অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষের দিকে জনসম্মতি ছাড়া স্বাক্ষরিত ‘বাংলাদেশ-আমেরিকা দ্বিপাক্ষিক রেসিপ্রোকাল বাণিজ্যিক চুক্তি’ ও ‘জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক পার্টনারশিপ চুক্তি (ইপিএ)’ নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। দেশের সার্বভৌমত্ব, কৃষি ও খাদ্য-ব্যবস্থা, লোকায়ত জ্ঞান, অর্থনীতি ও মেধা-সম্পদের সুরক্ষা এসব চুক্তির ফলে ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
চুক্তিটির আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয় ২০২২ সালে। একটি জয়েন্ট স্টাডি গ্রুপের প্রতিবেদন নিয়ে কয়েক দফা আলোচনার ২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি চুক্তিটি সই হয়।
বলা হচ্ছে, জাপানের বাজারে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা ভোগ করলেও এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের কারণে এটি সীমিত হবে। তাই একটি স্থায়ী ও নিয়মভিত্তিক বাণিজ্য কাঠামো নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ প্রথম কোনো উন্নত দেশের সঙ্গে এই ইকোনমিক পার্টনারশিপ চুক্তি করেছে।
২২ চ্যাপ্টার ও ৯ এনেক্স সংবলিত ১ হাজার ২৭২ পৃষ্ঠার চুক্তির মূল বিষয়গুলো হলো—পণ্যের শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহার, সেবা খাত উন্মুক্তকরণ, বিনিয়োগ সুরক্ষা ও প্রসার, কাস্টমস ও বাণিজ্য সহজকরণ এবং মেধা-সম্পদ অধিকার সুরক্ষা।
কিন্তু বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস চুক্তি মোতাবেক জেনেটিক রিসোর্স, জিআই ও মেধা-সম্পদের অধিকার রক্ষার কথা বলা হয়েছে ইপিএ চুক্তিতে। অথচ, ট্রিপস চুক্তির আর্টিকেল ২৭.৩.বি অনুযায়ী, জেনেটিক রিসোর্স থেকে লোকায়ত জ্ঞান সবকিছুই পেটেন্টযোগ্য এবং বিশ্বব্যাপী সমালোচিত।
ট্রিপস কার্যকর হলে দেশের কৃষক সমাজ, গ্রামীণ ও আদিবাসী জনগণের লোকায়ত জ্ঞান, বায়ো-কালচারাল রিসোর্স ও মেধা-সম্পদের অধিকার হুমকিতে পড়বে। কাজেই জনগণের পূর্ণ সম্মতি, কার্যকর অংশগ্রহণ, জনসম্পদ সুরক্ষার শক্তিশালী পাবলিক কাঠামো ছাড়া এই চুক্তি কার্যকর করা যাবে না।
স্থানীয় জেনেটিক রিসোর্স, লোকায়ত জ্ঞান ও বায়োপাইরেসি বিতর্ক
বিশ্বজুড়ে গবেষণা, উন্নয়ন, বায়োপ্রসপেক্টিং কিংবা উন্নয়নের নামে স্থানীয় ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সম্মতি ও সিদ্ধান্ত ছাড়া বহু জেনেটিক রিসোর্স ও লোকায়ত জ্ঞানের বায়োপাইরেসি ঘটে চলেছে। বন্দনা শিবা ‘বায়োপাইরেসি: দ্য প্লান্ডার অব ন্যাচার অ্যান্ড নলেজ’ কিংবা গ্রাহাম ডাটফিল্ড তার ‘ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি, বায়োজেনিক রিসোর্স অ্যান্ড ট্র্যাডিশনাল নলেজ’ বইতে বায়োপাইরেসির বিপদ তুলে ধরে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জেনেটিক রিসোর্স ও লোকায়ত জ্ঞান সুরক্ষার দাবি জানান।
