মুক্তিযুদ্ধে আমার মায়ের চিঠি

Date:

অর্ধশতকের চেয়েও আরও পাঁচ বছর বেশি সময় অতিবাহিত হতে চলেছে আমাদের জীবনে একাত্তর এসেছিল। অথচ মনে হয়, এই তো সেদিন…। কিন্তু, কেটে গেছে অনেকগুলো বছর।

৭ মার্চের ভাষণ, ২৫ মার্চের কালরাত, ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা। ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম গণহত্যার শিকার বাংলাদেশের মানুষ মাত্রই।

সেই সময় দিন যেন কাটতে চাইতো না। সকাল হলে দিন কেমন যাবে এই ভাবনা, সন্ধ্যায় ভয়াল রাত্রির শঙ্কা। চতুর্দিকে শোকার্ত মানুষ, ভীত অবয়ব। রাত থেকে ভোর পর্যন্ত ভয়ার্ত কণ্ঠে কোরআন তেলাওয়াতের শব্দ।

একদিকে কোনো মতে পাক হানাদার বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া চেষ্টা, বাড়ি-ঘর ছেড়ে আশ্রয় খুঁজে বেড়ানো। অন্যদিকে দেশকে হানাদার বাহিনীর কবল মুক্ত করার জন্য সংগঠিত হওয়া, মুক্তিবাহিনীকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা। সেই কাজে সর্বদা ঝুঁকির মুখে পড়া।

সেই প্রেক্ষাপটে দেশ ছাড়তে বাধ্য হলাম। মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেওয়ার প্রত্যয়ে ১৬ জুন সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের ত্রিপুরার সোনামুড়ায় পৌঁছলাম। সেনাবাহিনীর ডাক্তার ক্যাপ্টেন আখতার প্রায় একা হাতে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছিলেন। পূর্ব পরিচয়ের কারণে আমরা দুই বোন আখতার ভাইয়ের সঙ্গে কাজে লেগে গেলাম।

কিন্তু সেখানে থাকতে হলে সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন। সেটা নিতে হবে আগরতলায় বাংলাদেশের দপ্তর থেকে। আখতার ভাই আমাদের  দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে নিয়ে গেলেন। তখন দায়িত্বে ছিলেন এইচ  টি ইমাম। আমাদের নাম মুক্তিবাহিনীর খাতায় নথিভুক্ত হলো, আমাদের থাকা ও রেশনের ব্যবস্থা হলো।

তার আগ পর্যন্ত আমরা সোনামুড়া বন বিভাগের দাক্ষিণ্যে একটা ঘর পেয়েছিলাম, আর আখতার ভাইয়ের খাবার ভাগ করে খাচ্ছিলাম।

২০ জুন। আমাদের মা সুফিয়া কামালের জন্মদিন। পরিবারে খুব ঘরোয়াভাবে, কিন্তু অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে প্রত্যেকের জন্মদিন পালন করা হতো। একে তো দেশের এমন অবস্থা, তার ওপর জন্মদিনে মায়ের কাছ ছাড়া, যোগাযোগ ছাড়া। মনটা খুব খারাপ ছিল।

ভাগ্যক্রমে জানলাম এক মুক্তিযোদ্ধা বন্ধু, খুব সম্ভবত জিয়া বা ফতেহ্ আলী দেশে যাচ্ছে। তখন আমাদের কাছে কোনোই সম্বল নেই। মাকে দু-ছত্র লিখে আমাদের সংবাদ দিলাম আর জন্মদিনের আদর জানালাম।

তার উত্তরে মা আমাদের এই চিঠিটা পাঠিয়েছিলেন। একাত্তরের অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। এই চিঠিটা কেমন করে খুঁজে পেলাম বহুদিন পরে।

মা গত হয়েছেন ২৬ বছর আগে। তার এই চিঠি এখনো মাথার উপরে দীর্ঘ ছায়ার মতো ‌আগলে রেখেছে আমাদের, আর তার সব মুক্তিকামী সন্তানদের।

ফুটনোট: চিঠিতে ‘ডক’ হলেন তদানীন্তন ক্যাপ্টেন আখতার আহমেদ—পরে মেজর হয়ে অবসর নেন। ‘ডকি’ হলেন আখতার ভাইয়ের স্ত্রী খুকু আহমেদ—যিনি কিছুদিন পরে আমাদের সঙ্গে নার্সিংয়ের কাজে যুক্ত হয়েছিলেন।

 

সুলতানা কামাল একজন মানবাধিকার কর্মী এবং মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

Popular

More like this
Related

বান্দরবানে হোটেল-রিসোর্টে ঠাঁই নেই, স্পটগুলোতে পর্যটকের উপচে পড়া ভিড়

পবিত্র ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটিতে পার্বত্য জেলা বান্দরবান যেন...

চার তারা: জার্মানির বিশ্বজয়ের গল্প

ফিফা বিশ্বকাপে শিরোপার সংখ্যার বিচারে ব্রাজিলের ঠিক পরেই অবস্থান...

‎লালমনিরহাটে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় বাসের ধাক্কা, আহত ৮

লালমনিরহাট শহরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় বাসের ধাক্কায় অন্তত আটজন আহত...

কুড়িগ্রামে ছেলের শাবলের আঘাতে বাবা নিহত

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে পারিবারিক কলহের ঘটনায় ছেলের আঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন...