বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে তাত্ত্বিক ভিত্তি দেওয়া এবং স্বতন্ত্র সংস্কৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রধান পুরুষ আবুল মনসুর আহমদ। ঔপনিবেশিক সময়ে কলকাতার কৃত্রিম ফাঁপা রেনেসাঁ থেকে উদ্ভূত বাঙালি জাতীয়তাবাদের অতল গহ্বরে যখন তলিয়ে যাচ্ছিলো বাংলাদেশের জনমানুষের পরিচয়, ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি, তখন আবুল মনসুর আহমদ বাংলাদেশের সংস্কৃতির স্বকীয়তা নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং পাকিস্তান আমলে ‘বাংলাদেশের কালচার’ বই প্রকাশের মাধ্যমে তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রদানের মাধ্যমে ঐতিহাসিক কর্তব্য পালন করেছেন।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি সাংস্কৃতিক আয়োজন, উদযাপনের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন, যেখানে অনিবার্যভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ হিসেবে উঠে এসেছে ঈদুল ফিতর বা রোজার ঈদের আলাপ।
বাংলাদেশের কালচার বইতে রয়েছে স্বতন্ত্র নিবন্ধ ‘আনন্দের জোয়ার ঈদুল-ফিতর’। নিবন্ধে তিনি ঈদুল ফিতর নিয়ে বেশকিছু পর্যবেক্ষণ, হতাশা ও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। এগুলো উদ্ধৃত করে বর্তমান ঈদুল ফিতর উদযাপনের সঙ্গে মিলিয়ে একটি তুলনামূলক আলোচনার চেষ্টা করবো।
প্রথমে তিনি রোজা ও ঈদের মধ্যে তফাত, ঈদের দুই রাকাত নামাজের তাৎপর্য ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। এখানে তিনি ঈদে ইবাদতের চাইতে আনন্দ ও উৎসবকেই মুখ্য হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তবে ইসলামের বিধান অনুযায়ী, ঈদ উদযাপন উপলক্ষে হালালভাবে যত আনন্দ, উৎসব অনুষ্ঠিত হবে সবকিছুই ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে।
কিন্তু আবুল মনসুরের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, বাংলার মুসলমান সমাজ সচরাচর ইবাদত ও উৎসবকে বিপরীত হিসেবে চিহ্নিত করে। উৎসবও যে ইবাদত হতে পারে, পুণ্যের কাজ হতে পারে, এই ধারণা অন্তত তিনি যখন লিখছেন তখনও পর্যন্ত মুসলমান সমাজে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল।
ঈদের মতো হালাল, পবিত্র উপলক্ষেও যে বিরাট আনন্দ-উৎসব করা যায় এবং তা ধর্মীয় গণ্ডির মধ্যে থেকেই—তা বাংলার মুসলমান সমাজের কাছে ছিল অপরিচিত। এ কারণেই আবুল মনসুরকে লিখতে হয়েছে, ‘রোযা কিন্তু ঈদ নয়। ঈদও রোযা নয়। ঈদুল-ফিতর রমজানের রোযা নয়। …। রোযা ও ঈদ ত্যাগ ও ভোগের মতোই দুইটা অ্যান্টিথেসিস, বিপরীত গুণাত্মক কাজ। রমজানের বেলা একটা শর্ত আর একটা পুরস্কার; একটা ক্রিয়া আর একটা ফল। শ্রমের পুরস্কার যেমন বিশ্রাম, অধ্যয়নের পুরস্কার যেমন প্রমোশন, ত্যাগের পুরস্কার যেমন ভোগ, রমজানে রোজার পুরস্কার তেমনি ঈদুল-ফিতর।’
