একাত্তরের দায় ও জামায়াতের ‘ক্ষমা’ চাওয়ার রাজনীতি

Date:

ইতিহাসের ভয়াবহ অপরাধের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র বা নেতৃত্ব কীভাবে দায় স্বীকার করে—তার কিছু উদাহরণ আছে বিশ্বে। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশে নাৎসি দখলদারির শিকারদের স্মৃতিস্তম্ভের সামনে জার্মান চ্যান্সেলর ভিলি ব্রান্টের হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিলেন। ওই ঘটনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অপরাধে জার্মানির নৈতিক দায় স্বীকারের প্রতীক হয়ে আছে।

পরবর্তীতে জার্মানির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক ভাল্টার স্টাইনমায়ারও পোল্যান্ডে গিয়ে একই ইতিহাস স্মরণ করে লজ্জা ও দায়বোধের কথা প্রকাশ করেন। 

একইভাবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো ২০১৬ সালে পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে কোমাগাতা মারু ঘটনার জন্য রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চান। ১৯১৪ সালে কোমাগাতা মারু নামে জাহাজে করে ৩৭৬ জন ভারতীয় কানাডায় প্রবেশের চেষ্টা করলে বর্ণবাদী আইনের কারণে তাদের ফেরত পাঠানো হয়। জাহাজটি কলকাতায় ফিরে এলে ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে ২০ জন যাত্রী শহীদ ও বাকিরা কারাবন্দি হন। এই ঘটনাটি ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে ব্রিটিশ বিরোধী ক্ষোভ এবং বিশ্বজুড়ে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক অবিস্মরণীয় প্রতীক হয়ে আছে। 

জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউকি হাতোয়ামা দক্ষিণ কোরিয়ায় গিয়ে ঔপনিবেশিক শাসনের নিপীড়নের জন্য মাথা নত করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এগুলো কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়। বরং অপরাধ স্বীকার, ভুক্তভোগীদের প্রতি সম্মান ও ইতিহাসের দায় মেনে নেওয়ার স্পষ্ট প্রকাশ।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও প্রশ্ন ওঠে—একাত্তরে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, নির্যাতনের মতো অসংখ্য মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর যুক্ত থাকার পর দায় স্বীকার কেমন হওয়া উচিত? সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে জামায়াতে ইসলামীর ‘ক্ষমা’ চাওয়ার রাজনীতি কতটা আন্তরিক আর কতটা কৌশলী?

একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা: ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায়

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পাশাপাশি তাদের স্থানীয় সহযোগীরাও সক্রিয় ছিল। এ সহযোগিদের তালিকায় ছিল মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম পার্টি, পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি) ও জামায়াতে ইসলামীর মতো রাজনৈতিক দল। এক জামায়াত ছাড়া বাকি দলগুলো এখন প্রায় অস্তিত্বহীন।

জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের সহায়ক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে গড়ে ওঠে রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী। এসব বাহিনীর বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। 

জামায়াত নেতারা পরবর্তীতে দাবি করেছেন, তাদের অবস্থান ছিল ‘রাজনৈতিক’। কিন্তু বিভিন্ন দলিল ও ঐতিহাসিক তথ্য বলছে, এই সহযোগিতা ছিল সংগঠিত ও কাঠামোবদ্ধ।

স্বাধীনতার পর বিচার প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক পরিবর্তন

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রণয়ন করা হয় ‘দালাল আইন’। এর লক্ষ্য ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ করা হয় জামায়াতে ইসলামীসহ ওই দলগুলোকেও। 

১৯৭৩ সালের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। তবে খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ বা পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞে অভিযুক্ত বা দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা এই ক্ষমার বাইরে ছিল। 

১৯৭৫ সালের আগস্টে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হলে রাজনীতির মোড় ঘুরে যায়। ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবুসাদাত মোহাম্মদ সায়েম দালাল আইন বাতিল করেন। ফলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া থেমে যায়। 

১৯৭৬ সালের মে মাসে প্রেসিডেন্ট সায়েম অধ্যাদেশ জারি করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপরও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। এতে জামায়াতের রাজনীতির পথ উন্মুক্ত হয়। তবে দলটি নিজ নামে রাজনীতি শুরু করে আরও পরে, ১৯৭৯ সালে।

