ইরানের মহাকবি হাফিজ শিরাজি এক কবিতায় তার প্রেমিকার গালের এক তিলের বিনিময়ে তৎকালীন দুই সমৃদ্ধ নগরী বুখারা ও সমরকন্দ দিয়ে দেওয়ার বাসনা প্রকাশ করেছিলেন। ইতিহাসবিদেরা বলেন, সে সময় হাফিজের এমন বিলাসী ভাবনা বিজ্ঞ মহলে বেশ হইচই ফেলে দিয়েছিল।
এটি সুবিদিত যে, বাংলার শাসক গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ ইরানের এই মহাকবিকে রাজধানী সোনারগাঁওয়ে আমন্ত্রণ জানিয়ে আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন। বয়স বেশি হওয়ায় হাফিজ তখন এত দূরের দেশ ভ্রমণে রাজি হননি, তবে উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন দুই ছত্র কবিতা।
হাফিজের প্রিয় সেই দুই নগরীর দেশ উজবেকিস্তান। অধুনা মধ্য এশিয়ার এই দেশটি আবারও আলোচনায় এসেছে। দৃষ্টি কেড়েছে বিশ্ব মিডিয়ার। এবারের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে দেশটির সুবিস্তৃত ও অত্যাধুনিক ‘ইসলামী সভ্যতা কেন্দ্র’।
আয়তনের দিক থেকে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের তুলনায় উজবেকিস্তানের এই ‘ইসলামী সভ্যতা কেন্দ্র’ প্রায় আট ভাগের একভাগ হলেও যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসের তুলনায় এটি প্রায় সাত গুণ বড়। উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দের কেন্দ্রস্থলে প্রায় ২৪ একর এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছে এই স্থাপনা, যাকে মধ্য এশিয়ার ‘মুকুট’ বলা হচ্ছে। তিন তলা এই ভবনের আয়তন ৪ লাখ ৫২ হাজার বর্গফুটের কিছু বেশি।
প্রায় ২১৩ ফুট উচ্চতার গম্বুজের নিচে এই প্রধান স্থাপনা। দেশটির ঐতিহাসিক স্থাপত্যরীতি মেনে পুরো ভবনটিকে ‘মির্জো উলুগবেক’, ‘কোকান্দ’, ‘বুখারা’ ও ‘খোরেজম’—এই চারটি প্রধান অংশে ভাগ করা হয়েছে।
গত ১৭ মার্চ উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শওকত মির্জিওয়েভ কেন্দ্রটি উদ্বোধন করেন। রমজান মাস হওয়ায় সেদিন সেখানে ইফতারের আয়োজন করা হয়েছিল। ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন।
এই ভবনটি মূলত আংশিক জাদুঘর ও আংশিক গবেষণাকেন্দ্র। ইতিহাস বলছে, মধ্যযুগে মধ্য এশিয়ায় তাসখন্দ নগরী জ্ঞানচর্চার অন্যতম সমৃদ্ধ কেন্দ্র ছিল। ২০১৭ সালে উজবেকিস্তান সরকার তাদের জাতির গর্বিত অতীতকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরার জন্য এই ‘সভ্যতা কেন্দ্র’ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়।
সম্প্রতি ইসলামী সভ্যতা কেন্দ্রের পরিচালক ফিরদাওস আবদুখালিকভ মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে বলেন, ‘বিশ্ব সভ্যতায় অবদান রাখা অনেক মণীষীর পূর্বপুরুষের বসতি এই অঞ্চলে ছিল।’ তিনি জানান, নতুন প্রজন্মের কাছে পুরোনো সভ্যতাকে আধুনিক আঙ্গিকে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে তারা কাজ করছেন। গত আট বছরে কেন্দ্রটি তৈরির সময় ৪০টির বেশি দেশের প্রায় ১ হাজার ৫০০ বিশেষজ্ঞ এর বৈজ্ঞানিক, স্থাপত্যগত ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে কাজ করেছেন।
গত ৫ ডিসেম্বর সিএনএন উজবেকিস্তানের এই বিশাল প্রকল্প নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, কেন্দ্রটিতে ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর), অগমেন্টেড রিয়েলিটি (এআর) ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের কর্ম তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি তরুণদের জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা ও শিল্পসাহিত্যে উৎসাহিত করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
ভবনটির দ্বিতীয় তলা গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, সেখানকার গ্রন্থাগারে ২ লাখের বেশি বই রয়েছে। দেশি-বিদেশি গবেষকেরা এই গ্রন্থাগার ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। আবদুখালিকভের ভাষ্যমতে, ‘এটি কেবল একটি জাদুঘর নয়; এটি শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র। এখানে শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনই রাখা হয়নি, বিশ্বসভ্যতায় অবদান রাখা ব্যক্তিদের জীবন, কর্ম ও দর্শনও তুলে ধরা হয়েছে।’
গত ১৮ মার্চ রিয়াদভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যারাব নিউজের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, তাসখন্দের ঐতিহাসিক হজরতি ইমাম কমপ্লেক্সের কাছে গড়ে ওঠা এই কেন্দ্রটি মধ্য এশিয়ার প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে আধুনিক উজবেকিস্তান পর্যন্ত সময়ের তথ্য ও নিদর্শন তুলে ধরছে।
যেমন, কেন্দ্রটির ‘কুরআন হল’-এ পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন কোরআনের পাণ্ডুলিপি রাখা আছে। ইসলামের তৃতীয় খলিফা হজরত উসমানের (রা.) আমলের কুরআনের সেই সংকলনটি এখানে প্রদর্শিত হচ্ছে। এ ছাড়া পুরোনো পাণ্ডুলিপি, প্রত্নতাত্ত্বিক নমুনা ও ঐতিহাসিক মানচিত্র এই কেন্দ্রে স্থান পেয়েছে।
