বিএনপি সরকারের ৪ মাসে দেশের আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির খতিয়ান

Date:

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বছরের পর বছর ধরে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল, দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।

বাস্তবে দেখা গেল, গণঅভ্যুত্থানের পরপর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গুম বন্ধ হলেও সার্বিকভাবে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও কারা হেফাজতে মৃত্যুর মতো ঘটনা বন্ধ হয়নি। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটে, মব সহিংসতা বেড়ে যায়।

এ সময় আশাহত মানুষের মধ্যে সম্ভাব্য নির্বাচিত সরকারকে কেন্দ্র করে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল। সেসময় প্রথম আলোর উদ্যোগে করা এক জরিপ থেকে দেখা যায়, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ আশা করেছিলেন, নির্বাচিত সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত ও নারীর নিশ্চিন্তে চলাফেরা ও নিরাপত্তার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সফল হবে। সরকার ভিন্ন রাজনৈতিক মতের ব্যাপারে সহিষ্ণুতা দেখাবে বলে আশাবাদী ছিলেন অর্ধেকেরও বেশি (৫৪ শতাংশ) মানুষ।

বাস্তবতা হলো, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। খুন, ধর্ষণ, মব সহিংসতা, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ প্রতিদিনই ঘটছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরবর্তী তিন মাসে সারা দেশে ৯১৫টি হত্যাকাণ্ডের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১০টিরও বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মার্চ মাসে ৩১৭টি, এপ্রিলে ২৮৮টি ও মে মাসে ৩১০টি মামলা হয়েছে। ২০২৫ সালের একই তিন মাসে ৯৯৩টি মামলা হয়েছিল। তবে এর মধ্যে ২২৬টি ছিল আগের ঘটনার জের। ফলে তুলনামূলক প্রকৃত সংখ্যাটি ছিল ৭৬৭। অন্যদিকে ২০২৪ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৭৯৪।

সরকারের ১০০ দিন উপলক্ষে টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়, গণপিটুনি ও মব সহিংসতার বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানের কথা বললেও তা বাস্তবে কমেনি। মার্চ ও এপ্রিলে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৬৯ থেকে ৮০টি। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩১ থেকে ৪২ জন এবং আহত হয়েছেন ৭০ থেকে ১২৫ জন। এ ছাড়া, কারা হেফাজতে ১৪ থেকে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নির্যাতনে আহত হয়েছেন পাঁচজন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন একজন। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও অবমাননার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন সাতজন এবং দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে তিনটি। বিভিন্ন স্থানে মাজার এবং ধর্মীয় ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। ঢাকা, কুষ্টিয়া ও সিলেটে মাজার ও বাউল সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে এবং একজন পীরকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

দেশের আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদন থেকে। সংস্থাটি বলছে, জুনে সারা দেশে অন্তত ৭৮টি মব সহিংসতার ঘটনায় ৩৩ জন নিহত ও ১২৬ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। এর আগের মাসে মব সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ছিল ৩২ ও আহত ৭১ জন। সে হিসাবে আহতের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৭৭ শতাংশ। চোর সন্দেহ, ছিনতাইয়ের অভিযোগ, গুজব কিংবা ভুল বোঝাবুঝিকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলায় প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) জুন মাসের প্রতিবেদন অনুসারে, জুনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, হেফাজত ও নির্যাতনে তিনজন নিহত হন। তাদের মধ্যে দুইজন কথিত বন্দুকযুদ্ধে এবং একজন ডিবি হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যান। গ্রেপ্তার এড়াতে পালাতে গিয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়। ২১ জুন ফরিদপুরের মধুখালীতে ডিবি পুলিশের হেফাজতে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদের মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, পুলিশের নির্যাতনে তার মৃত্যু হয়েছে। ২৪ জুন খাগড়াছড়ির রামগড়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে গোলাগুলির সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে রবিন ত্রিপুরা নামে ইউপিডিএফ কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। ২৫ জুন খুলনার কয়রা উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় কোস্ট গার্ডের সঙ্গে কথিত ডাকাত ‘দুলাইভাই বাহিনীর’ সদস্যদের বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে সাকাত সরদার নামে একজন নিহত হন।

এইচআরএসএসের প্রতিবেদন অনুসারে, জুন মাসে দেশের বিভিন্ন কারাগারে সাতজন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের একজন, বিএনপির একজন ও পাঁচজন সাধারণ আসামি। তাদের মধ্যে ২৪ জুন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে আটকের একদিন পর যুবলীগ নেতা নুরুল আলম চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান; ১৮ জুন কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে মাদক সংশ্লিষ্ট মামলায় আটক যুবদল কর্মী শহীদুল্লাহ রাসেলের মৃত্যু হয়।