বড় রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিমুখী অবস্থানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ, বিএনপির মতো প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো মুখে জামায়াতের সমালোচনা করেছে। আবার ক্ষমতার প্রয়োজনে বিভিন্ন সময় তাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে আন্দোলন বা নির্বাচন করেছে।’

গণআদালত ও আন্দোলনের যুগ

১৯৯১ সালে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত গোলাম আযমকে জামায়াতের আমির ঘোষণা করা হলে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এর প্রতিবাদে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি গঠিত হয় ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’। পরে ৭২টি রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন মিলে গড়ে ওঠে বৃহত্তর মোর্চা ‘সমন্বয় কমিটি’।

এখানে বলে রাখা দরকার, স্বাধীনতার বিরোধিতাসহ যুদ্ধের সময় বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকায় বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৩ সালের ১৮ এপ্রিল গোলাম আযমসহ ৪২ রাজনৈতিক ব্যক্তির নাগরিকত্ব বাতিল করেছিল। 

১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রতীকী ‘গণআদালত’ বসানো হয়। তৎকালীন বিএনপি সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে আয়োজন ঠেকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু অসংখ্য মানুষ সব বাধা ভেঙে সমবেত হয়। 

গণআদালতের রায় ঘোষণা করে জাহানারা ইমাম বলেন, গোলাম আযমকে আমরা দশটি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করেছি, সবগুলো অপরাধ মৃত্যুদণ্ডের যোগ্য। সরকারের উচিত হবে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এই লোককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া। 

এই গণআদালত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে জনসচেতনতা তৈরির মাইলফলক হয়ে ওঠে। পরদিন সরকার জাহানারা ইমামসহ ২৪ জন নেতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করে। ১৯৯৪ সালে জাহানারা ইমামের মৃত্যুর পর ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মামলা বাতিল হয়।

জামায়াত নেতাদের বক্তব্য: ক্ষমা না কি দায় এড়ানো?

ভিলি ব্রান্ট বা জাস্টিন ট্রুডোদের ক্ষমা ছিল নির্দিষ্ট ঘটনার দায় স্বীকারের স্পষ্ট ভাষা। জামায়াতের বক্তব্যে ব্যাপারটা কীভাবে এসেছে নানা সময়ে?

মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নানাসময়ে জামায়াতকে মিত্র হিসেবে গ্রহণ করে দলটিকে বৈধতা ও আশকারা দেওয়ায় তারা রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হয়েছে। ফলে দলটির ওপর ক্ষমা চাওয়ার মতো কোনো বাস্তব রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়নি।’

১৯৭১ সালে গোলাম আযম ছিলেন জামায়াতের পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের আমির। জুনে রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে সাক্ষাতে তিনি দেশের আদর্শ ও সংহতিতে বিশ্বাসী লোকদের হাতে অস্ত্র সরবরাহের আহ্বান জানিয়েছিলেন।

১৯৭১ সালের ৮ এপিল এক যুক্ত বিবৃতিতে গোলাম আযম মুক্তিযোদ্ধাদের ‘এজেন্ট ও পাকিস্তান বিরোধী’ বলেছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৪ আগস্ট আজাদী দিবসে কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি আয়োজিত এক সভায় গোলাম আযম ‘পাকিস্তানের দুশমনদের মহল্লায় মহল্লায় তন্নতন্ন করে খুঁজে তাদের অস্তিত্ব বিলোপ করার জন্য দেশপ্রেমিকদের শান্তি কমিটির সাথে সহায়তা করার উদাত্ত আহ্বান’ জানান।

ডিসেম্বরের ১ তারিখেও তিনি রাজাকারদের সংখ্যা বাড়ানোর আহ্বান জানান। মুক্তিবাহিনীকে ‘শত্রুবাহিনী’ বলে আখ্যায়িত করেন।

১৯৯৪ সালে হারানো নাগরিকত্ব ফিরে পেয়ে ঢাকার বায়তুল মোকাররমে এক জনসভায় গোলাম আযম বলেন, ‘নবী ছাড়া কে দোষী নয়, দোষ কমবেশি সবারই আছে। তাই যারা আমার কোনো কাজকে ভুল মনে করেছেন, দুঃখ পেয়েছেন, আমি তাদের সবার কাছে জানাচ্ছি। আপনাদের এই বেদনার সঙ্গে আমি শরীক, আমিও দুঃখিত।’