সম্মতি, স্বীকৃতি ও ন্যায্য বেনিফিট শেয়ারিং ছাড়াই আমাজনের কায়াপো আদিবাসীদের লোকায়ত ভেষজবিদ্যা ব্যবহার করে বডিশপ কোম্পানি বাণিজ্যিক পণ্য বিক্রি করেছে। ভারতের কানি আদিবাসীদের আরোগ্গ্যপাচ্চা উদ্ভিদ দিয়ে ‘জীভানি’ হার্বাল মেডিসিন বিক্রি করছে দ্য আরায়া বৈদ্য ফার্মেসি। কেনিয়ার সিম্বা পাহাড়ের দিগু আদিবাসীদের ব্যবহৃত ‘মায়তেনাস বুচানানি’ গাছটি আমেরিকার ন্যাশনাল ক্যানসার রিসার্চ ইন্সটিটিউট ক্যানসার চিকিৎসায় বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করেছে। আফ্রিকার সান আদিবাসীদের হুদিয়া গাছের লোকায়ত জ্ঞান ব্যবহার করে ফাইজার ও ইউনিলিভার ব্যবসা করেছে। গ্রামীণ নারীদের উদ্ভাবন হলেও কোনো স্বীকৃতি ও বেনিফিট শেয়ারিং ছাড়াই বাংলাদেশেও বিভিন্ন কোম্পানি কাসুন্দি বানিয়ে বিক্রি করে।
আয়ুর্বেদ, ইউনানী, চাকমা তালিক ছাড়াও বাংলাদেশে বাঙালি ও আদিবাসী সমাজে ঐতিহ্যগত চিকিৎসায় বহু ভেষজ উদ্ভিদ ব্যবহৃত হয়। ইপিএ চুক্তির ফলে দেশীয় ভেষজ উদ্ভিদ এবং এর লোকায়ত ব্যবহার ও স্থানীয় বাজার হুমকিতে পড়তে পারে। বিদেশি কোম্পানি কোনো ফার্মাকোলজিক্যাল বৈশিষ্ট্যকে পৃথক করে নতুন ফর্মুলেশন বানিয়ে পেটেন্ট ও একতরফা বাণিজ্য করতে পারে। বায়োপাইরেসি ঠেকানো ও লোকায়ত মেধা-সম্পদ সুরক্ষায় দেশে কোনো শক্তিশালী পাবলিক কাঠামো ও রেজিস্টার নেই। কোনো বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে লোকজ্ঞান পেটেন্ট হলে তার বিশদ ঐতিহ্যগত বিবরণ আন্তর্জাতিকভাবে নথিভুক্ত হয় না। এটি একটি বায়োকলোনিয়াল প্রক্রিয়া, যা উৎস জনগোষ্ঠীকে ‘আদার’ করে এবং রাষ্ট্র রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হয়।
কর্তৃত্ববাদী পেটেন্ট ও মেধা-সম্পদ অধিকার
বাংলাদেশের সাবঅলটার্ন জনতা দার্শনিকভাবে প্রাণের ওপর পেটেন্টবিরোধী। কিন্তু বিশ্বব্যাপী কর্তৃত্ববাদী পেটেন্টের কারণে আজ প্রাণসম্পদ হোক আর মেধা-সম্পদ, সবই ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে।
১৯৯০ সালে মার্কিন ডাব্লিউ.আর.গ্রেস কোম্পানি নিম, ১৯৯৫ সালে ইউনিভার্সিটি অব মিসিসিপি মেডিক্যাল সেন্টার হলুদ এবং ১৯৯৭ সালে মার্কিন রাইসটেক ইনকরপোরেশন বাসমতি চালকে জোর করে পেটেন্ট করেছিল। এরপরই বিশ্বব্যাপী মেধা-সম্পদের সুরক্ষা বিতর্ক জোরালো হয়।
বাংলাদেশের লোকায়ত চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত বেড়েলা (সিডা কর্ডোফোলিয়া) গাছের ওপর পেটেন্ট আছে জাপানের। ডায়াবেটিস চিকিৎসায় ব্যবহৃত শ্রীলংকার ‘সালাসিয়া রেটিকুলেটা’ গাছের পেটেন্ট নিয়েছে জাপানিজ ফুজিফিল্ম করপোরেশন, মরিশিতো জিনতান কো. লিমিটেড ও কোবায়াশি ফার্মাসিউটিক্যাল কো. লিমিটেড। বাংলাদেশ ও ভারতে ঐতিহ্যগতভাবে ডায়াবেটিসের জন্য ব্যবহৃত মধুনাশিনী গাছের পেটেন্ট নিয়েছে জাপানের মেইজি সেইতো কো. লিমিটেড।
ইপিএ চুক্তিতে মেধা-সম্পদ বলতে কপিরাইট, ট্রেডমার্ক, ভৌগলিক নির্দেশক (জিআই), শিল্প নকশা, পেটেন্ট, উদ্ভিদ জাত সুরক্ষা, ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট নকশা ও গোপন তথ্যের সুরক্ষাকে বোঝানো হয়েছে। চুক্তির আর্টিক্যাল-১২ এ বলা হয়েছে, জাপান ও বাংলাদেশ উভয়ে মিলে আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এমন ব্যবস্থা করবে যাতে মেধা-সম্পদ যথাযথ ও কার্যকরভাবে সবার জন্য সমানভাবে সুরক্ষিত থাকে। উভয় দেশকেই মেধা-সম্পদ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে।
এ ক্ষেত্রে জাপানের মতো একটি ধনী ও ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের সঙ্গে অতি দুর্বল কাঠামো নিয়ে বাংলাদেশ কীভাবে মেধা-সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সমান দক্ষতা তৈরি করবে?
‘বাংলাদেশ পেটেন্ট আইন ২০২২’ অনুযায়ী কেবলমাত্র প্রযুক্তিগত যেকোনো পণ্য বা প্রক্রিয়ার উদ্ভাবনে যদি নূতনত্ব ও উদ্ভাবনী ধাপ বিদ্যমান থাকে এবং শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত হয়, তবে তা পেটেন্টযোগ্য হবে। প্রাকৃতিক বস্তু, কৃষিপদ্ধতি, সাহিত্য, কলা, সংগীত ও শিল্পকর্ম, ঐতিহ্যগত জ্ঞান থেকে উদ্ভাবনের মতো বিষয় পেটেন্ট আইনের অন্তর্ভুক্ত না। তাই ইপিএর কারণে দেশের জেনেটিক ও সাংস্কৃতিক মেধা-সম্পদ ভিন্নভাবে ব্যবহৃত হতে পারে।
ইপিএ চুক্তি অনুযায়ী যেকোনো নতুন, উদ্ভাবনী ধাপ অতিক্রমকারী ও শিল্পে ব্যবহারযোগ্য পণ্য ও প্রক্রিয়া পেটেন্টযোগ্য (আর্টিকেল-১২.৩৩) এবং পেটেন্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য করা যাবে না। তবে মানুষ, উদ্ভিদ, প্রাণি, পরিবেশ ও জনস্বার্থ পরিপন্থী হলে তা পেটেন্ট হবে না। উদ্ভিদ, প্রাণি ও প্রাকৃতিক জৈবিক প্রক্রিয়া পেটেন্টযোগ্য হবে না। তবে অণুজীব ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রক্রিয়া পেটেন্ট হতে পারে। আদিবাসীদের ট্র্যাডিশনাল পানীয় তৈরিতে চুমান্থি, রাণু কিংবা বাখরের মতো লোকজ ঈস্টকেক ব্যবহৃত হয়। দেশে বহু ঐতিহ্যবাহী খাদ্য ও পানীয় প্রস্তুতে কিংবা পাট জাগের ক্ষেত্রে অণুজীব উপাদান লাগে। এসব অণুজীব, উপাদান, প্রযুক্তি বা প্রস্তুত প্রণালির কোনো বাণিজ্যিক পেটেন্ট মেধা-সম্পদের সামাজিক মালিকানার সংস্কৃতিকে বিনষ্ট করবে।
হরিপদ কপালী বা নূর মোহাম্মদ কীভাবে স্বীকৃতি পাবেন?
