অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প: আন্ডারডগদের রূপকথা যখন ইতিহাস বদলায়

Date:

বিশ্বকাপ মানেই কি কেবল বড় দল আর তারকা ফুটবলারদের ঝলক? ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, মাঠের আসল রোমাঞ্চ অনেক সময় লুকিয়ে থাকে সেই দলগুলোর মধ্যে, যারা টুর্নামেন্টে এসেছিল সীমিত প্রত্যাশা নিয়ে কিংবা কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই। যারা আমাদেরকে গায়ের লোম খাড়া করা সব মুহূর্ত উপহার দিয়ে প্রমাণ করে যে, ফুটবল অনিশ্চয়তার খেলা। বিশ্বকাপের বিশাল ক্যানভাসে আন্ডারডগদের এই ‘অসম্ভবকে সম্ভব’ করার গল্পগুলো স্মরণীয় হয়ে থাকে ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে।

সবশেষ কাতার বিশ্বকাপে মরক্কোর অবিশ্বাস্য যাত্রা ঠিক তেমনই এক মহাকাব্য। গ্রুপ পর্বে শক্তিশালী বেলজিয়ামকে স্তব্ধ করে দেওয়া থেকে শুরু করে নক-আউটে পা রাখা—অ্যাটলাস লায়নদের প্রতিটি কদম ছিল আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। এরপর শেষ ষোলোতে স্পেনের বিপক্ষে টাইব্রেকারে নাটকীয় জয় এবং কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগালকে বিদায় করে দেওয়া। এতে রচিত হয় আফ্রিকা ও আরব বিশ্বের প্রথম কোনো দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে ওঠার ঐতিহাসিক মুহূর্ত। মরক্কো কেবল দর্শকদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়নি, বরং সারা বিশ্বের আন্ডারডগ দলগুলোর জন্য এক অনুপ্রেরণার মডেলে পরিণত হয়েছে।

এই অদম্য মানসিকতার শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে উত্তর কোরিয়ার রূপকথা আজও ফুটবল ভক্তদের কাছে বিস্ময়। সেবার কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে পুরো ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল এশিয়ার এই দেশটি। একইভাবে বলা যায় ক্যামেরুন, বুলগেরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক ও কোস্টারিকাসহ আরও বেশ কয়েকটি দলের কথা। এরাই প্রমাণ করেছে যে, মাঠের লড়াইয়ে ফেভারিট তকমা সব সময় কাজে আসে না। তাদের বুক চিতিয়ে লড়াই করার গল্পগুলোই বিশ্বকাপকে অনন্য উচ্চতায় নেওয়ার পথে বহুদূর এগিয়ে নিয়েছে।

মরক্কো (২০২২)

সাফল্য: প্রথম আফ্রিকান ও আরব দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার গৌরব অর্জন।

স্মরণীয় পারফরম্যান্স: ২০১৮ সালের রানার্সআপ ক্রোয়েশিয়া ও তৃতীয় স্থান পাওয়া বেলজিয়ামকে পেছনে ফেলে গ্রুপ সেরা হয় মরক্কো। নকআউট পর্বে ইউরোপের দুই শিরোপাপ্রত্যাশী দলকে ছেঁটে ফেলে তারা। স্পেন ও ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ে দলটি।

চমকপ্রদ তথ্য: রক্ষণভাগ সুশৃঙ্খল রেখে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত খেলা পাঁচ ম্যাচে স্রেফ একটি গোল হজম করেছিল কোচ ওয়ালিদ রেগ্রাগির মরক্কো। সেটিও ছিল নায়েফ অগার্দের আত্মঘাতী।

ক্রোয়েশিয়া (২০১৮)

সাফল্য: আধুনিক যুগে সবচেয়ে কম জনসংখ্যার দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলার কীর্তি।

স্মরণীয় পারফরম্যান্স: গ্রুপ পর্বে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে ৩-০ গোলে হারিয়ে নিজেদের শক্তির জানান দেয় ক্রোয়েশিয়া। এরপর সেমিফাইনালে ফেভারিট ইংল্যান্ডকে হারিয়ে তাদের ‘ইটস কামিং হোম’ স্লোগান থামিয়ে দেন লুকা মদ্রিচরা।

চমকপ্রদ তথ্য: ফাইনালের পথে ক্রোয়েশিয়ার শারীরিক ও মানসিক সহ্যক্ষমতা ফুটবল বিশ্বকে অবাক করেছিল। টানা তিনটি নকআউট ম্যাচে অতিরিক্ত সময়সহ ১২০ মিনিট খেলা এবং এর মধ্যে দুবার পেনাল্টি শ্যুটআউটে জিতে ফাইনালে পা রাখে তারা।

