ষয় দেখা দেয়। নাসা এই সমস্যার কারণ খুঁজতে থাকে। ২০২৪ সালের মে মাসের এক রিপোর্টে বলা হয়, হিট শিল্ড আলাদা করার বোল্ট এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় কিছু সমস্যা আছে, যা ক্রুর জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এরপর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আর্টেমিস-২ এবং আর্টিমিস-৩ এর উড্ডয়ন ২০২৬ ও ২০২৭ সালে সরিয়ে নেয় নাসা। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, মহাকাশযান পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত সময় নেওয়া। তারা অরিয়নের হিট শিল্ড পরিবর্তনের পরিবর্তে পুনঃপ্রবেশের পথ পরিবর্তন করে এবং নাসা আশ্বাস দেয়, পরিকল্পিত মিশনের সময় সবাই নিরাপদ থাকবে।
আর্টেমিস-২ মিশনের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে আর্টেমিস-৩ ও আর্টেমিস-৪ এর পরিকল্পনা করবে নাসা। বর্তমানে পরিকল্পনা অনুযায়ী, আর্টেমিস-৩ লঞ্চ হবে ২০২৭ সালে এবং আর্টেমিস-৪ লঞ্চ হবে ২০২৮ সালে। এই দুই মিশনে অন্তত একটি ব্যক্তিগত ল্যান্ডার প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন। স্পেসএক্সের অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, তারা আশা করছে প্রথমে ২০২৬ সালে স্টারশিপের মধ্যে কক্ষপথে জ্বালানি স্থানান্তর, এরপর ২০২৭ সালে মানববিহীন চাঁদে অবতরণ এবং ২০২৮ সালে মানুষসহ চাঁদে অবতরণ।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ট্রাম্প প্রশাসন মহাকাশ বিষয়ক একটি নির্বাহী আদেশও এই সময়সূচীর কথা জানিয়েছে। তারা আর্টেমিস মিশনের মাধ্যমে ২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানোর নির্দেশনা দিয়েছে। নতুন নাসা প্রধান জ্যারেড আইজ্যাকম্যান জানিয়েছেন, যত দ্রুত সম্ভব চাঁদের পৃষ্ঠে মানববাহী মহাকাশযান অবতরণ করুক। তবে তিনি বলছেন, এই ল্যান্ডিংয়ের আগে কক্ষপথে জ্বালানি স্থানান্তর কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করা জরুরি।