মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ ও উত্তেজনার মধ্যেই হঠাৎ করে ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র কিউবা নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, কিউবাকে ‘দখল’ করা তার জন্য অসম্ভব কিছু নয়, বরং এটি হতে পারে ‘একটি সম্মানের বিষয়’।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এই মন্তব্য নিছক আবেগপ্রসূত নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশ, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইরান যুদ্ধ, লাতিন আমেরিকার ক্ষমতার ভারসাম্য এবং বৈশ্বিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
সংকটে কিউবা: ‘দুর্বল রাষ্ট্র’ তত্ত্ব
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত তেল অবরোধে কিউবার জ্বালানি ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। দেশজুড়ে বিদ্যুৎ বিপর্যয়, খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট দেখা দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প কিউবাকে ‘দুর্বল রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, তিনি চাইলে দেশটির সঙ্গে ‘যেকোনো কিছু করতে পারেন।’
বিশ্লেষকদের মতে, একটি অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত রাষ্ট্রকে চাপ দিয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন আনা তুলনামূলক সহজ এবং ওয়াশিংটন ঠিক সেই কৌশলই অনুসরণ করছে।
ইরান যুদ্ধের ছায়া: বহুমাত্রিক চাপের কৌশল
ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক তৎপরতা যখন তীব্র, তখন কিউবাকে লক্ষ্য করে এই ধরনের বক্তব্যকে অনেকেই ‘মাল্টি-ফ্রন্ট স্ট্র্যাটেজি’ হিসেবে দেখছেন।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, একই সময়ে ভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে চাপ সৃষ্টি করে প্রতিপক্ষ শক্তিকে বিভক্ত ও দুর্বল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ইরান—মধ্যপ্রাচ্যে এবং কিউবা—পশ্চিম গোলার্ধে, দুটি ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
‘রেজিম চেঞ্জ’—অঘোষিত কিন্তু স্পষ্ট লক্ষ্য
একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ ক্যানেলকে ক্ষমতা থেকে সরানো যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য।
যুক্তরাষ্ট্র কিউবার সঙ্গে আলোচনায় এমন ইঙ্গিত দিয়েছে যে, বর্তমান নেতৃত্বে পরিবর্তন না এলে সম্পর্কের উন্নতি সম্ভব নয়।
এই প্রেক্ষাপটে ‘দখল’ শব্দটি অনেক বিশ্লেষকের কাছে সরাসরি সামরিক অভিযান নয়, বরং এটি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বা সরকার পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
ভেনেজুয়েলা-পরবর্তী প্রভাব
কিউবার বর্তমান সংকটের পেছনে একটি বড় কারণ হলো ভেনেজুয়েলা থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া। যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত পরিবর্তনের পর কিউবা তার প্রধান জ্বালানি উৎস হারায়।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি তেল অবরোধ দেশটিকে আরও বিপর্যস্ত করে তোলে।
এই প্রেক্ষাপটে কিউবা এখন একদিকে অর্থনৈতিক সংকটে, অন্যদিকে কূটনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলকে আরও কার্যকর করে তুলছে।
রাশিয়ার অবস্থান: উত্তেজনার নতুন মাত্রা
এই সংকটের মধ্যে রাশিয়া কিউবার পাশে দাঁড়িয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে ‘একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে গুরুতর হস্তক্ষেপ’ বলে মন্তব্য করেছে।
রাশিয়া জানিয়েছে, তারা কিউবাকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
শীতল যুদ্ধের ইতিহাস বিবেচনায় এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, কিউবা আবারও যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।
‘ফ্রেন্ডলি টেকওভার’
ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু বক্তব্যে ‘ফ্রেন্ডলি টেকওভার’ বা ‘বন্ধুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ ধারণাও উঠে এসেছে।
এর অর্থ হতে পারে সমঝোতার মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তন, যুক্তরাষ্ট্রপন্থী অর্থনৈতিক কাঠামো অথবা শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর।
তবে কিউবা সরকার এটিকে স্পষ্টভাবে সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও শক্তির প্রদর্শন
ট্রাম্পের এই ধরনের বক্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত করে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ফ্লোরিডার কিউবান-আমেরিকান ভোটারদের কাছে কঠোর কিউবা নীতি জনপ্রিয়। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক সংকটের সময়ে শক্ত অবস্থান প্রদর্শন রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে।
বাস্তবতা: দখল কতটা সম্ভব?
একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র দখল করা শুধু সামরিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি আন্তর্জাতিক আইন, কূটনীতি এবং বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত।
তাই অধিকাংশ বিশ্লেষকের মতে, ট্রাম্পের বক্তব্য মূলত একটি কৌশলগত চাপ সৃষ্টির ভাষা, যার লক্ষ্য হলো আলোচনায় সুবিধা নেওয়া এবং প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা।
একই সুতোয় ইরান ও কিউবা
ইরান যুদ্ধ এবং কিউবা সংকট, দুটি আলাদা ইস্যু হলেও, বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতিতে তারা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত।
ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতে স্পষ্ট একটি ধারা দেখা যাচ্ছে, একাধিক অঞ্চলে একযোগে চাপ সৃষ্টি, প্রতিপক্ষ শক্তিকে কোণঠাসা করা এবং বৈশ্বিক প্রভাব পুনর্গঠন।
কিউবাকে ‘দখল’ করার হুমকি তাই শুধু একটি বক্তব্য নয়, এটি একটি বৃহত্তর কৌশলগত বার্তা, যার প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে লাতিন আমেরিকা পর্যন্ত।
এখন দেখার বিষয়, এই কৌশল শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছায়, নাকি বিশ্বকে আরও বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়।