ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি করতে ব্যর্থ হলে ভয়াবহ সংঘাতের পথে এগুবে যুক্তরাষ্ট্র—এখন পর্যন্ত এমন ইঙ্গিতই মিলেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বহরের আনাগোনায়।
ট্রাম্প ইতোমধ্যে তেহরানকে চুক্তির জন্য ১০ থেকে ১৫ দিনের সময় বেঁধে দিয়েছে এবং একইসঙ্গে সীমিত আকারে সামরিক অভিযানের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
তবে ইরানে হামলার ক্ষেত্রে কোন কৌশল নেবে যুক্তরাষ্ট্র, সেটি এখনো পরিষ্কার নয়।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে উঠে আসে বেশ কিছু সম্ভাব্য কৌশলের তথ্য। এর মধ্যে রয়েছে—টার্গেট কিলিং বা ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে টার্গেট করে হত্যা, ভেনেজুয়েলার মতো ঝটিকা অভিযান ও দীর্ঘমেয়াদে সামরিক অভিযান।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক পরিকল্পনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে।
তারা বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্দেশ দিলেই পেন্টাগন শুধু সামরিক স্থাপনায় হামলা নয় বরং দেশটির শীর্ষ নেতাদের টার্গেট করে হত্যাসহ তেহরানে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়েও এগুতে পারবে।’
ওই দুই কর্মকর্তা আরও জানান, বৃহৎ আকারের স্থলবাহিনী ছাড়া কীভাবে ইরানে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা চালানো হবে সে বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
টার্গেট কিলিং
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে হামলার অনুমোদন দিয়েছিলেন। ২০২০ সালে ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করা হয় মার্কিন ড্রোন হামলায়। তিনি ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কুদস ফোর্সের প্রধান ছিলেন।
২০১৯ সালে ট্রাম্প প্রশাসন আইআরজিসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট কোন নেতাদের টার্গেট করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু এখনো জানা যায়নি। তবে বড় ধরনের কোনো স্থল অভিযান ছাড়া সরকার পতনের কৌশল নিয়ে আলোচনা চলছে।
আফগানিস্তান বা ইরাকের মতো দেশগুলোতে সরকার পতনে তৎকালীন মার্কিন নীতি ‘ব্যর্থ’ বলে মনে করেন ট্রাম্প। ওই নীতি থেকে সরে আসার ইঙ্গিতও ইতোমধ্যে স্পষ্ট।
মার্কিন ওই কর্মকর্তা জানান, গত বছর ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধে যেভাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অফ স্টাফ মেজর জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরিসহ অন্তত ২০ শীর্ষ কমান্ডারকে হত্যা করা হয়েছে, সেই সফলতাকে উদাহরণ হিসেবে দেখছে ওয়াশিংটন।
তবে ওই কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে হলে উচ্চ পর্যায়ের গোয়েন্দা সক্ষমতা প্রয়োজন। কমান্ডারদের অবস্থান নির্ভুলভাবে জানা এবং অভিযানে অন্য কারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, সেটিও বিবেচনায় নিতে হয়।
বর্তমানে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কী ধরনের গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
ভেনেজুয়েলা মডেলে অভিযান
গত মাসে ভেনেজুয়েলার কারাকাসে এক দুঃসাহসিক ঝটিকা অভিযানের মাধ্যমে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করার উদাহরণ টেনে ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছিলেন, ইরানে সরকার পরিবর্তনই হবে সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনা।
সে সময় তিনি কারও নাম নির্দিষ্ট করে উল্লেখ না করলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তেহরানের শাসনভার নেওয়ার মতো ‘লোক আছে’।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ভেনেজুয়েলায় স্পেশাল ফোর্সের যে ‘সারপ্রাইজ অপারেশন’ সফল হয়েছিল, ইরানের ক্ষেত্রে তা অনেক বেশি জটিল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
দীর্ঘমেয়াদে অভিযান
তেহরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য ও তার আশপাশে বিপুল শক্তি জড়ো করছে যুক্তরাষ্ট্র।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই প্রস্তুতিতে এমন কিছু কৌশলগত বিষয় আছে যা শুধু হঠাৎ হামলা নয়, দীর্ঘস্থায়ী অভিযানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তিন স্তরের সামরিক প্রস্তুতির মধ্যে রয়েছে—বৃহৎ নৌবহর, উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার ও যুদ্ধকমান্ড সেন্টার মোতায়েন।
বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এখন আরব সাগরে অবস্থান করছে। শিগগির এর সঙ্গে যোগ দেবে ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ও তার স্ট্রাইক গ্রুপ। এর সঙ্গে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী মোট ১১টি ডেস্ট্রয়ারও রয়েছে। ফোর্ড এখন জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করছে।
স্কাই নিউজ জানায়, ইরানের হামলা মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবে গত ১০ দিনে মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যুক্ত করেছে ওয়াশিংটন। এছাড়া আকাশে জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে কমপক্ষে ১৬টি ট্যাংকার এবং যুদ্ধ কার্যক্রম সমন্বয় করতে ৬টি কমান্ড সেন্টারও মোতায়েন করছে যুক্তরাষ্ট্র।
গোয়েন্দা বিশ্লেষক ও সামরিক ফ্লাইট ট্র্যাকিংয়ের তথ্যের বরাতে সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরা জানায়, গত কয়েকদিনে যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে ১২০টির বেশি যুদ্ধ বিমান মোতায়েন করেছে। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে এটিই যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় সংখ্যক যুদ্ধ বিমান মোতায়েন।
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সিনিয়র উপদেষ্টা মার্ক ক্যানসিয়ান বলেন, ‘বি-২ বিমানের যেকোনো গতিবিধির ওপর নজর রাখুন। এটিই মূলত অভিযান শুরুর ইঙ্গিত দেবে।’
আলোচনার পথ খোলা
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার পরমাণু ইস্যুতে বৈঠক করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির মতে, কিছু ‘নির্দেশনামূলক নীতিতে’ একমত হয়েছেন তারা।
হোয়াইট হাউস বলছে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই পক্ষ এখনো অনেক দূরে অবস্থান করছে।
ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ বলে দাবি করে আসছে।
তবে বুধবার ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘তাদের কাছে পরমাণু অস্ত্র থাকতে পারে না, এটা খুবই সহজ কথা। তাদের হাতে পরমাণু অস্ত্র থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি সম্ভব নয়।’
সমঝোতা না হলে খুব খারাপ কিছু ঘটবে এবং ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে—সর্বশেষ ইরানকে এমন ইঙ্গিতই দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।