ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রতিদিন ভিডিও ব্রিফিং দেওয়া হয়। তবে, এতে যুদ্ধের সব দিক প্রতিফলিত হচ্ছে কি না—তা নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রতিদিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য প্রায় দুই মিনিটের একটি ভিডিও আপডেট তৈরি করছেন বলে জানায় সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ।
তিনজন বর্তমান ও এক সাবেক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে এনবিসি জানিয়েছে, এসব ভিডিওতে সর্বশেষ ৪৮ ঘণ্টায় ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে চালানো সবচেয়ে বড় ও সফল হামলাগুলোর ফুটেজ দেখানো হয়।
একজন কর্মকর্তা এসব ভিডিওকে ‘বিস্ফোরণ দৃশ্যের ধারাবাহিক ক্লিপ’ হিসেবেও বর্ণনা করেছেন।
তবে কর্মকর্তারা বলছেন, এই ভিডিওই ট্রাম্পের একমাত্র তথ্যসূত্র নয়। তিনি শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা উপদেষ্টা, বিদেশি নেতা এবং সংবাদমাধ্যম থেকেও নিয়মিত আপডেট পান।
তবুও তার কিছু মিত্রের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে—এসব ভিডিও ব্রিফিং যুদ্ধের পূর্ণ চিত্র তুলে ধরছে না।
ওই তিন কর্মকর্তাদের মতে, চার সপ্তাহ ধরে চলা এই যুদ্ধের সবদিক যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারছেন না ডোনাল্ড ট্রাম্প।
কর্মকর্তারা এনবিসিকে জানান, প্রতিদিন শত শত হামলা হওয়ায় সব তথ্য প্রেসিডেন্টকে জানানো সম্ভব নয়। ফলে বাছাইকৃত ভিডিওগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা তুলে ধরলেও পুরো সংঘাতের বাস্তব চিত্র প্রতিফলিত করে না।
এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে ঘটা প্রতিটি বিষয় আমরা তাকে জানাতে পারি না। ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্যই বেশি গুরুত্ব পায়, ইরানের পদক্ষেপ তুলনামূলকভাবে কম উঠে আসে।’
এর উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান এয়ারবেসে ইরানি হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি রিফুয়েলিং বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ট্রাম্পকে আগে জানানো হয়নি। তিনি সংবাদমাধ্যম থেকেই বিষয়টি জানতে পারেন।
এ ধরনের তথ্য সামনে আসার পর ট্রাম্প প্রকাশ্যে ও আড়ালে অসন্তোষ দেখান। তিনি ট্রুথ সোশ্যালে সংবাদমাধ্যমকে ‘বিভ্রান্তিকর’ আখ্যা দেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ‘যুদ্ধ হারাতে চাওয়ার’ অভিযোগ তোলেন।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত দাবি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সক্রিয়ভাবে মতামত শোনেন এবং শীর্ষ উপদেষ্টাদের কাছ থেকে খোলামেলা তথ্য প্রত্যাশা করেন।’
প্রতিরক্ষা দপ্তরের মুখপাত্র শন পারনেলও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট নিয়মিতভাবে অপারেশনের সবদিক সম্পর্কে অবগত থাকছেন।’
একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প বিভিন্ন উৎস থেকে মতামত নেন এবং বাইরের উপদেষ্টাদের সঙ্গেও কথা বলেন, যাতে জনমতের প্রবণতা বোঝা যায়।
এনবিসি নিউজের এক জরিপে দেখা গেছে, যুদ্ধ নিয়ে জনমত দলীয় বিভাজনের ভিত্তিতে তীব্রভাবে বিভক্ত। অধিকাংশ ভোটার ট্রাম্পের ব্যবস্থাপনাকে সমর্থন না করলেও ‘মাগা’ সমর্থকদের মধ্যে তার প্রতি সমর্থন প্রায় একচ্ছত্র।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট কীভাবে তথ্য পান এবং উপদেষ্টারা কীভাবে তা উপস্থাপন করেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের সময়ও প্রশাসনগুলো ‘গ্রুপথিঙ্ক’-এর অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিল।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ট্রাম্প সংবাদমাধ্যম ও বিদেশি নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন, যার মধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে প্রায় প্রতিদিন কথা বলা অন্তর্ভুক্ত। তিনি নিজেও বিভিন্ন ভিডিও যাচাই করেন। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে আগুন লাগার একটি ভিডিও পরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বলেও শনাক্ত হয়।
জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ডের দপ্তর জানিয়েছে, প্রেসিডেন্টকে ‘সর্বোত্তম ও নিরপেক্ষ’ গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ কংগ্রেসে বলেছেন, তিনি সপ্তাহে ১০ থেকে ১৫ বার ট্রাম্পকে ব্রিফ করেন।
তবে ট্রাম্পের কিছু মিত্রের আশঙ্কা, তথ্যপ্রবাহ সীমিত থাকলে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সাবেক কর্মকর্তা জো কেন্ট এনবিসিকে বলেন, ‘অনেক গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রেসিডেন্টের কাছে পৌঁছায়নি, আর সেগুলো নিয়ে যথেষ্ট বিতর্কও ছিল না।’