ভারত মহাসাগরে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ দিয়েগো গার্সিয়া লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এই দ্বীপে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের একটি যৌথ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও সিএনএন জানিয়েছে, গতকাল শুক্রবার রাতে এই হামলা চালানো হয়।
ইরান থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দূরের এই দ্বীপে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কতটা নিখুঁতভাবে আঘাত হেনেছে, তা এখনো অস্পষ্ট। তবে যুক্তরাজ্যের দাবি, হামলা সফল হয়নি।
এদিকে বার্তাসংস্থা এপি জানিয়েছে, এ হামলাকে ‘ইরানের বেপরোয়া আক্রমণ’ বলে ইতোমধ্যে নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাজ্য।
এক বিবৃতিতে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘ইরানের এই বেপরোয়া হামলা এবং হরমুজ প্রণালীকে জিম্মি করার প্রচেষ্টা ব্রিটিশ স্বার্থ ও আমাদের মিত্রদের জন্য বড় হুমকি।’
তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী এ হামলার বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি।
এপির প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটি মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য একটি ‘অপরিহার্য এলাকা’ হিসেবে ধরা হয়।
বর্তমানে এখানে প্রায় আড়াই হাজার সামরিক সদস্য আছেন, যাদের অধিকাংশই মার্কিন। ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে শুরু করে ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধেও এই ঘাঁটিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিল।
গত বছর ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করে বিমান হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্র এই ঘাঁটি থেকেই পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম ‘বি-২ স্পিরিট’ বোমারু বিমান মোতায়েন করে।
শুরুতে যুক্তরাজ্য এ ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার অনুমতি দিতে রাজি ছিল না। কিন্তু ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা শুরু করলে যুক্তরাজ্য মত পরিবর্তন করে।
সম্প্রতি তারা দিয়েগো গার্সিয়া ও আরেকটি ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কেন্দ্রে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে সম্মত হয়।
এরপর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘ব্রিটিশ ঘাঁটিগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে হামলার জন্য ব্যবহার করতে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ব্রিটিশ নাগরিকদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছেন।’
ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইলের সর্বোচ্চ পাল্লা এতদিন পর্যন্ত ২ হাজার কিলোমিটারের মধ্যে ছিল। কিন্তু দিয়েগো গার্সিয়া এই সীমার অনেক বাইরে।
ইসরায়েলের আলমা রিসার্চ সেন্টারের ধারণা, এ হামলায় ইরান আরও উন্নত বা পরিবর্তিত কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরান মহাকাশ গবেষণা কর্মসূচির আড়ালে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো জাস্টিন ব্রঙ্ক এপিকে বলেন, ‘দিয়েগো গার্সিয়ায় হামলায় সম্ভবত ইরান “সিমোর্গ” রকেট ব্যবহার করেছে, যা মহাকাশ যান উৎক্ষেপণে ব্যবহৃত হলেও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে কাজ করতে পারে।’
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মিসাইল ডিফেন্স প্রজেক্টের পরিচালক টম কারাকো এনবিসি নিউজকে বলেন, ‘ইরান গত কয়েক বছর ধরে “বিশাল ও শক্তিশালী সলিড-ফুয়েল মিসাইল” পরীক্ষা করে আসছে। তাই এই ঘটনাটি মোটেও আশ্চর্যজনক নয়।’
তিনি আরও বলেন, আগে থেকেই এমন ধারণা ছিল যে ইরান তাদের ঘোষিত সীমার চেয়েও অনেক দূরে আঘাত হানতে সক্ষম। তারা সব সক্ষমতা এখনো দেখায়নি। দিয়েগো গার্সিয়ায় এই হামলা সম্ভবত সেই “লুকিয়ে রাখা সক্ষমতা” দেখানোর একটি মুহূর্ত।’
দিয়েগো গার্সিয়া ভারত মহাসাগরের চাগোস দ্বীপপুঞ্জের অংশ, যা ৬০টির বেশি দ্বীপের সমষ্টি। ১৮১৪ সাল থেকে এটি ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে ঘাঁটি তৈরির জন্য ব্রিটেন সেখান থেকে প্রায় ২ হাজার স্থানীয় বাসিন্দাকে উচ্ছেদ করে।
সম্প্রতি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আদালত এই দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব মরিশাসকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ব্রিটেনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘ আলোচনার পর গত বছর যুক্তরাজ্য মরিশাসের কাছে দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব হস্তান্তরের একটি চুক্তি করে, যার বিনিময়ে অন্তত ৯৯ বছরের জন্য দিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটিটি লিজ পাবে ব্রিটেন।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তির সমালোচনা করে একে ‘চরম বোকামি’ বলে উল্লেখ করেন।
ট্রাম্পের অসন্তোষ এবং ইরানের বিরুদ্ধে এই ঘাঁটি ব্যবহারে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের প্রাথমিক অনীহার কারণে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ‘বিশেষ সম্পর্ক’ কিছুটা চাপের মুখে পড়েছে।
এ অবস্থায় এ হামলাটি ইরান যুদ্ধে যুক্তরাজ্যের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বিবিসি জানায়, ইতোমধ্যে ব্রিটিশ সরকার ঘাঁটি রক্ষায় বৃহত্তর প্রতিরক্ষা প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ‘এইচএমএস ড্রাগন’ ডেস্ট্রয়ার পাঠিয়েছে।
ইরানের হামলা প্রসঙ্গে সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের একটিও লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। একটি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝ আকাশেই অকেজো হয়ে পড়ে এবং অন্যটি ধ্বংস করা হয়।
কিন্তু ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার এ হামলার খবর শুরুতে প্রকাশ না করায় ঘরোয়া রাজনীতিতে তোপের মুখে পড়েছেন। কনজারভেটিভ নেত্রী কেমি ব্যাডেনখ বলেছেন, ‘জনগণকে কেন আগে জানানো হয়নি তা প্রধানমন্ত্রীর পরিষ্কার করা উচিত। তিনি এ হামলাকে ‘মাদার অব অল ইউ-টার্ন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিবিসি জানিয়েছে, এই হামলার পরই ব্রিটেন বাধ্য হয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের ওপর পাল্টা আক্রমণের অনুমতি দিয়েছে, যা এতদিন স্টারমার সরকার এড়িয়ে চলছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, দিয়েগো গার্সিয়ায় হামলা সাধারণ কোনো ক্ষেপণাস্ত্র হামলা না। বরং এটি পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি তেহরানের কৌশলগত বার্তা যার মাধ্যমে ইরান বুঝিয়ে দিচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোও এখন আর নিরাপদ নয়।
দিয়েগো গার্সিয়ায় এই হামলার ঠিক ৭ দিন আগে ইসরায়েলি বাহিনী তেহরানে ইরানের প্রধান মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছিল। ইসরায়েলের আশঙ্কা ছিল, ইরান মহাকাশ থেকে স্যাটেলাইট ধ্বংস করার সক্ষমতা তৈরি করছে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের ক্ষেপণাস্ত্র এখন মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে।
যুক্তরাজ্যের সাবেক জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ডের প্রধান জেনারেল স্যার রিচার্ড ব্যারনস বলেন, ‘ইরানের শক্তিকে বরাবরই “ছোট করে দেখা” হয়েছে। শত্রু সবসময় নিজের চাল দেয় এবং এই ক্ষেত্রে ইরানের শক্তিকে আমরা ধারাবাহিকভাবে অবমূল্যায়ন করেছি।’
ইরান যুক্তরাজ্যকে শত্রু মনে করে, তাই আপনি যদি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার সঙ্গে যুক্ত হন, তবে তারা পাল্টা জবাব দেবে—এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই,’ বলেন তিনি।