ঈদকে উৎসব হিসেবে উদযাপনের যে অভাব বাংলাদেশে ছিল তা নিয়ে আবুল মনসুরের আক্ষেপ ছিল। তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের উপাস-ভাংগা উল্লাসের উৎসবটা হইয়া পড়িয়াছে প্রার্থনা-সভা। রোজা শেষে ঈদের আনন্দে যেখানে প্রাণ-প্রাচুর্যে আমাদের জীবনের দুকূল ছাপাইয়া পড়া উচিত ছিল, সেখানে সেদিনেও আমরা ধর্মভারে নুইয়া গুরু-গাম্ভীর্যের মধ্যে দিন কাটাইবার চেষ্টা করিতেছি। ধর্মোৎসবের ধর্মটুকু উৎসবের উল্লাস-ধ্বনির নিচে চাপা পড়ার নজির দুনিয়াতে মাত্র একটি। সেটি আমাদের ঈদ। ঈদের দিনে আমরা মাঠে গিয়া দুই রাকাত নামাজ পড়ি। রোদে পুড়িয়া খোৎবা শুনি। কিছু বুঝি, বেশির ভাগই বুঝি না। যা বুঝি তার সবই বহুবার শোনা কথা। মন বসে না। খোৎবা শেষ হইলে দাঁড়াইয়া আশে-পাশের চিনা-জানা দু’চার-জনকে কোলাকুলি করি। ঘামে ভিজিয়া বাড়ি ফিরিয়া আসি। ভিজা কাপড় ছাড়ি। ব্যস্! ঈদ শেষ।’
তার সময়ে এই আক্ষেপ ছিল শতভাগ সত্য।
আজ ৬২ বছর পর বাংলাদেশে ঈদের চিত্র দেখলে বলতে বাধ্য হতে হয়, এই আক্ষেপের অবসান হয়েছে। এখন আর বাংলাদেশের মানুষ কেবল নতুন পোশাক, নামাজ আর খাবার দাবারের মধ্যে ঈদকে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং চাঁদরাত থেকে শুরু করে ঈদের পর কমপক্ষে এক সপ্তাহ পর্যন্ত থাকে ঈদের আমেজ।
ঈদের প্রস্তুতি, চাঁদ দেখা নিয়ে তরুণদের মধ্যে হৈ-হুল্লোড়, বড়দের কেনাকাটা, মেয়েদের রাত জেগে মেহেদি লাগানো ঈদকে পরিপূর্ণভাবেই উৎসব হিসেবে হাজির করেছে। ঈদের দিন আর খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে না মানুষজন; পরিবার পরিজন নিয়ে ঘুরতে বের হয় পার্কে, চিড়িয়াখানায়, ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা পরিদর্শনে।
কেবল যে তরুণরাই যে ঘুরতে বের হয় তা নয়, বরং নেতৃত্বে থাকে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা। ঈদের দিনে মা-বাবা, মামা, খালুদের হাত ধরে শিশু কিশোরদের ঘোরাঘুরির অসংখ্য ছবি প্রতি বছরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
আবুল মনসুর সত্যিকার চিত্র তুলে ধরেই লিখেছিলেন, ‘আমাদের আজিকার ঈদ সাংস্কৃতিক আনন্দোৎসব হিসাবে প্রাণহীন এবং জাতীয় উৎসব হিসাবে সম্ভাবনাহীন। আমাদের ঈদে আনন্দ নাই, আছে বেদনা। সংস্কৃতি নাই, আছে বিকৃতি। উল্লাস নাই, আছে আর্তনাদ। সুস্থ স্বাভাবিকরূপে নির্মল আনন্দ উপভোগ করিতে না পারিয়া আনন্দ-পাগল জনসাধারণ তাই পাপের পথে আনন্দ কুড়াইতেছে।’
১৯৬৪ সালে এই ঈদের এই চিত্র ছিল যথার্থই। কিন্তু সমাজ এগিয়েছে, মানুষের চিন্তা ভাবনার পরিবর্তন হয়েছে। সাংস্কৃতিক আনন্দোৎসব হিসেবে আজ ঈদের চেয়ে বড় কোনো উৎসব বাংলাদেশে দ্বিতীয়টি নেই। ঈদ উপলক্ষে হামদ, নাত, গজল, গান, কবিতা, গল্প ইত্যাদির প্রতিযোগিতা এখন সাধারণ ঘটনা। প্রতিটি জাতীয় দৈনিক থেকে শুরু করে সাপ্তাহিক, মাসিক এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রান্তিক পর্যায়ের পত্রিকাতেও ঈদ উপলক্ষে প্রকাশিত হয় বিশেষ সংখ্যা।
স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা যায়, বাংলাদেশে বাৎসরিক বইমেলার পর ঈদ উপলক্ষেই কবি, লেখক, সাহিত্যিক, গবেষকরা সবচেয়ে বেশি পরিমাণে লিখে থাকেন। অর্থাৎ বইমেলার পর ঈদুল ফিতর উপলক্ষেই সাহিত্য চর্চা হয় সবচেয়ে বেশি। একটি আনন্দোৎসবকে অর্থবহ করে তুলতে এরচেয়ে কার্যকরী উপায় আর কী থাকতে পারে!
