কয়েকদিন ধরে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অনেক কথাতেও সেই ইঙ্গিত ছিল। অবশেষে শনিবার সেই আশঙ্কায় সত্যি হয়। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। এরপর পুরো মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ওয়াশিংটন কি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ সময় ধরে আরেকটি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে, এবং শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ কত হতে পারে?
এই মুহূর্তে ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মোট খরচ কত হবে তা পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন প্রশাসনের জন্য আসল চ্যালেঞ্জ অর্থ নয়, বরং অস্ত্রভাণ্ডারের মজুত।
২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প তার নিজের ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করা আট মিনিটের এক ভিডিওতে জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভেতরে বড় সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছে।
পরে পেন্টাগন জানায়, অভিযানের নাম অপারেশন এপিক ফিউরি।
ট্রাম্প বলেন, এই অভিযানের লক্ষ্য হলো ‘ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে তা নিশ্চিত করা’।
তিনি আরও বলেন, আমরা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করব এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্প সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেব। এটি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, শনিবার অভিযান শুরুর পর ইরানে ১ হাজার ২৫০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। পৃথক এক বিবৃতিতে মার্কিন বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম), তারা ১১টি ইরানি জাহাজে হামলা চালিয়ে ধ্বংস করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অভিযানে বিমান হামলা, সমুদ্র থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, পারমাণবিক সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় সমন্বিত হামলা এবং ইরানের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে হামলা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এবারের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি তেহরানে তার নিজের কম্পাউন্ডে নিহত হন।
সোমবার ট্রাম্প বলেন, প্রয়োজন হলে যুদ্ধ যতদিন দরকার ততদিন চলবে, যা কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
সোমবার পর্যন্ত ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, ইরানে ১৩০টির বেশি স্থানে ৫৫৫ জন নিহত হয়েছেন।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ২০২৫ সালের ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে প্রায় ২১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দিয়েছে।
এর বাইরে ইয়েমেন, ইরান ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়ে পরিচালিত মার্কিন সামরিক অভিযানে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯ দশমিক ৬৫ থেকে ১২ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ, সংঘাত-সংশ্লিষ্ট মোট মার্কিন ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩১ দশমিক ৩৫ থেকে ৩৩ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার এবং এই ব্যয় এখনো বাড়ছে।
সেন্টকমের মতে, অপারেশন এপিক ফিউরিতে আকাশ, সমুদ্র, স্থল ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা বাহিনী মিলিয়ে ২০টিরও বেশি অস্ত্রব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে।
সেন্টকমের সাবেক অপারেশন পরিচালক কেভিন ডোনেগান আল জাজিরাকে বলেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য হলো যত দ্রুত সম্ভব ইরানের আক্রমণাত্মক সক্ষমতা দুর্বল বা ক্ষয়িষ্ণু করে দেওয়া, যেন তারা ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে না পারে।
Operation Epic Fury: The first 48 hours pic.twitter.com/uCQqHq5Ajx
— U.S. Central Command (@CENTCOM) March 2, 2026
বি-১ বোমারু বিমান, বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান (পারমাণবিক ও সামরিক অবকাঠামোতে হামলা), এফ-৩৫ লাইটিং টু ও এফ-২২ র্যাপ্টর (উন্নত স্টেলথ যুদ্ধবিমান), এফ-১৫ যুদ্ধবিমান (১ মার্চ কুয়েতের আকাশে এক ঘটনায় তিনটি হারিয়েছে, এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন, এফ/এ-১৮ সুপার হর্নেট, এ-১০ আক্রমণকারী জেট, ইএ-১৮জি গ্রোলার (ইলেকট্রনিক হামলা ও শত্রুর বিমান প্রতিরক্ষা দমন), এডাব্লিউএসিএস (আকাশভিত্তিক আগাম সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণ বিমান)।
লুকাস ড্রোন (স্বল্পমূল্যের একমুখী কমব্যাট ড্রোন, ইরানি নকশা থেকে রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ার করা), এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন, এম-১৪২ হিমারস রকেট সিস্টেম, টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র।
প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর, থাড, কাউন্টার-ড্রোন ব্যবস্থা।
ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ও ইএসএস আব্রাহম লিংকন নেতৃত্বাধীন দুটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ, পি-৮ সামুদ্রিক টহল বিমান, সি-১৭ গ্লোবমাস্টার, সি-১৩০ হারকিউলেস এবং আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার।
চলমান যুদ্ধের মোট খরচ অনুমান করা কঠিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।
মার্কিন থিংক ট্যাঙ্ক স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো ক্রিস্টোফার প্রেবল বলেন, পেন্টাগন এ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করেনি, তাই আমরা কেবল অনুমান করতে পারি। অস্ত্রের আলাদা খরচ, নৌ অভিযান—এসব নিয়ে ধারণা করা যায়, কিন্তু পুরো চিত্র বেশ জটিল।
আনাদোলু সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, অপারেশন এপিক ফিউরির প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্র হয়তো প্রায় ৭৭৯ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে।
এছাড়া হামলার আগে সামরিক প্রস্তুতিতে খরচ করেছে অতিরিক্ত প্রায় ৬৩০ মিলিয়ন ডলার। যেমন বিমান পুনর্বিন্যাস, এক ডজনের বেশি নৌযান মোতায়েন ও আঞ্চলিক সম্পদ সক্রিয় করা।
সেন্টার অপর অ্যা নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির তথ্য অনুযায়ী, ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের মতো একটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ পরিচালনায় প্রতিদিন প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার লাগে।
এর বাইরে রয়েছে সরঞ্জাম ক্ষতির খরচ। কুয়েতে ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ ঘটনায় অন্তত তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে।
প্রেবল বলেন, খরচের দিক বিবেচনা করলে যুদ্ধ চালানো সম্ভব। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেট এক ট্রিলিয়ন ডলার এবং তা ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়নে উন্নীত করার প্রস্তাবও আছে।
‘এক ট্রিলিয়ন ডলার দিয়ে যে কোনো যুদ্ধ অনেক দূর পর্যন্ত নেওয়া যায়। প্রশ্ন হলো, অস্ত্রভাণ্ডারের প্রকৃত মজুত, বিশেষ করে ইন্টারসেপ্টর, যেমন প্যাট্রিয়ান বা এসএম-৬ ক্ষেপণাস্ত্র।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান হারে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার অভিযান অনির্দিষ্টকাল চালানো সম্ভব নয়, সম্ভবত কয়েক সপ্তাহের বেশি এটা চালানো যাবে না।
এর আগে গত বছরের জুনে ১২ দিনের সংঘাতে একই ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল। তখন ধারণা করা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইন্টারসেপ্টর মজুত কমে আসছে।
এই ইন্টারসেপ্টরগুলোর কিছু ইউক্রেন ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত ছিল। সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হলে অন্য অঞ্চলে কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এছাড়া এগুলো দ্রুত উৎপাদন করাও সম্ভব নয়।
প্রেবল বলেন, ‘একটি প্যাট্রিয়ান বা এসএম-৬ অনেকগুলো জটিল প্রযুক্তির সরঞ্জাম। এগুলো দিনে শত শত বা হাজার হাজার তৈরি করা যায় না। এছাড়া উৎপাদনের গতি খুব বেশি নয়।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান যুদ্ধের প্রকৃত খরচ নির্ভর করবে এর সময়কাল, সামরিক ক্ষয়ক্ষতি এবং অস্ত্র মজুতের ওপর। অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ চালাতে পারলেও, দীর্ঘমেয়াদে অস্ত্রভাণ্ডারের চাপই হতে পারে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।