মধ্যপ্রাচ্যে বিষণ্ন ঈদ

Date:

লেবাননের আজিজা আহমাদ এবার ঈদের জন্য বিশেষ কিছুই ভাবেননি। নেই কোনো পারিবারিক ভোজের আয়োজন, শিশুদের জন্য কেনা হয়নি নতুন কোনো পোশাক। 

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে যুদ্ধের দামামা আর বাজারে পণ্যের আকাশচুম্বী দামের কাছে আজিজার ঈদের আনন্দ আজ ফিকে। বিষণ্ণ মনে তিনি বললেন, ‘এবারের ঈদুল ফিতর উদযাপনের কিছু নেই।’

বৈরুত থেকে দুবাই, মানামা থেকে জেরুজালেম—মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধে বিপর্যস্ত লক্ষ লক্ষ ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে এবারের রমজান শেষ হয়েছে এক তিক্ত ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের বিষণ্ন ঈদের গল্প।

৪৯ বছর বয়সী আজিজা তার স্বামী ও তিন সন্তানকে নিয়ে যে জরাজীর্ণ অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন, সেখানে এখন তিল ধারণের জায়গা নেই। যুদ্ধবিদ্ধস্ত আরও ১২ জন আত্মীয় সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন।

আজিজা একরাশ হতাশা নিয়ে বলেন, ‘হয়তো বিত্তবানদের কাছে ঈদ আজও রঙিন, কিন্তু আমাদের ঘরে ঈদের কোনো আনন্দ নেই। পকেটে টাকা নেই, আর যারা ঘর হারিয়ে আমাদের এখানে এসেছেন, তাদের ফেরার কোনো পথ নেই।

লেবানন আগে থেকেই ধুঁকছিল চরম অর্থনৈতিক সংকটে, যুদ্ধ সেই ক্ষতকে আরও গভীর করেছে। জীবন বাঁচানোর তাগিদে আজিজা তার ঘরের সামনে একটি ছোট পিঠার দোকান দিয়েছেন, যাতে গাড়ি ধোয়ার কাজ করা তার স্বামীর যৎসামান্য আয়ে কিছুটা সাহায্য হয়। 

আজিজা বলেন, ‘এখান থেকে একটি দানাও আমরা মুখে তুলব না, প্রতিটি পিঠা বিক্রির জন্য।’ 

আজিজার পরিবারের সবাই মিলে ময়দা মাখানো আর পেস্তা গুঁড়ো করার কাজে ব্যস্ত। তার ১১ বছর বয়সী মেয়ে ইয়াসমিনকেও দেখা গেল মাথায় বড় একটি গোলাপি ফিতা পরে মায়ের কাজে সাহায্য করতে। সে বলল, ‘আমরা এবার বাইরে খেলতে যাব না। সবাই খুব আতঙ্কে আছে। ইসরায়েল হামলা চালাচ্ছে, তাই আমরা ঘরেই থাকব।’

উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতেও বোমাবর্ষণের আতঙ্ক উৎসবের আমেজকে ফিকে করে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ মনে করা এই দেশগুলো এখন তেহরানের পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। 

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ৩০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। কুয়েতে বড় জমায়েত এড়াতে ঈদের সময় নাটক, কনসার্ট ও বিয়ের অনুষ্ঠানে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। 

কুয়েতে কর্মরত মিশরীয় নাগরিক ৪১ বছর বয়সী আলী ইব্রাহিম জানান, অন্য বছরের তুলনায় এবার ঈদের কেনাকাটা অনেক কম। কাতারও যুদ্ধের শুরু থেকেই সব ধরনের জনসমাবেশ স্থগিত রেখেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিরাপত্তার কারণে এবার খোলা ময়দানে ঈদের জামাত নিষিদ্ধ করা হয়েছে, নামাজ হবে মসজিদের ভেতরে। 

ভারত থেকে এসে দুবাইয়ে তিন দশক ধরে বসবাস করছেন সমাজকর্মী জুহি ইয়াসমিন খান। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে জাঁকজমকপূর্ণ ঈদ উদযাপন মানায় না। আমরা অনেকেই এবার শুধু পরিবারের ঘনিষ্ঠদের নিয়ে ঘরোয়াভাবেই ঈদ করছি।

অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের কাছে এবারের রমজান অপূর্ণতায় কেটে গেছে। যুদ্ধের কারণে ইসরায়েল আল-আকসা মসজিদসহ অন্যান্য পবিত্র স্থানগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। ইহাব নামে এক যুবক বলেন, আমাদের প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে, কারণ আমরা আল-আকসায় যেতে পারছি না।

প্রতি বছর ঈদের সময় জেরুজালেমের রাস্তায় যে আলোকসজ্জা আর লণ্ঠন দেখা যেত, এবার তা অনুপস্থিত। পুরোনো শহরের সরু গলিগুলো এখন জনশূন্য।

বাহরাইনে এখন দিনে কয়েকবার মিসাইল বা ড্রোন হামলার সতর্কবার্তা হিসেবে সাইরেন বাজছে। এর মধ্যেই রাজধানী মানামার একটি পার্লারে ছোট্ট সারা অপেক্ষা করছে হাতে মেহেদি পরার জন্য। 

সারার মা মারিয়ম আবদুল্লাহ বলেন, ‘যুদ্ধ আমাদের থামাতে পারবে না। এই সময়টুকু ঠিকই কেটে যাবে।’

হেসা আহমেদ নামে অন্য এক নারীও ঈদের কেনাকাটা করেছেন। তিনি মনে করেন, প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়াটা জরুরি।

 

Popular

More like this
Related

এত বিষণ্ণ ঈদ আগে কখনো আসেনি ছাতিয়ানপাড়া গ্রামে

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক বাজার থেকে তিন কিলোমিটার দূরে...

পাঁচটি তারা: ব্রাজিলের বিশ্বজয়ের গল্প

বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে ব্রাজিলের চেয়ে সফল আর কোনো নাম...

২৫ বছর পর প্রাণ ফিরছে মিন্টো রোডের ২৯ নম্বর ভবনে

দীর্ঘ ২৫ বছর পর আবারও প্রাণ ফিরছে রাজধানীর মিন্টো...

ঠাকুরগাঁওয়ের গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে ফিলিং স্টেশনগুলো

জ্বালানির স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় ঠাকুরগাঁওয়ের ফিলিং...