দলটির আরেক আমির মতিউর রহমান নিজামী বলেছিলেন, ‘আমাদের সে সময়ের রাজনৈতিক অবস্থানটা ভিন্ন ছিল—এটা সকলে জানে।’ কিন্তু তিনি কখনো সরাসরি ক্ষমা চাননি। বরং আরেক জনসভায় তাকে বলতে শোনা যায়, ‘জামায়াতে ইসলামী কোনো অবস্থায় লুটপাটে শরীক হয়নি। ধর্ষণের প্রশ্নই ওঠে না।’

জামায়াতের বর্তমান আমির শফিকুর রহমান অনেকটা তার পূর্বসূরীদের সুরেই কথা বলছেন। ২০২৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত তিনি কয়েকবারই একাত্তরের প্রশ্নে বক্তব্য দিয়েছেন। 

এর মধ্যে প্রথমবার গত বছরের অক্টোবরে নিউইয়র্কে এক মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, ‘৪৭ থেকে শুরু করে ২০২৫ সাল পর্যন্ত…আমাদের দ্বারা যে যেখানে যত কষ্ট পেয়েছেন, আমরা বিনা শর্তে, যারা কষ্ট পেয়েছেন, আমরা মাফ চাই।’ 

তবে সেখানে তিনি এ-ও বলেন, ‘যেই জাতি চিংড়ি মাছের মতো লাফাইতে গিয়া শুধু পিছনের দিকে যায়, এই জাতির কোনো ভবিষ্যৎ নাই। উই আর ফরওয়ার্ড লুকিং, আমরা সামনে দেখতে চাই।’

মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী মাঝে মাঝে ক্ষমা চাওয়ার কথা বললেও তা মূলত রাজনৈতিক চাপে পড়ে বলে, যা তাদের আন্তরিক ইচ্ছা বা অপরাধ স্বীকারের সাহস থেকে আসে না।’

দলের ভেতরেও নানাসময়ে একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এর জেরে ২০১৯ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি জামায়াত থেকে পদত্যাগ করেছিলেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক।

 

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়েও নানা বিতর্ক আছে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে বিচার প্রক্রিয়ার ওঠানামা এই প্রশ্নকে আরও জটিল করেছে।

এ প্রসঙ্গে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘কোনো সরকারই এখন পর্যন্ত দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে ১৯৭১ সালের গণহত্যা বা যুদ্ধাপরাধের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করে মামলা করেনি। এমনকি তাদের যে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন বাতিল হয়েছিল, তা-ও ১৯৭১-এর অপরাধের জন্য নয়, বরং তাদের গঠনতন্ত্র বাংলাদেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে হয়েছিল।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘অভিযুক্ত পক্ষটি ১৯৭১-এর অপরাধগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিবর্তে সেগুলোকে হাসি-তামাশা বা তুচ্ছতাচ্ছিল্যের বিষয় হিসেবে গণ্য করে। তাদের এই আচরণের মাধ্যমে এটিই প্রমাণিত হয় যে, তারা সেই অপরাধগুলোকে অপরাধ হিসেবে স্বীকার করতেই রাজি নয়।’

১৯৭১ সালে দল হিসেবে জামায়াতের ভূমিকা ‘ক্ষমার অযোগ্য’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে যারা জামায়াতে আছেন, তারা যুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী সরাসরি যুক্ত না থাকলেও যদি তারা সেই একই রাজনীতিকে ধারণ করেন বা সেই আদর্শকে প্রত্যাখ্যান না করেন, তবে তারাও সমানভাবে অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন।’

 

Popular

More like this
Related

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদারে সচেষ্ট বাংলাদেশ: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ছয় দফায় মোট...

মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হতে সেনাপ্রধানের পদ ছাড়লেন মিন অং হ্লাইং

মিয়ানমারের জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং সেনাবাহিনীর প্রধানের পদ...

নৌ কমান্ডার তাংসিরির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করল ইরান

ইসরায়েলের সাম্প্রতিক এক বিমান হামলায় ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডস কর্পসের...

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতার সাক্ষাৎ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন জাতীয় সংসদের...