উদ্ভিদের নতুন জাত পেটেন্টের ক্ষেত্রে ট্রিপসের মতো কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি মোতাবেক কার্যকর সুই জেনেরিসের মতো বাধ্যবাধকতা আছে ইপিএ চুক্তিতে। যদিও ট্রিপস চুক্তিতে এই ‘কার্যকারিতার’ কোনো ব্যাখ্যা বা মানদণ্ড নেই। বিশ্ব ক্ষমতা মানচিত্রে বাংলাদেশের মতো দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর তৈরি সব সুই জেনেরিস আইনি দলিলই শেষমেশ ‘অকার্যকর’ হয়ে যায়।
সিবিডি (১৯৯২) ও ট্রিপসের আলোকে ‘সুই জেনেরিস’ হিসেবে বাংলাদেশ ‘উদ্ভিদ জাত সংরক্ষণ আইন (২০১৯)’ চূড়ান্ত করে। এই আইন এখনো কৃষকদের জাত সুরক্ষার জন্য দেশেই কার্যকর হয়নি। ঝিনাইদহের হরিপদ কপালী উদ্ভাবিত হরি ধান, খাগড়াছড়ির ফকুমার ত্রিপুরার ফকুমার ধান, সুনামগঞ্জের নুয়াজ আলী ফকিরের চুরাক ধান, সাতক্ষীরার দিলীপ তরফদারের চারুলতা ধান, ময়মনসিংহের সেন্টু হাজংয়ের সেন্টুশাইল ধান কিংবা রাজশাহীর নূর মোহাম্মদের খরাসহিষ্ণু নূর ধান এখনো স্বীকৃতি পায়নি। যশোর অঞ্চলের স্থানীয় জাত ‘খাসখানি’ থেকে পিওর লাইন সিলেকশনের মাধ্যমে উদ্ভাবিত জাতের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ব্রি ধান-৩৪’। ইপিএ চুক্তির মাধ্যমে জাপান কী এই ধান খাসখানি হিসেবে ব্যবহার করবে নাকি ব্রি ধান-৩৪? কৃষক কী খাসখানি থেকে প্রাপ্ত সুবিধার কোনো লভ্যাংশ দাবি করতে পারবে? যদিও বাংলাদেশে এখনো লোকায়ত জ্ঞান ও জেনেটিক রিসোর্সের জাতীয় বেনিফিট শেয়ারিং গাইডলাইন ও নীতিমালা নেই।
ইপিএ চুক্তির মাধ্যমে কোনো বিদেশি কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের কালিজিরা, কাটারিভোগ, বাদশাভোগ, চিনিগুড়া, তুলশিমালা, জামাইসোহাগী, রাধুনীপাগল বা দাদখানির মতো সুগন্ধি ল্যান্ডরেস ধান জাতগুলো ব্যবহার করতে পারে। এসব জাতের জেনেটিক অ্যানালাইসিস করে কোনো নতুন ইনোভেশন পেটেন্ট করলে কৃষকের হাজার বছরের বীজ অধিকার লঙ্ঘিত হবে।
ইপিএ চুক্তির কারণে উদ্ভিদ জাত সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা মানতে যদি বাংলাদেশকেও ইউপিওভি (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব দ্যা প্রোটেকশন অব নিউ ভ্যারাইনিস অব প্ল্যান্ট) সই করতে হয়, তাহলে দেশের কৃষক সমাজ ফসলের জাতের প্রথাগত মালিকানা হারাবে। কারণ, ইউপিওভিতে কৃষক নয়, কেবলমাত্র প্রজননকারীর একছত্র আইনি মালিকানা স্বীকৃত। এর মাধ্যমে বহুজাতিক বীজ কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ বাড়বে এবং কৃষকের বীজ সংরক্ষণ ও বিনিময় অধিকার হারিয়ে যাবে।
জিআই এবং নকশিকাঁথার অধিকার
বাংলাদেশে ২০১৩ সালে ‘ভৌগলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন’ তৈরি করে। দেশের সর্বত্র নকশিকাঁথা বুননের প্রচলন থাকলেও ২০২৪ সালের ২৪ এপ্রিল নকশিকাঁথাকে জামালপুরের জিআই হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে (জিআই-৩৫)। ‘পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের’ ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৬২টি জিআই অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ।
