শৈশবে আনোয়ারা আখতারের দিন শুরু হতো নিমগাছের ডাল কেটে। ডালের এক প্রান্ত চিবিয়ে ব্রাশের মতো তৈরি করে দাঁত মাজতেন তিনি। সত্তরের দশকে এটিই ছিল বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি ঘরের সাধারণ দৃশ্য। অনেক পরিবার কাঠের কয়লা ব্যবহার করত, কেউবা ছাই। শহরের উচ্চবিত্তদের বাইরে তখন টুথপেস্ট ছিল প্রায় অপরিচিত এক বস্তু।
আনোয়ারা আখতার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, আশির দশকে কলেজে পড়ার জন্য নেত্রকোনা শহরে আসার আগপর্যন্ত তিনি কখনো টুথপেস্ট ব্যবহার করেননি।
তখন পর্যন্ত বাংলাদেশে দাঁত মাজতে কয়লা, ছাই আর টুথ পাউডারই ছিল ভরসা। কিন্তু এখন সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। ইউনিলিভার বাংলাদেশের তথ্য বলছে, সাশ্রয়ী দেশীয় ব্র্যান্ড, মানুষের আয় বৃদ্ধি এবং ওরাল হেলথ নিয়ে সচেতনতা বাড়ার ফলে বর্তমানে দেশের প্রায় ৯৪ শতাংশ পরিবার সকালে টুথব্রাশ ও টুথপেস্ট ব্যবহার করে। গত এক দশকে দেশে টুথপেস্টের ব্যবহার ৮৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯৪ শতাংশে পৌঁছেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, বিশ্বে ১৮৮০-এর দশকে বাণিজ্যিক টুথপেস্ট প্রথম দেখা গেলেও আমাদের অঞ্চলে এটি পৌঁছায় ১৯৪০ থেকে ৫০-এর দশকে। তখন এর ব্যবহার ছিল শুধু শহরকেন্দ্রিক। গ্রামের বাসিন্দারা মূলত নিমের ডাল বা মেসওয়াক ব্যবহার করতেন।
স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে গ্রামে টুথপেস্ট পৌঁছাতে শুরু করলেও নব্বইয়ের দশকে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রচার ও শিক্ষার প্রসারে এর ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়তে থাকে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে দেশে দাঁতের যত্নসংশ্লিষ্ট পণ্যের বাজারের আকার প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার। এর মধ্যে শুধু টুথপেস্টের বাজারই দেড় হাজার কোটি টাকার। আর মোট বিক্রির প্রায় ৬৫ শতাংশই আসে গ্রামগঞ্জ থেকে।
বর্তমানে এই বাজারে ১৪টির বেশি দেশি ও বহুজাতিক কোম্পানি প্রতিযোগিতা করছে। ইউনিলিভার বাংলাদেশের (ক্লোজআপ ও পেপসোডেন্ট) করপোরেট অ্যাফেয়ার্স ডিরেক্টর শামীমা আক্তার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও সচেতনতা বাড়ায় টুথপেস্টের চাহিদা বেড়েছে। এর বাজার এখন একটি স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগে শুধু শহরকেন্দ্রিক চাহিদা থাকলেও এখন গ্রামেও সমান চাহিদা।’
তিনি আরও বলেন, শহরের বাসিন্দারা অনেক আগেই টুথপেস্টের ব্যবহার শুরু করেছেন। গ্রামের দিকে শুরুতে এর প্রসার ধীর থাকলেও পরে তা অতি দ্রুতগতিতে বেড়েছে।
স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেডের (হোয়াইট প্লাস ও ম্যাজিক) মার্কেটিং বিভাগের প্রধান জেসমিন জামান বলেন, গত ১৫ থেকে ২০ বছরে এই বাজার স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। মানুষ এখন টুথপেস্টে ভেষজ উপাদান খুঁজছেন।
কোহিনূর কেমিক্যালসের এক কর্মকর্তা জানান, ভেষজ বা হারবাল টুথপেস্টের বাজার বর্তমানে মোট বাজারের প্রায় ৫ শতাংশ। ভারতে ভেষজ বা হারবাল টুথপেস্ট অনেক বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সামগ্রিকভাবে বাজার বড় হওয়ার কারণেই এই প্রবৃদ্ধি হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
শামীমা আক্তার বলেন, স্থানীয় ভোক্তাদের একটি বড় অংশ দামের বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন। দাম কম হওয়ায় গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই টুথ পাউডার ব্যবহার করে। গ্রামে টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত মাজার বিষয়টি এখনো প্রতিদিনের অভ্যাস হিসেবে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
টুথপেস্ট উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল—যেমন ফ্লোরাইড কম্পাউন্ড, সরবিটল ও ফ্লেভার অয়েল মূলত আমদানিনির্ভর। ২০২২-২৩ সালের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমায় অনেক পরিবার টুথপেস্টের ব্যবহার কিছুটা কমিয়েছিল। এ ছাড়া দাম কম হওয়ায় কম আয়ের মানুষ এখনো টুথ পাউডার বেছে নেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (ডেন্টাল) এ এন এম নাজমুল হক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘কয়লা বা ছাই খসখসে হওয়ায় তা দাঁতের এনামেল ক্ষয় করে। এতে দাঁত শিরশির করা থেকে শুরু করে মাড়ির রোগ ও দাঁত পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। সঠিক ওরাল হাইজিন বা মুখের যত্নের অভাবে ওরাল ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক রুমন বণিক বলেন, বাংলাদেশে অধিকাংশ রোগী দাঁতে ব্যথা হওয়ার আগে চিকিৎসকের কাছে যান না। দাঁতের যত্নে নিয়মিত ব্রাশ করার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং প্রতি তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে দাঁতের চিকিৎসক দেখানোর পরামর্শ দেন তিনি।