দক্ষিণ কোরিয়া (২০০২)

সাফল্য: বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলা, যা এশিয়ার কোনো দেশের জন্য সেরা কীর্তি।

স্মরণীয় পারফরম্যান্স: নিজেদের ডেরায় গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে পৌঁছে ইতালিকে গোল্ডেন গোলের সুবাদে বিদায় করে দেয় দক্ষিণ কোরিয়া। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ফুটবল দুনিয়াকে বিস্মিত করেছিলেন হং মিয়াং বো-ইউ সাং চুলরা।

চমকপ্রদ তথ্য: রেফারিং নিয়ে বিতর্ক থাকলেও হাই প্রেসিং ফুটবল খেলে বিশ্বসেরা দলগুলোকে দক্ষিণ কোরিয়া নাজেহাল করেছিল। অথচ এর আগে পাঁচবার বিশ্বকাপে অংশ নিলেও একটিও জয় ছিল না তাদের।

তুরস্ক (২০০২)

সাফল্য: প্রায় অর্ধশতাব্দী পর বিশ্বকাপে ফিরে এসেই তৃতীয় স্থান দখল।

স্মরণীয় পারফরম্যান্স: কোয়ার্টার ফাইনালে আরেক আন্ডারডগ সেনেগালকে গোল্ডেন গোলে হারায় তুরস্ক। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী লড়াইয়েও তাদের প্রতিপক্ষ ছিল আন্ডারডগ দলই। স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়াকে তাদের মাঠে স্তব্ধ করে দিয়ে পোডিয়ামে জায়গা করে নেয় তুর্কিরা।

চমকপ্রদ তথ্য: ১৯৫৪ সালের পর আবার বিশ্বকাপে পৌঁছে সেবার দুটি ম্যাচ হেরেছিল তুরস্ক। হাসান সাসদের দুটি পরাজয়ই ছিল চ্যাম্পিয়ন হওয়া ব্রাজিলের বিপক্ষে— একটি গ্রুর্বে, আরেকটি সেমিফাইনালে।

কোস্টারিকা (২০১৪)

সাফল্য: তিন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের মৃত্যুকূপে পড়েও কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছানো।

স্মরণীয় পারফরম্যান্স: সব যুক্তি ভুল প্রমাণ করে উরুগুয়ে ও ইতালিকে হারিয়ে দেয় কোস্টারিকা। আর ইংল্যান্ডের সঙ্গে তারা করে ড্র। ফলে সাবেক তিন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন টপকে গ্রুপ সেরা হয়ে নকআউটে পৌঁছায় উত্তর আমেরিকান দেশটি।

চমকপ্রদ তথ্য: ধারণা করা হয়েছিল, গ্রুপের তলানিতে থাকবে কোস্টারিকা। কিন্তু ব্রায়ান রুইজ ও কেইলর নাভাসদের অতিমানবীয় পারফরম্যান্স তাদেরকে সেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় গল্পে রূপান্তর করে।

সেনেগাল (২০০২)

সাফল্য: নিজেদের অভিষেক বিশ্বকাপেই কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার অভাবনীয় সাফল্য।

স্মরণীয় পারফরম্যান্স: উদ্বোধনী ম্যাচেই শিরোপাধারী ফ্রান্সকে ১-০ গোলে হারিয়ে পুরো ফুটবল বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয় তারা। শেষ ষোলোতে গোল্ডেন গোলের সুবাদে সুইডেনের বিপক্ষে জয়ের পর শেষ আটে তাদের স্মরণীয় যাত্রা থামে তুরস্কের কাছে গোল্ডেন গোলেই হেরে।

চমকপ্রদ তথ্য: কোচ ব্রুনো মেতসুর অধীনে সেনেগাল নির্ভীক ও ছন্দময় ফুটবল শৈলী উপহার দিয়েছিল। তাদের স্কোয়াডের ২৩ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ২১ জনই তখন ফ্রান্সের বিভিন্ন পর্যায়ের ক্লাবে খেলতেন।

বুলগেরিয়া (১৯৯৪)

সাফল্য: বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে একটি ম্যাচও না জেতা দলের চতুর্থ স্থান অর্জন।

স্মরণীয় পারফরম্যান্স: কোয়ার্টার ফাইনালে তৎকালীন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে ২-১ গোলে হারিয়ে আসরের সবচেয়ে বড় অঘটনের জন্ম দিয়েছিল বুলগেরিয়া। এর আগে গ্রুপ পর্বে দিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনাকেও পরাজিত করেছিল তারা।

চমকপ্রদ তথ্য: ওই আসরের আগে বিশ্বমঞ্চে ১৬ ম্যাচ খেলে কোনো জয় ছিল না বুলগেরিয়ার। তবে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া রিস্টো স্টইচকভের কাঁধে চড়ে প্রতিযোগিতার সবচেয়ে ভয়ংকর আক্রমণভাগগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছিল তারা।

ক্রোয়েশিয়া (১৯৯৮)

সাফল্য: স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নিয়েই তৃতীয় স্থান দখল।

স্মরণীয় পারফরম্যান্স: যুগোস্লাভিয়ার ভাঙনের পর বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম আগমনেই ক্রোয়েশিয়া হইচই ফেলে দিয়েছিল। জার্মানিকে ৩-০ গোলে কোয়ার্টার ফাইনালে তারা উড়িয়ে দিয়েছিল ৩-০ গোলে। এছাড়া, দ্বিতীয় রাউন্ডে রোমানিয়া ও তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে নেদারল্যান্ডস হয়েছিল তাদের শিকার।

চমকপ্রদ তথ্য: ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের ১৯তম দল হিসেবে বিশ্বকাপে গিয়েছিলেন ডাভর শুকাররা। চোখ ধাঁধানো পারফরম্যান্স দেখিয়ে বছর শেষ হওয়ার আগেই চতুর্থ স্থানে পৌঁছে যায় ক্রোয়েশিয়া।

ক্যামেরুন (১৯৯০)

সাফল্য: প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট পাওয়া।

স্মরণীয় পারফরম্যান্স: উদ্বোধনী ম্যাচে তখনকার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে চমকে দেয় ক্যামেরুন। যদিও ম্যাচটি তারা মাত্র ৯ জন নিয়ে শেষ করতে পেরেছিল। এরপর রোমানিয়া ও কলম্বিয়াকে হারিয়ে তারা এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করে।

চমকপ্রদ তথ্য: ক্যামেরুনের সাফল্যের নায়ক ছিলেন ৩৮ বছর বয়সী রজার মিলা। অবসর ভেঙে ফিরে এসে ৪ গোল করেন তিনি। তার সেই আইকনিক উদযাপন ফুটবল ইতিহাসের অমর অংশ হয়ে আছে।

উত্তর কোরিয়া (১৯৬৬)

সাফল্য: ইউরোপ ও দুই আমেরিকা মহাদেশের বাইরে প্রথম দল, যারা কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে।

স্মরণীয় পারফরম্যান্স: পাক দো ইকের লক্ষ্যভেদে গ্রুপ পর্বে ইতালির বিপক্ষে উত্তর কোরিয়ার ১-০ গোলের জয়টি আজও বিশ্বকাপের ইতিহাসের সেরা অঘটনগুলোর একটি। শেষ আটে ৩-০ গোলে এগিয়েও গেলেও ইউসেবিও অসাধারণ হ্যাটট্রিকে পর্তুগালের কাছে পরাস্ত হয় তারা।

চমকপ্রদ তথ্য: উত্তর কোরিয়ার খেলোয়াড়রা পশ্চিমা বিশ্বের কাছে একদমই অচেনা ছিলেন। তাদের আছে অভাবনীয় হারের পর ইতলিয়ান সমর্থকরা ক্ষোভে বিমানবন্দরে নিজ দলের খেলোয়াড়দের পচা টমেটো ছুড়ে মেরেছিলেন।

Popular

More like this
Related

ইরানের গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ল ৫ শতাংশ

ইরানে পারস্য অঞ্চলের অন্যতম প্রধান গ্যাসক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের...

মার্কিন দূতাবাসগুলোকে ‘অবিলম্বে’ নিরাপত্তা পর্যালোচনার নির্দেশ পররাষ্ট্র দপ্তরের

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে সব মার্কিন কূটনৈতিক মিশনকে...

সদরঘাটে লঞ্চের ধাক্কায় নিহত ১, নিখোঁজ আরও ২

রাজধানীর সদরঘাটে ঈদযাত্রায় বাড়ি ফিরতে গিয়ে লঞ্চের ধাক্কায় প্রাণ...

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ৪ কিলোমিটার যানজট

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের উত্তরবঙ্গমুখী লেনে ৪ কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।...