প্রতি একরে খরচ মাত্র ৪৮০ টাকা, সার–কীটনাশকেও সাশ্রয়

Date:

বোরোসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদনে কৃষকের বড় একটি খরচ যায় সেচের পেছনে। শ্যালো ইঞ্জিন বা বৈদ্যুতিক পাম্পে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে প্রতি একর জমিতে সেচ দিতেই প্রায় ১৫ হাজার টাকা চলে যায়। কিন্তু তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতায় নদীর পানি ব্যবহার করে একই পরিমাণ জমিতে সেচ দিতে কৃষকের খরচ হচ্ছে মাত্র ৪৮০ টাকা।

শুধু সেচের পানিই নয়, নদীর পানি ব্যবহারে কৃষকের সার ও কীটনাশকের খরচও অনেকাংশে কমে গেছে। কারণ, খালের মাধ্যমে আসা নদীর পানির সঙ্গে প্রচুর পলিমাটি থাকে। এই মাটি প্রাকৃতিকভাবেই জমির উর্বরতা বাড়ায়। নামমাত্র খরচে সেচ এবং সার-কীটনাশকের ব্যয় কমার কারণে এই প্রকল্প উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। বর্তমানে ছয় জেলার প্রায় সোয়া লাখ কৃষক এই সুবিধা পাচ্ছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে খরচের এই বড় ব্যবধানের বিষয়টি জানা যায়। রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার সাধুটারী গ্রামের কৃষক ধরেন চন্দ্র সেন (৬৫) ২৪ বছর ধরে তিস্তা সেচ প্রকল্পের পানি ব্যবহার করছেন।

তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘তিস্তার পানিতে চাষ করলে উৎপাদন খরচ অনেক কম হয়। খুব কম টাকায় পানি পাওয়া যায়। পলি মাটি থাকায় সার ও কীটনাশকও তেমন লাগে না।’তিস্তা

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার খলেয়া গ্রামের কৃষক আবদুল কাদের (৭০) বলেন, ‘প্রকল্প চালুর আগে এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির তীব্র সংকট ছিল। এখন তিস্তার পানি ব্যবহার করে আমরা কম খরচে বাম্পার ফলন পাচ্ছি। এই পানিতে চাষ করলে উৎপাদন খরচ প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কমে যায়, আর ফলন বাড়ে ২০ শতাংশ পর্যন্ত। আমি প্রতিবছর দুই একর জমিতে সেচসুবিধা নিচ্ছি, এ জন্য বছরে সব মিলিয়ে খরচ হচ্ছে মাত্র ৯৬০ টাকা।’

পাউবো সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতায় রংপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলার ১২টি উপজেলার প্রায় ৫৭ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। গত বছর এই পরিমাণ ছিল ৫৫ হাজার হেক্টর।

নীলফামারীর ডালিয়ায় অবস্থিত এই সেচ প্রকল্পের আওতায় মোট ৭৬৬ কিলোমিটার সেচখাল রয়েছে। বর্তমানে এর মধ্যে ৪৯০ কিলোমিটার সচল। অবশিষ্ট ২৭৬ কিলোমিটার খালের সংস্কারকাজ চলছে। এটি শেষ হলে আরও ৩২ হাজার হেক্টর জমি এই সাশ্রয়ী সেচসুবিধার আওতায় আসবে এবং নতুন করে যুক্ত হবেন আরও প্রায় ৬০ হাজার কৃষক।

রংপুর পাউবোর উপসম্প্রসারণ কর্মকর্তা অমলেশ চন্দ্র রায় বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী নামমাত্র খরচে পানি পাওয়ায় এই প্রকল্প উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য এক বড় আশীর্বাদ। নদীর পানিতে আবাদ করলে হেক্টরপ্রতি প্রায় এক টন পর্যন্ত ফসল বেশি উৎপাদন হয়।

ডালিয়া পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান, চলতি শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা ব্যারাজে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কিউসেক পানি পাওয়া যাচ্ছে, যা দিয়ে প্রায় এক লাখ হেক্টর জমিতে সেচসুবিধা দেওয়া সম্ভব।

পাউবোর রংপুর বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং তিস্তা সেচ খাল সংস্কার প্রকল্পের পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে বাকি খালের সংস্কারকাজ শেষ হলে সব কটি খালের মাধ্যমে নিয়মিত পানি সরবরাহ করা যাবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘তিস্তা সেচ প্রকল্পের কারণে প্রচলিত ভূগর্ভস্থ পানির ওপর কৃষকদের নির্ভরতা কমেছে। ভূগর্ভস্থ সেচের তুলনায় নদীর পানির ব্যবহার অত্যন্ত সাশ্রয়ী হওয়ায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। কৃষির বৃহত্তর স্বার্থে বাকি সেচখালগুলো দ্রুত সংস্কার করে চালু করা প্রয়োজন।’

Popular

More like this
Related

লিগ কাপ ফাইনাল ম্যান সিটির ‘সামর্থ্য প্রমাণের বড় পরীক্ষা’, বলছেন গার্দিওলা

গার্দিওলা মনে করেন, লিগ কাপের ফাইনালে আর্সেনালের বিপক্ষে লড়াইটি...

ফেনীতে যানবাহনের জটলায় বাসের ধাক্কা, নিহত ৩

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনীর রামপুর এলাকায় যানবাহনের জটলায় দ্রুতগতির বাসের...

কুমিল্লায় নিহত ১২ জনের পরিচয় মিলেছে

কুমিল্লায় লেভেল ক্রসিংইয়ে উঠে পড়া বাসে ট্রেনের ধাক্কায় নিহত...

হলে হলে ছুটছেন তারকারা

অনেক দিন ধরেই ঈদে বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি পাওয়ার...