এপ্রিল থেকেই চালু হচ্ছে ডিজিটাল ‘ফুয়েল পাস’ ব্যবস্থা

Date:

জ্বালানি বিক্রি নিয়ন্ত্রণ, আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি কেনা ঠেকানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে সরকার এপ্রিল থেকেই কিউআর কোডভিত্তিক ডিজিটাল ‘ফুয়েল পাস’ ব্যবস্থা চালু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

জ্বালানি বিভাগ বলছে, মোবাইল অ্যাপভিত্তিক এই ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে মোটরসাইকেলে জ্বালানি বিতরণ করা হবে। নিবন্ধিত যানবাহন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি কিনতে পারবে।

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া এবং দেশে ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইনের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, অ্যাপ তৈরির কাজ চলছে এবং শিগগির কয়েকটি স্থানে পরীক্ষামূলকভাবে এই পদ্ধতি চালু করা হতে পারে।

বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে একটি অ্যাপস ডেভেলপ করছি। আশা করছি, এক সপ্তাহের মধ্যে দুই-একটি জায়গায় টেস্ট হিসেবে এটি চালু করতে পারব।’

তিনি বলেন, একসঙ্গে সারা দেশে এই ব্যবস্থা চালু করা সহজ নয়। তাই প্রথমে নির্দিষ্ট কিছু যানবাহন লক্ষ্য করে দ্রুত একটি কার্যকর পর্যায়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

কেন চালু হচ্ছে এই ব্যবস্থা

জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, মূল লক্ষ্য হচ্ছে আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি কেনা এবং মজুতের প্রবণতা কমানো।

বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬৩ শতাংশই ডিজেল, যা পরিবহন, কৃষি এবং অন্যান্য খাতে ব্যবহৃত হয়।

কিন্তু ফিলিং স্টেশনগুলোতে সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা যাচ্ছে পেট্রল ও অকটেনচালিত যানবাহনের। অথচ এই দুই ধরনের জ্বালানি মিলিয়ে মোট সরবরাহের মাত্র ১০ থেকে ১২ শতাংশ।

কর্মকর্তাদের ধারণা, সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কায় অনেক চালক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জ্বালানি কিনছেন। ফলে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভিড় বাড়ছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।

ডিজিটাল ফুয়েল পাস চালু হলে একজন গ্রাহক সর্বশেষ কখন এবং কতটুকু জ্বালানি নিয়েছেন, তা সহজেই পর্যবেক্ষণ করা যাবে। এতে কেউ প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবে না বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।

কীভাবে কাজ করবে ফুয়েল পাস

প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থার আওতায় প্রতিটি নিবন্ধিত যানবাহনকে একটি কিউআর কোড দেওয়া হবে, যা একটি মোবাইল অ্যাপের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।

ব্যবহারকারীকে অ্যাপের মাধ্যমে নিজের পরিচয় এবং যানবাহনের নিবন্ধন তথ্য দিয়ে নিবন্ধন করতে হবে। এরপর ওই যানবাহনের জন্য একটি কিউআর কোড তৈরি হবে।

ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি নেওয়ার সময় পাম্পকর্মী মোবাইল ফোন দিয়ে সেই কোড স্ক্যান করবেন। ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই যানবাহনের জ্বালানি নেওয়ার তথ্য সিস্টেমে যুক্ত হয়ে যাবে।

কর্মকর্তারা বলছেন, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কতটুকু জ্বালানি কেনা যাবে, সেটিও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

যদিও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা এখনও চূড়ান্ত হয়নি, তবে অন্য কিছু দেশে চালু থাকা একই ধরনের ব্যবস্থায় সাধারণত মোটরসাইকেল সপ্তাহে প্রায় পাঁচ লিটার এবং গাড়ি প্রায় ১৫ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি কিনতে পারে। তবে বিশেষ প্রয়োজনে বাড়তিও নেওয়া যায়।

নির্ধারিত সীমা শেষ হয়ে গেলে পরবর্তী নির্ধারিত সময়ের আগে সেই যানবাহনকে আর জ্বালানি দেওয়া যাবে না—সিস্টেমটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেটি আটকে দেবে।

প্রথম ধাপে মোটরসাইকেল কেন

কর্মকর্তারা বলছেন, প্রথম ধাপে মোটরসাইকেলকে লক্ষ্য করার কারণ হলো পেট্রোল ও অকটেনের বড় অংশই এই ধরনের যানবাহনে ব্যবহৃত হয়।