ঈদকে সত্যিকারের আনন্দোৎসব হিসেবে গড়ে তুলতে সাহিত্যিকদের প্রচেষ্টা দেখেছিলেন আবুল মনসুর নিজেই। লিখেছেন, ‘আমাদের সুধী সমাজ ও তরুণরা এটা তীব্রভাবে অনুভব করিতেছেন। তাই তাঁরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অভাব দূর করার উদ্দেশ্যে ইদানিং ঈদ-রিইউনিয়নের আয়োজন করিয়া থাকেন। খুবই শুভ সূচনা। কিন্তু এই অনুষ্ঠান আজও খানা-পিনাতেই সীমাবদ্ধ। একে সাংস্কৃতিক অলংকার পরাইয়া তরুণদের প্রমাণ করিতে হইবে যে, আমাদের আনন্দ-উৎসবের চৌহদ্দি পেট নয়।’
ঈদকে পরিপূর্ণ আনন্দোৎসব হিসেবে গড়ে তুলতে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের যে প্রচেষ্টা আবুল মনসুর দেখেছিলেন ১৯৬৪ সালে, তা আজ একটি ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। সেই সময়ের যেসব তরুণ উদ্যোগী হয়ে সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে পুনর্মিলনী ও অন্যান্য অনুষ্ঠান শুরু করেছিলেন আজ তাদের কেউই হয়তো বেঁচে নেই, কিন্তু তাদের এই উদ্যোগ আজ ঈদ উৎসবের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।
আবুল মনসুর পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘ঈদ উৎসবকে আমাদের সাংস্কৃতিক আনন্দোৎসব ও পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশের) জাতীয় উৎসবে পরিণত করা নিতান্ত প্রয়োজন। মুসলমানদের সামাজিক ও আত্মিক কল্যাণের জন্যই এটা দরকার। কাজটা তেমন কঠিন নয়। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সুধীজনের উদ্যমে আর্ট-সাহিত্যের মাধ্যমে ধর্মীয় ঐতিহ্যের সাংস্কৃতিক রূপায়ণ সম্ভব। অতীতে তা হইয়াছে। আমাদের বেলায়ও তা হইতে পারে।’
আবুল মনসুর আজ বেঁচে থাকলে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতেন। তার এই পরামর্শ আমলে নিয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। ঈদ বর্তমান বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের জাতীয় উৎসব। ধর্মীয়, সামাজিক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক সব দৃষ্টিকোণ থেকেই ঈদুল ফিতর বাংলাদেশের বৃহত্তম উৎসব।
মৌলিকভাবে ঈদ অবশ্যই ধর্মীয় উৎসব, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের আন্তরিকতায় ও সময়ের প্রয়োজনে তা সামাজিক সৌহার্দ্য, সাহিত্যিক প্রাচুর্য, সাংস্কৃতিক প্রোজ্জ্বলতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক অনন্য উপলক্ষে পরিণত হয়েছে।
লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়, ১৯৬৪ সালে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই আবুল মনসুর আহমদ ঈদুল ফিতরকে সত্যিকার অর্থেই আনন্দোৎসবে পরিণত করার তাগিদ অনুভব করেছিলেন এবং জাতির উদ্দেশে তা পরামর্শ আকারে পেশ করেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যখন বাংলাদেশ সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বতন্ত্রভাবে পথচলা শুরু করলো তখন তার সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা অনিবার্য হয়ে উঠলো। এমতাবস্থায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঈদুল ফিতর হয়ে উঠতে লাগলো সাংস্কৃতিক স্বকীয়তার প্রধান অনুষঙ্গ।
উৎসব ছাড়া সংস্কৃতি হয় না। যে কোনো জাতির সংস্কৃতিতেই উৎসব থাকে প্রাণকেন্দ্রে। পাকিস্তান আমলে কলকাতার আরোপিত বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও পশ্চিম পাকিস্তানের আরোপিত মুসলিম জাতীয়তাবাদের চাপে বাংলাদেশের জাতীয় সত্তা যখন সঙ্কটে ভুগছিলো, সাংস্কৃতিক স্বকীয়তার যখন তীব্র অভাব তখন আবুল মনসুর আহমদ সাংস্কৃতিক স্বকীয়তার উপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। আর সাংস্কৃতিক স্বকীয়তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে জাতীয় উৎসবের জায়গায় তিনি ঈদুল ফিতরকে স্থাপন করতে চেয়েছেন। তার সেই চাওয়া আজ সূর্যসম বাস্তবতা।
ঈদুল ফিতর নিয়ে আবুল মনসুর আহমদের ১৯৬৪ সালের এই লেখার সঙ্গে বর্তমান মিলিয়ে দেখলেই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অগ্রগামিতা স্পষ্ট বোঝা যাবে। তিনি যখন লিখছেন তখনও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা স্পষ্ট হয়নি, কোনো তাত্ত্বিক ভিত্তি ছিল না, কোনো সাংস্কৃতিক তাগিদ ছিল না।
আজ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত; কলকাতার আরোপিত বাঙালি জাতীয়তাবাদ কিংবা পশ্চিম পাকিস্তানের আরোপিত মুসলিম জাতীয়তাবাদ কোনোটাই বাংলাদেশের মানুষের পরিচয়, জাতিসত্তা ও সংস্কৃতিকে কাঁবু করতে পারেনি—যেটি আবুল মনসুর আহমদ আন্তরিকভাবে চাইতেন।
সেই চাওয়া আজ পূরণ হয়েছে, সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্রতা নিয়ে চলতে শিখেছে বাংলাদেশ এবং তার সবচেয়ে বড় নিদর্শন ঈদুল ফিতর—আনন্দোৎসব। আজ শারীরিকভাবে আবুল মনসুর আহমদ না থাকলেও মানসিকভাবে নিশ্চয়ই আছেন। বাংলাদেশে আজ যে বহুবর্ণিল বৈচিত্র্যময় পদ্ধতিতে ঈদুল ফিতর সত্যিকার অর্থেই আনন্দোৎসব হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে তা দেখলে আবুল মনসুরের চেয়ে বেশি খুশি কেই বা হতেন!