শহীদ সাবের: মৃত্যুঞ্জয়ী এক প্রাণ

Date:

১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ, এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পুরান ঢাকার বংশালের দৈনিক সংবাদের কার্যালয়ে গান পাউডার দিয়ে অগ্নিসংযোগ করে। ভয়াবহ সেই আগুনে পুড়ে মৃত্যুবরণ করেন প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক শহীদ সাবের। নিভে যায় এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের জীবন। 

মুক্তিযুদ্ধে প্রথম শহীদ সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী ছিলেন শহীদ সাবের। পেয়েছিলেন মাত্র ৪১ বছরের এক স্বল্প আয়ুর জীবন। কিন্তু শহীদ সাবেরের সে জীবন ছিল সাক্ষাৎ বিপ্লবের প্রতিমূর্তি। প্রতিবাদী সেই কণ্ঠস্বর কখনোই মেনে নেয়নি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। তাইতো পদে পদে শোষণ-বঞ্চনার মুখোমখি হতে হয়েছে সাবেরকে। কিন্ত কোনোকিছুতেই দমে যাননি সাবের। 

অদম্য সাবেরের বিপ্লবী জীবনের শুরু হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন চট্টগ্রামের কলেজিয়েট স্কুলে পড়া কিশোর এ কে এম শহীদুল্লাহ। পোশাকি সেই নামে কেউ আর চেনে না শহীদ সাবেরকে। চট্টগ্রামের সেই ভাষা আন্দোলনে শহীদ সাবের পালন করেছিলেন নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা। 

চট্টগ্রামের ভাষা সংগ্রামী ও কবি মাহবুবুল আলম চৌধুরী সেই স্মৃতির কথা লিখতে গিয়ে লিখেছেন, ‘১৯৪৮ সালে ১১ মার্চকে ‘রাষ্ট্রভাষা দাবি দিবস’ ঘোষণার পর এ উপলক্ষে চট্টগ্রামে জেমসেন হলে অনুষ্ঠিতব্য জনসভার প্রচারণা করি আমরা। আমি আর শহীদ সাবের মাইক নিয়ে প্রচারে নেমেছিলাম। লালদিঘিতে মুসলিম লীগের সন্ত্রাসীরা আমাদের ওপর হামলা করে মাইক কেড়ে নিয়ে যায়। আমরা পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মরক্ষা করি।’

ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ার আগে কিশোর বয়সেই বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন শহীদ সাবের। ১৯৫০ সালে চট্টগ্রামে ছাত্র ফেডারেশনের এক সমাবেশে বক্তৃতারত অবস্থায় আটক হন তিনি। সে বছরের শেষদিকে রাজশাহী জেলে স্থানান্তরিত করা হয় তাকে। রাজশাহী জেলে তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী কমিউনিস্ট বন্দিদের। 

জেলে থাকাকালে অবরুদ্ধ জীবনের কাহিনী নিয়ে সাবের লিখেছেন কারাগারের দিনলিপি ‘আরেক দুনিয়া থেকে’। এটি একপর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল কলকাতায়। সেখানে ‘নতুন সাহিত্য পত্রিকা’র ১৩৫৭ বঙ্গাব্দের ‘চৈত্র’ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিলো তার এই লেখা, আলোড়নও সৃষ্টি করেছিল। 

লেখাটি পড়ে মুগ্ধ হয়ে পত্রিকার সম্পাদককে চিঠি লিখেছিলেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে জেলে বন্দী হওয়ায় নিজ নামে লেখা পাঠাতেন না শহীদ সাবের। লিখতেন ‘জামিল হোসেন’ ছদ্মনামে।

জেলে থাকা অবস্থাতেই আইএ পাশ করেছিলেন সাবের। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকরি করতেন তার বাবা। বাবার দেওয়া মুচলেকার শর্তে তখন জেল থেকে ছাড়া পান সাবের। কিন্তু চিরপ্রতিবাদী সাবের মেনে নেননি সেই শর্ত। তার বাবা তখন দুঁদে সরকারি কর্মকর্তা। পরিপূর্ণ পেশাদারিত্বের চাদরে মোড়ানো এক মানুষ। 

শহীদ সাবেরকে নিয়ে একটি লেখায় প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সাবেরের বাবার প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘একসময়ে আমরা কাছাকাছি বাসায় থাকতাম। দেখতাম তিনি অস্বস্তিতে আছেন। জানতাম ঘরে তাঁর সৎমা, পরিবারের তিনি প্রথম সন্তান। পিতা সরকারি চাকুরে, জেলখাটা পুত্র তার জন্য স্বস্তির কারণ ছিল না। পিতা কাজ করতেন স্বরাষ্ট্র বিভাগে, সাবের তখনো জেল থেকে বের হননি, আমরা আমাদের হাতে লেখা পত্রিকা ছেপে বের করেছিলাম। কে যেন আমাদের বলেছিল কাজটি বেআইনি, সাবেরের পিতার সঙ্গে আমাদের দেখা বাসায় গিয়ে পত্রিকা বিক্রির উপলক্ষে, তাঁকে জিজ্ঞেস করায় তিনি হেসে বলেছিলেন, “হ্যাঁ, তোমাদের এই পাবলিকেশন তো আনঅথরাইজড নিউজ লেটার বলে গণ্য হবে, এটা বেআইনি প্রকাশনা।” আমরা অভিজ্ঞ ও দায়িত্বশীল সরকারি কর্মচারীর স্বর শুনতে পেয়েছিলাম তাঁর কণ্ঠে, আমাদের মনে পড়েছিল যে তার জ্যেষ্ঠ সন্তান তখন কারাগারে, রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে।’

