ক্ষমতার কেন্দ্রে এপিএস ইউনুছ আলী: সাক্ষাৎ নিয়ন্ত্রণ থেকে পদায়ন, তদবির বাণিজ্যের অভিযোগ

Date:

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) কৃষিবিদ মোঃ ইউনুছ আলীকে ঘিরে প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে নানা আলোচনা চলছে। মন্ত্রীর সাক্ষাৎ নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার, বদলি-পদায়ন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে তদবির, সরকারি বরাদ্দ ও ফাইল প্রক্রিয়ায় আর্থিক সুবিধা নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

রাজনৈতিক ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের সূত্র ধরে এসব অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় একজন এপিএসের অস্বাভাবিক প্রভাব প্রশাসনিক কার্যক্রমে অস্বস্তি তৈরি করেছে।

নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে ড. খোন্দকার আকবর হোসেন বাবুল অভিযোগ করেন, কৃষিবিদ মোঃ ইউনুছ আলীর আচরণ ও কর্মকাণ্ডে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেকের কাছে মনে হচ্ছে তিনি তাঁর দায়িত্বের সীমার বাইরে গিয়ে ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন।

ড. বাবুল দাবি করেন, পরপর দুই দিন মন্ত্রণালয়ে গিয়েও তিনি মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেননি। অথচ একই সময়ে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির জন্য সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তার অভিযোগ, দলের কঠিন সময়ে পাশে থাকা অনেক নেতা-কর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীও প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও সাক্ষাতের সুযোগ পাচ্ছেন না। এমনকি মহাসচিবের পক্ষ থেকে সাক্ষাতে বাধা না দেওয়ার নির্দেশনা থাকার পরও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

শুধু রাজনৈতিক নেতাকর্মী নন, একাধিক জনপ্রতিনিধিও একই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন। তাদের ভাষ্য, এপিএস ইউনুছ আলীর অনুমতি ছাড়া মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে বিভিন্ন এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রম, প্রশাসনিক সমন্বয় ও জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।

স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রয়োজনে মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে অনেক কর্মকর্তাকে। এর ফলে প্রকল্প অনুমোদন, পদায়ন, নীতিগত সিদ্ধান্ত ও দাপ্তরিক কার্যক্রমে বিলম্ব হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ মিল্ক প্রডিউসার্স কো-অপারেটিভ ইউনিয়ন লিমিটেড (মিল্কভিটা), বিভিন্ন ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ (এলজিইডি) অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সিদ্ধান্তেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন ইউনুছ আলী। মিল্কভিটার নিয়োগ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়েও তার বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়ন নিয়েও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন পদে পদায়নের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি কক্সবাজার জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ নাসরুল্লাহর পদায়ন ঘিরেও অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের স্বাধীন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও জেলা পরিষদের উন্নয়ন বরাদ্দ ছাড়ের ক্ষেত্রেও কমিশন নেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ফাইল আটকে রেখে আর্থিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করা হয়।

সরকারি ক্রয় ও টেন্ডার অনুমোদন প্রক্রিয়াতেও তার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। একাধিক সূত্রের দাবি, সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে (CCGP) পাঠানোর আগে বিভিন্ন ফাইল প্রক্রিয়াকরণে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। চাহিদা অনুযায়ী সুবিধা না পেলে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল মন্ত্রীর কাছে উপস্থাপনে বিলম্ব করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কয়েকটি পদায়ন নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। ২৮ জুন ২০২৬ দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জামালপুর ও ময়মনসিংহে নির্বাহী প্রকৌশলী পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, বিতর্কিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় পর্যায়ের প্রভাব ছিল।

একই বিষয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে দাবি করেন, এসব পদায়ন নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।

এর আগে ১৯ মে ২০২৬ জুলকারনাইন সায়ের আরেক পোস্টে সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফিরোজ আলম তালুকদারকে পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনার চেষ্টা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অভিযোগ করা হয়, “পল্লী সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ (২য় পর্যায়)” প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে তার নাম প্রস্তাবের জন্য এলজিইডির ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল।

এ ছাড়া ২২ জুন ২০২৬ দৈনিক খোলা কাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে কয়েকজন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে বিভিন্ন প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক করার বিষয়েও প্রশ্ন ওঠে। ওই প্রক্রিয়াতেও মন্ত্রণালয় পর্যায়ের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ সামনে আসে।

প্রশাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন এপিএসকে ঘিরে এমন ধারাবাহিক অভিযোগ মন্ত্রণালয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কৃষিবিদ মোঃ ইউনুছ আলীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Popular

More like this
Related

শেষ হলো যুক্তরাষ্ট্র-ইরান প্রথমদিনের বৈঠক, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ‘গুরুতর মতবিরোধ’

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের প্রথম দিনের বৈঠক শেষ হয়েছে।...

কুকুরকে কামড়ে নিলো কুমির: ঘটনা তদন্তে প্রশাসন, মরদেহের নমুনা পাঠানো হলো ঢাকায়

বাগেরহাটে ঐতিহাসিক খান জাহান আলি (রহ.) মাজারের দিঘিতে একটি...

যেভাবে ধ্বংস হলো সোনাদিয়া দ্বীপের ম্যানগ্রোভ বন

ভয়ংকর দৃশ্য! হাজার হাজার একরের ম্যানগ্রোভ বন কেটে ফেলা...

ম্যাচ জিতে জোতাকে স্মরণ করে রোনালদো বললেন, ‘এটা বিশেষ মুহুর্ত’

নাটকীয়তার পর ম্যাচ জিতে দিয়েগো জোতার ২১ নম্বর জার্সিটি...