ঈদে ঘরমুখো মানুষের ঢল নামলেও জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আন্তঃজেলা বাস চলাচলে। পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়সূচি বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে বাস অপারেটরগুলো।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনালে বিভিন্ন অপারেটরের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জ্বালানি সংগ্রহে বিলম্বের কারণে অনেককেই ট্রিপ বাতিল করতে বা সময়সূচি পরিবর্তন করতে হচ্ছে।
উত্তরবঙ্গগামী পরিবহন প্রতিষ্ঠান দেশ ট্রাভেলস ও ফাহমিতা এক্সপ্রেস জানিয়েছে, ডিজেলের সীমাবদ্ধতার কারণে তারা স্বাভাবিকের তুলনায় কম সংখ্যক বাস পরিচালনা করছে।
দেশ ট্রাভেলসের স্টাফ মো. রমজান বলেন, ‘আমরা প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাব কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছি।’
অন্যদিকে, ফাহমিতা এক্সপ্রেস জানায়, গতকাল তাদের সাতটি বাসের মধ্যে মাত্র দুটি চালানো সম্ভব হয়েছে। রেশনিংয়ের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ হওয়ায় আজ বুধবারও তারা কেবল দুটি বাস চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
‘আমরা সোমবার কোনো বাস চালাতে পারিনি। যাত্রী আছে, কিন্তু ঈদের এই ভরা মৌসুমেও টিকিট বিক্রি কমে গেছে,’ বলেন ফাহমিতা এক্সপ্রেসের প্রতিনিধি অমিত ভৌমিক। তিনি আরও জানান, প্রতিটি ট্রিপের জন্য প্রায় ১২০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হলেও তারা পাচ্ছেন মাত্র ৯০ লিটার।
তিনি বলেন, ‘আমাদের বলা হচ্ছে মহাসড়কের পাশের ফিলিং স্টেশনগুলো থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে। কিন্তু সেগুলোর বেশিরভাগেও জ্বালানি সংকট রয়েছে।’
ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটের ইউনাইটেড এক্সপ্রেসের স্টাফরাও বিলম্বের কথা জানিয়েছেন। তারা বলেন, জ্বালানি সংগ্রহ করতে অনেক সময় লেগে যাওয়ায় বাসের সময়সূচি বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এদিকে যাত্রীদেরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
পেশায় ফার্মাসিস্ট মুজিবুর রহমান গতকাল দুপুর ১২টার একতা পরিবহনের বাসে করে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বগুড়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে মহাখালী বাস টার্মিনালে আসেন। তিনি জানান, তারা দেড় ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছিলেন, কিন্তু বাসটি তখনো পৌঁছায়নি।
গতকাল ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সাত দিনের সরকারি ছুটির শুরুতে রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি দেখা যায়।
এদিন ঢাকার অন্তত ১৬টি ফুয়েল পাম্প ঘুরে দেখা যায়, বিকেলের মধ্যে অন্তত চারটি স্টেশনে অকটেন শেষ হয়ে গিয়েছিল, যার মধ্যে বনশ্রী-ডেমরা রোডের দুটি স্টেশনও ছিল।
তেজগাঁও এলাকায় সাউদার্ন অটোমোবাইলসে বিকেলে অকটেন ফুরিয়ে গিয়েছিল। সেখানে শুধু ডিজেলচালিত যানবাহনের সারি দেখা যায়।
নতুন করে মজুত করতে পারায় সততা অ্যান্ড কোং ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়, যা আগের দিন বন্ধ পাওয়া গিয়েছিল।
মহাখালী এলাকায় ছয় থেকে সাতটি রিফুয়েলিং স্টেশন রয়েছে। বেশিরভাগই খোলা থাকলেও কেবল ক্লিন ফুয়েল ফিলিং স্টেশনের বাইরে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। মহাখালী রেলগেট এলাকায় ইউরেকা এন্টারপ্রাইজে স্বাভাবিক সময়ের মতোই যানবাহনের সারি ছিল।
বিজয় সরণি এলাকার ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে বিশাল সারি ছিল; বিকেলে মোটরসাইকেলের সারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কাছাকাছি পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং প্রাইভেট কারের সারি বিএএফ অফিসার্স মেসের গেট ছাড়িয়ে যায়।
এর আগে সকালে আসাদ গেটের সোনার বাংলা সার্ভিস স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল ১০টার দিকে যানবাহনের সারি এক কিলোমিটার ছাড়িয়ে গেছে। মোটরসাইকেল, কার, মিনিবাস এবং পিকআপ ভ্যান—সবই জ্বালানির জন্য অপেক্ষা করছিল।
তবে ওই স্টেশনের কর্মীরা জানান, গত দুদিনের তুলনায় মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের সারি তুলনামূলকভাবে কম দীর্ঘ ছিল।
সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ওই স্টেশনটিকে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ করতে দেখা যায়।
কাছেই তালুকদার ফিলিং স্টেশনের চিত্র ছিল ভিন্ন। সেখানে মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় সকাল ১০টার কিছু আগে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ সেখানে শতাধিক যানবাহনের সারি দেখা যায়।
ক্যাশিয়ার মো. আজম বলেন, ‘আপাতত আমাদের জ্বালানি শেষ হয়ে গেছে।’ তিনি জানান, নতুন করে মজুত হওয়ার পর দুপুর ২টার দিকে সরবরাহ আবার শুরু হতে পারে।
দুপুর ২টার পর সরবরাহ আবার শুরু হলেও গ্রাহকরা অভিযোগ করেন, তারা চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি পাচ্ছেন না। পাম্প কর্তৃপক্ষ রেশনিং পদ্ধতি অনুসরণ করছিল, যেখানে বাইকের জন্য ৫০০ টাকা এবং ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য ১৫০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছিল না।
পরীবাগের পূর্বাচল ট্রেডার্স নামের আরেকটি পাম্পেও একই চিত্র দেখা যায়, তারাও একই ধরনের রেশনিং পদ্ধতি অনুসরণ করছিল।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত ডিজেলের মজুত ছিল ১ দশমিক ২০ লাখ টন, আর পেট্রোল ও অকটেনের মজুদ ছিল ১৫ হাজার টন করে। এ ছাড়া আরও বড় চালান আসার অপেক্ষায় রয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, ঈদের ভিড় সামনে রেখে বিপিসি জ্বালানি সরবরাহ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং এই মাসের চাহিদা মেটানোর জন্য সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকবে।