ইরানের ড্রোন হামলা ঠেকানো কঠিন কেন

Date:

সস্তা হলেও অত্যন্ত বিধ্বংসী—ইরানি নকশার শাহেদ ড্রোনগুলো মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে এক বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। উন্নত প্রযুক্তির কারণে এগুলো শনাক্ত ও প্রতিহত করা কঠিন।

কেন এই ড্রোন থামানো এত চ্যালেঞ্জিং, তা উঠে এসেছে বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে।

শাহেদ ড্রোনগুলো এমনভাবে তৈরি যে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরিত হয়। উড্ডয়নের ঠিক আগে বা পরে এগুলো জিপিএস দিয়ে নিজেদের অবস্থান ঠিক করে নেয়, তারপর সাধারণত জিপিএস রিসিভার বন্ধ করে দেয়।

ব্রিটেনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান রুসির গবেষক থমাস উইথিংটনের মতে, এরপর ড্রোনগুলো জাইরোস্কোপ ব্যবহার করে গতি, দিক ও অবস্থান হিসাব করে লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগোয়। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘ইনারশিয়াল নেভিগেশন সিস্টেম’।

এটা অনেকটা চোখ বেঁধে নির্দিষ্ট পদক্ষেপ গুনে কোন দিকে ঘুরছেন তা মনে রেখে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যাওয়ার মতো। ড্রোনটিও তার ভেতরের সেন্সর ব্যবহার করে ঠিক এভাবেই নিজের পথ খুঁজে নেয়।

তিনি এএফপিকে বলেন, ‘যে সিস্টেম দিয়ে লক্ষ্যবস্তু রক্ষা করা হয়, তা সাধারণত জিপিএস সিগন্যাল নষ্ট করার চেষ্টা করে। কিন্তু ড্রোন যদি জিপিএস ব্যবহারই না করে, তাহলে ওই সিস্টেম এড়ানো যায়।’

আঘাতের আগে ড্রোন আবার জিপিএস চালু করতে পারে, যাতে আরও নির্ভুলভাবে আঘাত হানা যায়। তবে সব সময় খুব নিখুঁত না হলেও এটি কার্যকর।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য শাহেদের মতো একই ধরনের ড্রোন তৈরি করছে। ২০২৩ সালে একটি মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান জানায়, এসব ড্রোনে এমন অ্যান্টেনা প্রযুক্তি রয়েছে যা শত্রুপক্ষের জ্যামিং সিগন্যাল বাদ দিয়ে আসল জিপিএস সিগন্যাল ধরে রাখতে পারে।

সাইপ্রাসে বিধ্বস্ত একটি ইরানি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষেও এমন অ্যান্টি-জ্যামিং প্রযুক্তি পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে এএফপি।

টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টড হামফ্রিস বলেন, ‘সহজলভ্য যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি হলেও প্রায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক জিপিএসের মতো সক্ষমতা রয়েছে এটির।’

এ কারণে এগুলো ঠেকাতে উন্নত ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম প্রয়োজন।

২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শাহেদ ড্রোন হালকা ওজনের প্লাস্টিক ও ফাইবারগ্লাস দিয়ে তৈরি।

ছোট আকার এবং কম উচ্চতায় উড়তে পারার কারণে এগুলো সহজে রাডারে ধরা না পড়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিতে পারে।

একাধিক নেভিগেশন ব্যবস্থা

কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ইরান একাধিক নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করছে, যাতে জ্যামিং এড়ানো সহজ হয়।

ইউক্রেনের এক প্রযুক্তি উপদেষ্টা জানান, ইরান চীনের বেইদৌ সিস্টেম ব্যবহার করতে পারে। রাশিয়ায় তৈরি সংস্করণে বেইদৌ ও রাশিয়ার গ্লোনাস—দুটিই থাকতে পারে।

আরও ধারণা করা হয়, ইরান পুরনো ‘লোরান’ রেডিও নেভিগেশন প্রযুক্তিও ব্যবহার করতে পারে, যেটির জন্য স্যাটেলাইট দরকার হয় না। যদিও এটি এখন সক্রিয় কিনা, তা নিশ্চিত হতে পারেনি এএফপি।

বিরোধী পক্ষগুলো সাধারণত কামান, ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরোধকারী ড্রোন দিয়ে এসব ড্রোন ভূপাতিত করার চেষ্টা করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল লেজার প্রযুক্তিও উন্নয়ন করছে।

তবে ইউক্রেন দেখিয়েছে, জ্যামিং ও ড্রোনের নেভিগেশন হ্যাক করে গন্তব্য বদলে দেওয়া কার্যকর হতে পারে। ২০২৫ সালের মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ইউক্রেন এই পদ্ধতি ব্যবহার করে ৪ হাজার ৬৫২টি ড্রোন নিষ্ক্রিয় করেছে, যা গুলি করে ভূপাতিত করা ৬ হাজার ৪১টির কাছাকাছি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ড্রোন ঠেকাতে ইলেকট্রনিক ও প্রচলিত প্রতিরক্ষা—দুটোই একসঙ্গে ব্যবহার করতে হয়।

Popular

More like this
Related

ইরানের নিরাপত্তা প্রধান লারিজানির ‘মৃত্যুর দাবি’ নিয়ে যা জানা গেল

ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি ‘নিহত’ হয়েছেন বলে...

কিউবা ‘দখলে নিতে চান’ ট্রাম্প

কঠোর তেল নিষেধাজ্ঞায় তীব্র বিদ্যুৎ সংকটে থাকা কিউবাকে ‘দখলে...

ঈদের ব্যস্ততা উপভোগ করছেন কর্ণিয়া

গানের জগতে দেড় দশক পার করেছেন জাকিয়া সুলতানা কর্ণিয়া।...

ফুটবলের গতি বেড়েছে, জাদু কি কমেছে? আনচেলত্তির প্রশ্ন

ফুটবল এখন আগের চেয়ে দ্রুত, শারীরিকভাবে আরও শক্তিশালী, প্রযুক্তিতে...