যদিও এই দুই ধরনের জ্বালানি মোট সরবরাহের তুলনায় কম, তবুও ফিলিং স্টেশনগুলোতে সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা যাচ্ছে এই যানবাহনগুলোর।

তাই তুলনামূলকভাবে ছোট একটি অংশ দিয়ে শুরু করলে ব্যবস্থা পরীক্ষা করা সহজ হবে এবং দ্রুত পেট্রোল ও অকটেনের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে সরকার।

এ ছাড়া এই পদ্ধতি চালু হলে রেজিস্ট্রেশনবিহীন যানবাহন স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই জ্বালানি কেনার বাইরে চলে যাবে।

দেশে এ ধরনের যানবাহনের সঠিক সংখ্যা জানা না থাকলেও কর্মকর্তারা মনে করছেন, এর মাধ্যমে বাড়তি চাহিদার একটি অংশ কমে আসতে পারে।

বিভিন্ন জেলায় এরইমধ্যে চালু হয়েছে ফুয়েল কার্ড

ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর আগেই দেশের কয়েকটি জেলায় জ্বালানি বিক্রি নিয়ন্ত্রণে ম্যানুয়াল ফুয়েল কার্ড চালু করেছে জেলা প্রশাসন।

সাতক্ষীরা, ঠাকুরগাঁও, চুয়াডাঙ্গা ও সিরাজগঞ্জে পেট্রোল ও অকটেন কেনার ক্ষেত্রে এই কার্ড বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

সাতক্ষীরায় মোটরসাইকেলে তেল নিতে জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষরযুক্ত ফুয়েল কার্ড দেখাতে হচ্ছে। ওই কার্ডে চালক ও যানবাহনের তথ্য থাকে এবং পাম্পে তেল নেওয়ার সময় সেখানে তেলের পরিমাণ লিখে রাখা হয়।

ঠাকুরগাঁওয়ে ৫ এপ্রিল থেকে ফুয়েল কার্ড ছাড়া পেট্রল বা অকটেন বিক্রি করা যাবে না বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ কারণে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, ইউএনও অফিস এবং পৌরসভাগুলোতে কার্ড সংগ্রহ করতে চালকদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে।

একই ধরনের ব্যবস্থা চুয়াডাঙ্গা ও সিরাজগঞ্জেও চালু করা হয়েছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, এসব উদ্যোগ মূলত পাইলট উদ্যোগ হিসেবে কাজ করছে। এর মাধ্যমে পাওয়া তথ্য ভবিষ্যতের ডিজিটাল ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে সহায়তা করবে।

সামনে কী

জ্বালানি বিভাগ বলছে, এপ্রিল থেকেই ডিজিটাল ফুয়েল পাস ব্যবস্থার প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে।

প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি স্থানে এটি চালু করা হবে। এরপর ফলাফল পর্যালোচনা করে ধীরে ধীরে এর পরিসর বাড়ানো হতে পারে।

যানবাহনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে শিল্প ও কৃষিখাতে জ্বালানি বরাদ্দের ক্ষেত্রেও একই ধরনের তদারকি ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

বিশেষ করে চলমান সেচ মৌসুমের কথা বিবেচনায় রেখে কৃষিখাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের প্রস্তুত করা তালিকার ভিত্তিতে কৃষকদের জন্য ডিজেল সরবরাহ সমন্বয় করা হচ্ছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, পরীক্ষামূলক উদ্যোগ সফল হলে ডিজিটাল ফুয়েল পাস ব্যবস্থা ধীরে ধীরে দেশের জ্বালানি বিতরণ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।

Popular

More like this
Related

আমিরাতে ভূপাতিত ড্রোনের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে বাংলাদেশি নিহত

সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ অঞ্চলে ভূপাতিত ড্রোনের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে...

ইরান যুদ্ধের সমাপ্তি চান যুক্তরাষ্ট্রের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ

যুক্তরাষ্ট্রের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের নির্ধারিত লক্ষ্য...

ভর্তুকির বোঝা বাড়লেও এপ্রিলে অপরিবর্তিত থাকবে তেলের দাম

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও আমদানির বাড়তি ব্যয় ভর্তুকি...

বলিভিয়াকে হারিয়ে ৪০ বছর পর বিশ্বকাপে ইরাক

দীর্ঘ ৪০ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটল। বলিভিয়াকে ২-১ ব্যবধানে...