এখানে কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ও রয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য—ইসলামিক ওয়ার্ল্ড এডুকেশনাল, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশন (আইসেস্কো); রিসার্চ সেন্টার ফর ইসলামিক হিস্ট্রি, আর্ট অ্যান্ড কালচার (ইরসিকা); অক্সফোর্ড সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজ; ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব টার্কিক কালচার ও মুসলিম বোর্ড অব উজবেকিস্তান।
সিএনএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, উজবেকিস্তান ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হলেও ইসলাম দেশটির ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সপ্তম শতাব্দীতে আরবদের হাত ধরে ইসলামের আগমনের আগে এখানে জরথুস্ট্রবাদ ও বৌদ্ধধর্মের প্রাধান্য ছিল। এরপর নবম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে এই অঞ্চল জ্ঞানবিজ্ঞান, সাহিত্য ও স্থাপত্যের ‘স্বর্ণযুগ’ প্রত্যক্ষ করে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অক্সফোর্ড ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্রের পরিচালক ও ঐতিহাসিক ফারহান আহমাদ নিজামি সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘আজকের বিশ্বায়ন-ভাবনার বহু আগেই মধ্যযুগে মধ্য এশিয়া একটি বৈশ্বিক অঞ্চল ছিল।’
রাজধানী তাসখন্দ ছাড়াও উজবেকিস্তানের দুটি সমৃদ্ধ শহর বুখারা ও সমরকন্দকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছিল ঐতিহাসিক রেশম পথ (সিল্ক রোড)। খ্রিষ্টপূর্ব ১৩০ সাল থেকে খ্রিষ্টাব্দ ১৪৫৩ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত এই বাণিজ্যপথটি ইতালির ভেনিস থেকে চীনের শিয়ান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এটি ছিল প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক মেলবন্ধন। পরবর্তীকালে ১৫ ও ১৬ শতকে শাসক তৈমুর লংয়ের রাজধানী সমরকন্দ শিল্প-সাহিত্য ও বিজ্ঞানের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। সেই আমলের স্থাপত্যরীতি অনুসরণ করেই তাসখন্দের এই কেন্দ্রের অবকাঠামো সাজানো হয়েছে। বিশাল খিলান, নীল টালির গম্বুজ ও সূক্ষ্ম কারুকাজ সেই পুরোনো ঐতিহ্যকেই মনে করিয়ে দেয়।
উনবিংশ শতাব্দীতে এই অঞ্চল রুশ সাম্রাজ্যের অধীনে চলে যায়। এরপর সোভিয়েত আমলের কঠোর নিয়ম-নীতি এখানকার ইসলামী ঐতিহ্যকে প্রায় স্তিমিত করে দেয়। আবদুখালিকভ বলেন, ‘ঐতিহ্যের খুব সামান্য অংশই টিকে ছিল।’ ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর উজবেকিস্তান তার হারানো সাংস্কৃতিক পরিচয় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
আবদুখালিকভ জানান, তারা নিলামকারী প্রতিষ্ঠান ক্রিস্টিজ ও সোদেবিস থেকেও বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন কিনে আনছেন। এ ছাড়া ২ হাজারের বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ফিরে পাওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
গত ১৭ মার্চ দুবাইভিত্তিক খালিজ টাইমস জানায়, তাসখন্দের এই কেন্দ্রটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ব্যাপক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিবিসি ট্রাভেল ও বিবিসি হিস্ট্রিও এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সংবাদ অনুসারে, ইসলামী সভ্যতা কেন্দ্রটি ইতোমধ্যে ২০২৬ সালের ‘সবচেয়ে সুন্দর জাদুঘর’-এর খেতাব পেয়েছে।
একই দিনে সিউলভিত্তিক কোরিয়া হেরাল্ড জানায়, ধর্মকে যখন বিদ্বেষের ও সংস্কৃতিকে যখন বিভেদের হাতিয়ার হিসেবে অপব্যবহার করা হচ্ছে, তখন এই কেন্দ্রটি আন্তঃসভ্যতার ‘সখ্য’ তুলে ধরছে। ইউরো নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এখানে প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার দর্শনার্থীর প্রবেশের সুযোগ রয়েছে।
আহমেদ সালিম নামের এক দর্শনার্থী সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম জানতে পারবে তাদের পূর্বপুরুষেরা কীভাবে বিশ্বসভ্যতায় অবদান রেখেছিলেন।’ উজবেকিস্তানের প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষের অন্তত ৬০ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। আবদুখালিকভ বলেন, ‘উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার মধ্য দিয়ে আমরা সমৃদ্ধ ইতিহাস তরুণদের সামনে তুলে ধরে তাদের অনুপ্রাণিত করব। এটি মূলত পরবর্তী প্রজন্মের জাদুঘর।’
তবে সিএনএন-এর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই কেন্দ্র নির্মাণে কত ব্যয় হয়েছে, তা সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে না জানানোয় এ নিয়ে কিছুটা বিতর্কও রয়েছে।