ইপিএ চুক্তি বলছে, ট্রিপস চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিটি দেশকে তার নিজস্ব আইন অনুযায়ী জিআই রক্ষা করতে হবে (আর্টিকেল-১২.২৫)। যাতে অন্য কেউ একই নাম ব্যবহার না করতে পারে ও নকল বা বিভ্রান্তিকর পণ্য বিক্রি না হয়। জানা যায়, ১৯৮৫ সালে জাপান-বাংলাদেশ কালচারাল এক্সচেঞ্জ অ্যাসোসিয়েশন যশোরের শার্শা উপজেলার গ্রামীণ নারীদের নিয়ে একটি নকশিকাঁথা প্রকল্প শুরু করে। নানা উৎস থেকে সংগৃহীত নকশিকাঁথা রপ্তানি হয় জাপানে। ইপিএ চুক্তি অনুযায়ী যদি জিআই সুরক্ষা দিতে হয়, তাহলে নকশিকাঁথা কী ‘জামালপুরের নকশিকাঁথা’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং হবে, নাকি দেশের অন্যান্য অঞ্চলের কাঁথাও জিআই হিসেবে নিবন্ধিত হবে?
চুক্তি অনুযায়ী উভয় দেশ একটি সাব-কমিটির মাধ্যমে মেধা-সম্পদ ও জিআই সুরক্ষা নিয়ে নিয়মিত আলোচনা ও সমন্বয় করবে এবং পরস্পরের জিআইকে স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করবে। এই সাব-কমিটিতে কী কৃষক, কুটিরশিল্পী, কারিগর, তাঁতি ও গ্রামীণ কারুশিল্পীদের প্রতিনিধিত্ব কীভাবে নিশ্চিত হবে তার কোনো ব্যাখ্যা চুক্তিতে নেই।
জনসম্পদ সুরক্ষায় নাগরিক ঐক্য জোরালো হোক
জাপানের প্রকৃতি ও সংস্কৃতির উদাহরণ ও শক্তি বাংলাদেশের জন্য সবসময়ই অবিস্মরণীয় উপহার। মাসানোবু ফুকুওকার ‘দ্য ওয়ান স্ট্র রেভ্যুলেশন’ প্রকৃতি সুরক্ষা ও প্রাকৃতিক কৃষির প্রতি আমাদের মনোযোগী করে। আইনু আদিবাসীদের লোকায়ত জ্ঞান ও প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার সুরক্ষায় জাপানের অঙ্গীকার আমাদের প্রেরণা জোগায়।
‘ফ্যাশন-ওলোজী: অ্যান ইন্ট্রুডাকশন টু ফ্যাশন স্টাডিজ’ বইয়ের লেখক বিখ্যাত জাপানি ফ্যাশন-সমাজবিজ্ঞানী ইউনিয়া কাওয়ামুরা ফ্যাশনকে সমাজব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হিসেবে দেখেন। ডিজাইন বা এসথেটিকসের চেয়ে যা সমাজ ও সংস্কৃতির সিম্বোলিক প্রসেস হয়ে ওঠে। ইপিএ চুক্তির মাধ্যমে উভয় দেশ যেসব উপাদানকে ইকোনমিক পার্টনারশিপের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, তার সবই উভয় দেশের জনসম্পদ। প্রকৃতি ও সংস্কৃতির জটিল মিথষ্ক্রিয়ায় যা ইতিহাস, ঐতিহ্য, অস্তিত্ব, পরিচয় ও গর্বকে ধারণ করে। কোনো চুক্তির মাধ্যমে এসব জনসম্পদের সম্মতিহীন বাণিজ্যিকায়ন, দূষণ, দখল বা কর্তৃত্ব কেউ মানবে না। সামগ্রিক জনবিশ্লেষণের জন্য চুক্তিটি দেশের সবশ্রেণি ও বর্গের মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হোক।
পাভেল পার্থ: গবেষক ও লেখক
[email protected]