এসব ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের মতোই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংস্কৃতি চলমান থাকবে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়া ও শেয়ার করাকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি গ্রেপ্তারের ঘটনা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত মার্চ-এপ্রিল মাসে অন্তত চারজনকে ৫৪ ধারা, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সাইবার সুরক্ষা আইনে গ্রেপ্তার এবং একজনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুসারে জুন মাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অন্তত ১১টি ঘটনায় ১১ জনকে আটক ও সাতটি মামলা হয়।

সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্টসের (বিএজে) এক প্রতিবেদন অনুসারে, জুন মাসে সারা দেশে অন্তত ৪০টি ঘটনায় ৫১ জন সংবাদকর্মী শারীরিক হামলা, নির্যাতন ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। এসব হামলার ঘটনা ঘটিয়েছেন মাদক চোরাকারবারি, রাজনৈতিক দলের উশৃঙ্খল নেতাকর্মী, পেশাজীবী ও ঠিকাদাররা। সরকারের এক প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে ‘দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন’র ছয় সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা ও সংবাদপত্রটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদককে গ্রেপ্তার করে কয়েকদিন কারাগারে রাখার মতো ঘটনা ঘটেছে।

এসব ঘটনার মধ্যে দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগে যে ধরণের সংস্কার ও পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল তা হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোতে ব্যক্তি ও পোশাকের অদল-বদল হলেও মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। অথচ ন্যূনতম মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাঠামোগত সংস্কার খুবই জরুরি।

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর তাদের সুপারিশে র‍্যাব বিলুপ্তি, বিজিবিকে সীমান্ত রক্ষা ও ডিজিএফআইকে সামরিক গোয়েন্দা তৎপরতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছিল। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে পারেনি। বিএনপি সরকারেরও এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বরং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পুলিশ কমিশন গঠন ও মানবাধিকার কমিশনের সংস্কার বিষয়ে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল সেগুলোও বাতিল করা হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ বাতিল করে বিএনপি সরকার নতুন যে খসড়া মানবাধিকার কমিশন আইন করছে, তাতে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন তদন্তের এখতিয়ার খর্ব করা ও কমিশনের ওপর সরকারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে।

সবমিলিয়ে নির্বাচিত সরকারের আমলে দেশের আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নের যে বিপুল প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ হয়নি। কোনো সরকার যতই উন্নয়ন বা জনকল্যাণের কথা বলুক না কেন, আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি সন্তোষজনক না হলে সেই সরকার দ্রুত অজনপ্রিয় হয়ে যায়।

তাই পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের পরিণতি বরণ করতে না চাইলে বিএনপি সরকারের উচিত হবে আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এজন্য একদিকে সরকারি দল বিএনপির দলীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে, নেতাকর্মীদের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব থেকে দূরে রাখতে হবে। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারবিভাগের কাঠামোগত সংস্কার করে সত্যিকার অর্থে পেশাদার পুলিশ বাহিনী ও নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদারকি ও জবাবদিহিতার জন্য স্বাধীন ও শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন গঠন করতে হবে।

আর এসব কিছুর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে ক্ষমতাসীন সরকার কর্তৃক বাস্তব সমস্যার গভীরতা উপলব্ধি করে তা সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা পোষণ করবার উপর।

 

কল্লোল মোস্তফা: প্রকৌশলী ও লেখক; তিনি বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবেশ ও উন্নয়ন অর্থনীতি নিয়ে কাজ করেন।
[email protected]

Popular

More like this
Related

কুষ্টিয়ায় দরবার শরিফে হামলা চালিয়ে ‘কালান্দার বাবা’কে পিটিয়ে-কুপিয়ে হত্যা

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে একটি দরবার শরিফে হামলা চালিয়ে একজনকে পিটিয়ে...

সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্সের মৌখিক পরীক্ষা স্থগিত, ফলাফলে হস্তক্ষেপের অভিযোগ

সিঅ্যান্ডএফ (ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং) এজেন্ট লাইসেন্সের মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি...

ক্ষুব্ধ-ব্যথিত রামেন্দু মজুমদার ও তারিক আনাম

শিশু রামিসার নির্মম হত্যাকাণ্ড নাড়া দিয়েছে সারা দেশকে। তার...