বাংলাদেশ এক গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা উন্নয়নের মাধ্যমে ২৫ বছরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি ব্যয়ে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করতে পারে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) ‘ইরান উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এশিয়ার নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এই কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়, ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আমদানি-নির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার কারণে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৫১ শতাংশ ও এলএনজির দাম সর্বোচ্চ ৭৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
এই মূল্যবৃদ্ধি জ্বালানি আমদানি-নির্ভর এশীয় দেশগুলোর অর্থনীতির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে, যার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে।
আইইইএফএ জানিয়েছে, সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আরও দুর্বল হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এমন অস্থির সময়ে জীবাশ্মের বদলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে রূপান্তরিত হওয়া আর ঐচ্ছিক নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেশের এলএনজি সরবরাহের একটি বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে আসে। তবে সরবরাহ ঘাটতির সময় স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি কিনতে হয় বাংলাদেশের।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ সম্প্রতি স্পট মার্কেট থেকে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) ২৮ দশমিক ২৮ ডলার দরে এলএনজির একটি চালান কিনেছে, যা গত মাসে রেকর্ড করা জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) বেঞ্চমার্ক মূল্যের প্রায় তিন গুণ।
আইইইএফএ বলেছে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য আমদানিকৃত এলএনজির ওপর এই অতিনির্ভরতা ব্যাপক আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, দেশের গ্যাসের সীমিত মজুত ও জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতার কারণে বাংলাদেশ বিশেষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল। সে সময় বাংলাদেশ এলএনজি ব্যবহার কমালেও বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে দেশের মোট আমদানি ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।
প্রতিবেদনটি আরও সতর্ক করেছে যে, বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বাড়লে তা একটি স্বয়ংক্রিয় অর্থনৈতিক চক্র তৈরি করতে পারে। বিশ্ব বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে জ্বালানি আমদানির খরচ আরও বেড়ে যায়।
এতে মূল্যস্ফীতি, ডলারে পরিচালিত বাজার ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীদের উৎপাদন ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়তে পারে।
এই চাপ মোকাবিলায় এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সরকার জ্বালানি ভর্তুকি, খুচরা মূল্যসীমা নির্ধারণ ও কঠোর মুদ্রানীতির মতো স্বল্পমেয়াদি নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে এসব পদক্ষেপ কেবল সাময়িক স্বস্তি দিতে সক্ষম বলে সতর্ক করেছে আইইইএফএ। সেই সঙ্গে এটি লম্বা সময় ধরে চালু থাকলে সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এশিয়ার বেশকিছু দেশ বাড়তি জ্বালানি ব্যয় মোকাবিলায় ইতোমধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে। থাইল্যান্ড ডিজেলের দাম সীমিত করার পাশাপাশি ভোক্তাদের চাপ কমাতে জ্বালানি কর কমানোর বিষয়ে বিবেচনা করছে।
চীন, থাইল্যান্ড ও ভারতের পরিশোধনাগারগুলো দেশীয় সরবরাহ নিশ্চিত করতে সাময়িকভাবে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের রপ্তানি সীমিত করেছে।
ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও সতর্ক করেছে যে, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি হলে তারা মুদ্রানীতি কঠোর করতে পারে।
প্রতিবেদনটি জোর দিয়ে বলেছে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশগুলোকে ভূরাজনৈতিক ধাক্কা ও বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার মুখে ফেলছে। আইইইএফএর মতে, বাংলাদেশে এলএনজি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ইতোমধ্যেই সৌর বা বায়ু শক্তি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের তুলনায় অন্তত তিন থেকে চার গুণ বেশি ব্যয়বহুল।
খরচ সাশ্রয়ের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াবে। সেই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যের অপ্রত্যাশিত ওঠানামার প্রভাব থেকে অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেবে।
বর্তমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কতদিন ধরে চলবে তা অনিশ্চিত। এমন পরিস্থিতিতে কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী সতর্ক করেছেন, দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতায় বৈশ্বিক তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে, যা বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করবে।
প্রতিবেদনের শেষাংশে আইইইএফএ বলেছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু পরিবেশগত লক্ষ্য নয়, বরং একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার। সৌর, বায়ু ও জ্বালানি সঞ্চয় প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ালে বাংলাদেশ বৈশ্বিক জ্বালানি ধাক্কার ঝুঁকি কমাতে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে পারবে।
প্রতিবেদনটি আরও বলেছে, ‘ক্রমবর্ধমান অনিশ্চিত ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেসব দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তর ঘটাতে পারবে, তারা ভবিষ্যতের জ্বালানি সংকট থেকে নিজেদের অর্থনীতিকে আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হবে।’