গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই একটি প্রশ্ন সর্বত্র ঘুরপাক খাচ্ছে—এই অভিযান কবে শেষ হবে?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানে চলমান সামরিক অভিযান ‘ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার’ কথা বললেও তার ঘোষিত অনেক লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি। বরং লক্ষ্য বদলাচ্ছে এবং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। তাই এই যুদ্ধের শেষ কোথায়, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
আজ রোববার সংবাদ মাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে উঠে আসে এ যুদ্ধকে ঘিরে যেসব অপ্রত্যাশিত বাস্তবতার মুখে এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ট্রাম্প।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলমান এ যুদ্ধের প্রভাব বাড়ছেই। একদিকে জ্বালানির দাম বাড়ছে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে ইরানের শাসনব্যবস্থা টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে আর চাপের মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোও।
এ অবস্থায় গত শুক্রবার ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানে চলমান সামরিক অভিযান ‘ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার’ কথা ভাবছেন তিনি।
ট্রাম্পের এ বক্তব্যে মনে হয়েছে, তিনি এই যুদ্ধ থেকে ‘বের হওয়ার পথ’ খুঁজছেন। কিন্তু এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তবে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের বাস্তবতা যে ভিন্ন তার অনেকটাই স্পষ্ট—ট্রাম্পের বারবার লক্ষ্য বদলানো ও অস্পষ্ট বার্তায়।
লক্ষ্য বদলাচ্ছে
শুরুর দিকে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, নৌবাহিনী ও সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করছে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুদ্ধবিরতিতে তার কোনো আগ্রহ নেই। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি আবার জানান, যুক্তরাষ্ট্র তাদের লক্ষ্য অর্জনের কাছাকাছি এবং সামরিক তৎপরতা কমানোর কথা ভাবছে।
তবে, তার সর্বশেষ লক্ষ্য তালিকায় শুরুর দিকের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখন আর নেই। যেমন—ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে পরাজিত করার কথা তিনি আর উল্লেখ করেননি। ইরানের জনগণের উদ্দেশেও আগের মতো কোনো বার্তা দেননি।
পারমাণবিক ইস্যুতেও অবস্থান কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে। আগে তিনি ইরানকে তাদের সব পারমাণবিক উপাদান সরিয়ে নিতে বলেছিলেন।
এখন তার লক্ষ্য—ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক সক্ষমতার কাছাকাছি যেতে না পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র যেন দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
মিত্রদের ওপর নতুন চাপ
শুরুর দিকে ইরানের সঙ্গে পরমাণু ইস্যুতে আলোচনার সময় থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে মিত্রদের খুব একটা পাত্তা দেননি ট্রাম্প। এমনকি যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তের সময়ও তাদের মতামত জানতে চাননি।
কিন্তু তিন সপ্তাহ পর এসে চাপের মুখে মিত্রদের ওপর দায়িত্ব চাপানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালী রক্ষার দায়িত্ব অন্যান্য দেশকে নিতে হবে বলে তিনি জানান।
এ প্রসঙ্গে গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সাবেক কূটনীতিক রিচার্ড এন হাস সামাজিকমাধ্যমে লিখেছেন, ‘এটিকে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য ট্রাম্পের নতুন নীতি হিসেবে ভাবতে পারেন…আমরা এটি ভেঙেছি, কিন্তু এখন এর দায়ভার আপনাদের।’
তার এ মন্তব্যে বোঝানো হয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি তৈরি করলেও, এর দায় এখন অন্যদের ওপর চাপানো হচ্ছে।
প্রত্যাশা ও বাস্তবতা
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই ট্রাম্প আশা করেছিলেন ইরান আত্মসমর্পণ করবে। ৬ মার্চ তার ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবিতে সেই প্রত্যাশা স্পষ্ট ছিল।
ইরান বিষয়ে অভিজ্ঞ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউরোপীয় কূটনীতিক নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘দেশটির (ইরানের) ভেতরে একাধিক ক্ষমতার কেন্দ্র, প্রবল জাতীয়তা বোধ এবং দীর্ঘ ঐতিহাসিক স্থিতিশীলতার কারণে এমন দাবি বাস্তবসম্মত ছিল না।’
পরবর্তীতে এই দাবিও ট্রাম্পের লক্ষ্য তালিকা থেকে বাদ পড়ে। হোয়াইট হাউস জানায়, ইরানের আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ নয়—বরং কখন তারা কার্যত পরাজিত হয়েছে, তা ট্রাম্প নিজেই নির্ধারণ করবেন।
এই যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে—প্রথমত জ্বালানি সংকট। যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে, তেলের দাম বাড়ছে।
দ্বিতীয়ত, মিত্রদের প্রয়োজনীয়তা। শুরুর দিকে ট্রাম্প ভাবেননি যে মিত্রদের প্রয়োজন হবে। কিন্তু হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দীর্ঘমেয়াদি কাজ, যা একা করা কঠিন।
তৃতীয়ত, ইরানের শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা ও বিদ্রোহের অভাব।
যুদ্ধের প্রথম দিনই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিসহ শীর্ষ নেতাদের বড় একটি অংশ নিহত হলে শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশা করেছিলেন ট্রাম্প। একইসঙ্গে ভেবেছিলেন, ইরানের বিদ্রোহী জনতা রাস্তায় নেমে এসে সরকার উৎখাত করবে।
কিন্তু বাস্তবে এর কোনো কিছুই দেখা যায়নি।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট তখন বলেছিলেন, ‘আমরা সব স্তরেই বিচ্ছিন্ন হওয়ার লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি।’
তবে মার্কিন ও ইউরোপীয় গোয়েন্দারা এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাননি।
সহজ যুদ্ধ নয় ইরান
ভেনেজুয়েলা থেকে নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে তুলে নিয়ে দ্রুত সাফল্য পাওয়ায় ট্রাম্প ভেবেছিলেন, ইরানেও একই ফল মিলবে।
কিন্তু ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষের দেশ ইরানের দীর্ঘ ইতিহাস ও শক্তিশালী রাষ্ট্র কাঠামোর কারণে তারা প্রকৃতিপক্ষে সহজে ভেঙে পড়ার নয়।
সামরিক ইতিহাসবিদরা মনে করছেন, এই সংঘাত দীর্ঘদিন বিশ্লেষণের বিষয় হয়ে থাকবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প এ যুদ্ধকে ‘স্বল্পমেয়াদি অভিযান’ হিসেবে দেখাতে চাইলেও বাস্তবতা ভিন্ন। এই সংঘাতের শেষ কোথায়, তার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত এখনো নেই।