সাবেরের কৈশোরও ভালো কাটেনি। সরকারি চাকরিজীবী বাবার সঙ্গে কখনোই তার মতের মিল হয়নি। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় সাবেরের বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এই আঘাত তাকে পরবর্তীতে বহন করতে হয়েছিল। স্কুলে পড়া অবস্থাতেই মামার সঙ্গে চলে যান কলকাতায়। কিন্তু সেখানেও পরে তার সৎ মা থাকতে শুরু করলে একপর্যায়ে সাবেরকেও থাকতে হয় সৎ মায়ের সংসারে। অবশ্য সাতচল্লিশে দেশভাগ হলে চট্টগ্রামে ফিরে আসতে হয় তাকে।

তারুণ্যে বিনাবিচারে চার বছর কারাগারে থাকার পর ১৯৫৪ সালে মুক্তি পেয়েছিলেন সাবের। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার এক বছর পর  জগন্নাথ কলেজের নৈশ বিভাগ থেকে বিএ পাশ করেন তিনি। এরপর যোগ দেন শিক্ষকতায়। পরে দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক পদে যোগ দেন।

‘আরেক দুনিয়া থেকে’ প্রকাশিত হওয়ার পর চার বছর লেখালেখিতে সক্রিয় ছিলেন শহীদ সাবের। একদিকে যেমন তিনি গল্প লিখেছেন, তেমনি অনুবাদ করেছেন রুশ সাহিত্যের বিখ্যাত একাধিক সাহিত্যকর্ম। এর মধ্যে আলেকজান্ডার পুশকিনের ‘দ্য কুইন অব স্পেডস’-এর বাংলা অনুবাদ করেছিলেন ‘ইসকাপনের বিবি’ নামে। নিকোলাই গোগোলের ‘ডায়েরি অব এ ম্যাডম্যান’-এর বাংলা অনুবাদ করেন ‘পাগলের ডায়েরী’, মার্কিন সমাজসেবী ও মানবতাবাদী বেথুনকে নিয়ে ক্যাথরিন পিয়ারের লেখা ‘ম্যারি ম্যাকলড বেথুন’  গ্রন্থের অনুবাদ করেছিলেন ‘কালো মেয়ের স্বপ্ন’ নামে।

স্বপ্নবান মানুষ শহীদ সাবেরের জীবনটাই যেন ছিল বঞ্চনার আর পদে পদে নিগৃহীত হওয়ার। তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক প্রশাসন সাবেরকে পদে পদে হয়রানি করেছে। চোখের সমস্যার কারণে প্রখর মেধাবী সাবের পাকিস্তানের সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিসেস বা সিএসএস পরীক্ষা দিতে পারেননি। 

তবে কেন্দ্রীয় তথ্য সার্ভিসের পরীক্ষায় অবিভক্ত পাকিস্তানে তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। কিন্তু এমন সোনায় সোহাগা চাকরিও তার কপালে জুটেনি। ছাত্রাবস্থায় রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে জেল খাটা শহীদ সাবেরকে তথ্য দপ্তরের মতো স্পর্শকাতর স্থান পাবেন—এ যেন কল্পনারও অতীত। স্বভাবতই প্রথম স্থান অধিকারের পরেও তাকে সে সুযোগ দেওয়া হয়নি।

ব্যক্তিগত জীবনে একটি মেয়েকে পছন্দ করতেন সাবের। কিন্তু সেই মেয়ে ছিল জমিদার-কন্যা। ফলে জেলফেরত কমিউনিস্ট নেতা সাবেরের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে রাজি হননি সেই জমিদার।

ষাটের দশকে ততোদিনে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে গ্রামে ফিরে গেছেন সাবেরের বাবা। সাবের প্রথমে গ্রামে চলে গেলেও কিছুদিন বাদেই ঢাকায় ফিরে আসেন তিনি। কিন্তু নিজের স্বল্প আয়ে সংসার চালানোর মতো পরিস্থিতি ছিলো না তার। থাকার মতো কোনো জায়গা পাননি সাবের। 

একদিকে সরকারি চাকরি, অন্যদিকে পারিবারিক চাপ, আবার প্রতিষ্ঠিত না হতে পারার মানসিক পীড়ন—সবমিলিয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে একপর্যায়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন সাবের। সংবাদ কার্যালয়ই হয়ে উঠেছিল তার ঘরবাড়ি। সেখানেই থাকতেন তিনি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দেওয়া আগুনে পুড়ে সেখানেই মৃত্যু হয় মৃত্যুঞ্জয়ী সাবেরের। আগুনে পুড়ে শারীরিকভাবে শহীদ সাবেরের মৃত্যু হলেও আমাদের মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সাবেরের প্রতিবাদী লেখা অনুপ্রেরণার রসদ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো।

আর তাইতো শহীদ সাবেরের কথা বলতে গিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন, ‘শহীদ সাবেরকে কেবল একজন ব্যক্তি মনে হয় না আমার, যেন তিনি প্রতীকও। প্রতীক তিনি প্রতিশ্রুতির ও অঙ্গীকারের এবং পথানুসন্ধানের।’

Popular

More like this
Related

‘ডিজিটাল লেনদেন তৃণমূলে ছড়িয়ে দিতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার’

দেশে নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন তৃণমূল পর্যায়ে...

আরও ১৪ জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ

দেশের আরও ১৪ জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার।আজ...

যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের গড় মূল্য গ্যালনপ্রতি ৪...

মার্কিন সামরিক বিমানকে ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি ইতালি

মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার পথে সিসিলির একটি বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক বিমান...