ওয়াশিংটন এক নতুন বাণিজ্য ঝড় তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেই ঝড় যে পথ দিয়ে যাবে সেখানে রয়েছে বাংলাদেশও।
গত ১১ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র ১৬টি দেশের ওপর ব্যাপক তদন্ত শুরু করেছে। এর মধ্যে শিল্পশক্তিধর চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে শুরু করে বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়ার মতো উন্নয়নশীল রপ্তানিকারক দেশও রয়েছে।
আনুষ্ঠানিক অভিযোগ কী? এসব দেশ নাকি কৃত্রিমভাবে নিজেদের শিল্পকে টিকিয়ে রাখছে এবং ‘স্ট্রাকচারাল ওভারক্যাপাসিটি’ বা প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি পণ্য উৎপাদন করছে, যা আমেরিকান কারখানাগুলোর ক্ষতি করছে।
যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ করেই কেন বাংলাদেশের রপ্তানি ভর্তুকি, এমনকি সিমেন্ট কারখানাকেও লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে? সেটা বুঝতে হলে আমাদের তাকাতে হবে ক্যালেন্ডারের দিকে।
হোয়াইট হাউস পৃথিবীর প্রতিটি দেশের ওপর যে শাস্তিমূলক ‘ট্রাম্প-শুল্ক’ আরোপ করছিল, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট সেই ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছে। এরপর ট্রাম্প প্রশাসন অস্থায়ী এক ব্যবস্থার আশ্রয় নিয়ে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ১০ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করেছে। এই ব্যবস্থার মেয়াদ শেষ হবে ২৭ জুলাই। এ কারণেই মার্কিন সরকার ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১ নামে পরিচিত পুরোনো একটি আইনি অস্ত্রকে আবার সক্রিয় করেছে।
অত্যন্ত শক্তিশালী এই আইন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে ‘অন্যায্য’ বাণিজ্যচর্চার অভিযোগে অন্য দেশগুলোকে শাস্তি দেওয়ার ব্যাপক ক্ষমতা দিয়েছে। এমনকি এর জন্য কংগ্রেস বা আদালতের অনুমোদন নেওয়ারও প্রয়োজন হয় না।
হিনরিখ ফাউন্ডেশনের ট্রেড পলিসি প্রধান ড. ডেবোরাহ এলমস ব্যাখ্যা করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এই তদন্ত চালাবে খুব সীমিত সময়ের মধ্যে। ১২ মার্চ প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক মন্তব্যে তিনি লিখেছেন, ‘ইউএসটিআর-এর লক্ষ্য হলো জুলাইয়ের মধ্যে এই (মেয়াদ শেষ হওয়া) শুল্কগুলোর পরিবর্তে নতুন ব্যবস্থা চালু করা।’
এত তাড়াহুড়োর কারণে যুক্তরাষ্ট্র সরকার কার্যত সব ধরনের অভিযোগই তুলছে, যাতে যে দেশের ক্ষেত্রে যে অভিযোগ প্রযোজ্য হয় সেই দেশের ওপর সেটাই চাপিয়ে দেওয়া যায়। মূলত শুধু নতুন কর আরোপের যুক্তি দাঁড় করানোর জন্যই এই ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ আনা হচ্ছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেকশন ৩০১ ব্যবহারের ধরন ওয়াশিংটনের ক্ষেত্রে পরিবর্তিত হয়েছে। ১৯৯৫ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) গঠনের পর বহু বছর ধরে সেকশন ৩০১ মূলত ছিল একটি প্রশাসনিক প্রাথমিক ধাপ। যুক্তরাষ্ট্র সরকার সাধারণত এই আইন ব্যবহার করত আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য বিরোধ আন্তর্জাতিক ডব্লিউটিও আদালতে নিয়ে যাওয়ার আগে প্রমাণ সংগ্রহের জন্য।
সেই যুগ শেষ হয়ে যায় ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদকালে। ওয়াশিংটন ডব্লিউটিওর অনুমতি চাওয়া বন্ধ করে দেয় এবং সেকশন ৩০১-কে একতরফা শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত করে।
এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হলো ২০১৮ সালের বাণিজ্য যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আদালতকে পাশ কাটিয়ে মেধাস্বত্ব চুরির অভিযোগে ৩৭০ বিলিয়ন ডলারের চীনা পণ্যের ওপর সাড়ে ৭ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করে। উড়োজাহাজে ভর্তুকি নিয়ে বিরোধের জেরে ২০২০ সালে ইউরোপীয় পণ্যের ওপরও অল্প সময়ের জন্য এই আইনের মাধ্যমে কর আরোপ করা হয়েছিল।
বাইডেন প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পরও এই অস্ত্র তুলে রাখা হয়নি। ২০২৪ সালের মে মাসে আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনার পর বাইডেন কেবল ট্রাম্প আমলের চীনা শুল্কগুলো বজায়ই রাখেননি, বরং কিছু ক্ষেত্রে আরও বাড়িয়েছেন। যেমন: চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর কর বাড়ানো হয়েছে।
এখন ১৬টি ভিন্নধর্মী অর্থনীতিকে একসঙ্গে টেনে, বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ ও উন্নয়নশীল গার্মেন্টসনির্ভর অর্থনীতিকে চীন, জার্মানি ও ভারতের মতো দেশের সঙ্গে একই কাতারে ফেলে যুক্তরাষ্ট্র অতীতের সব নজির ভেঙে ফেলছে। ওয়াশিংটন এখন আর নির্দিষ্ট বাণিজ্য লঙ্ঘন সংশোধনের জন্য সেকশন ৩০১ ব্যবহার করছে না, বরং সুপ্রিম কোর্টের আদেশে বন্ধ হওয়া শুল্ক আয়ের বিকল্প খুঁজতে তড়িঘড়ি করে ব্যবহারযোগ্য এক ব্যাপক অস্ত্র বানিয়েছে এটাকে।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমেরিকান অ্যাপারেল অ্যান্ড ফুটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি স্টিফেন লামার বলেছেন, প্রস্তাবিত এই শুল্কে তার গ্রুপ নিরুৎসাহিত এবং প্রশাসনের উচিত এই শুল্ক আরোপের গতি কমিয়ে কংগ্রেসসহ অন্যান্য অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করা। তিনি এই প্রক্রিয়াকে তুলনা করেছেন ‘ভাঙা কাঁচ জোড়া লাগানোর চেষ্টা’র সঙ্গে।
তিনি বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছি সুপ্রিম কোর্টের আদেশে অবৈধ হয়ে যাওয়া শুল্কহারগুলো আবারও আরোপের চেষ্টা করতেই প্রশাসন এই তাড়াহুড়ো করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রচেষ্টায় ক্রমশ মনে হচ্ছে, কোনো উত্তরের খোঁজে তদন্ত হচ্ছে না, বরং আগেই ঠিক করে রাখা উত্তরের সঙ্গে মেলানোর জন্যই তদন্ত করা হচ্ছে।’
সম্প্রতি বাংলাদেশের কিছু বিশ্লেষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই হুমকিকে গুরুত্বহীন হিসেবে উল্লেখ করে বিষয়টিকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। তাদের যুক্তি হলো, চীন ও ভারতের মতো আরও ১৫টি দেশের সঙ্গে একই তালিকায় থাকায় আমরা ভিড়ের মধ্যে নিরাপদে আছি। তাই আতঙ্কিত হওয়ার বা অস্থির হওয়ার কিছু নেই।
এই মানসিকতাটাই বিপজ্জনক।
কেননা সহজভাবে বললে, সেকশন ৩০১ কোনো সমষ্টিগত শাস্তির ব্যবস্থা নয়। এই আইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি বাংলাদেশের রপ্তানিপণ্যের ওপর উচ্চশুল্ক আরোপ করতে পারবে।
ড. এলমস সতর্ক করেছেন, বর্তমান মার্কিন প্রশাসন ‘প্রথমে প্রতিশোধ নিতে এবং পরে আলোচনা করতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে’ এবং তারা যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে সেটা ‘দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।’
কাজেই বাংলাদেশ যখন এলডিসি বা স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা হারাতে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র যদি বাংলাদেশের পোশাকের ওপর নতুন কর আরোপ করে, তাহলে সেটা কারখানার মুনাফা ও লাখো কর্মসংস্থানের জন্য মারাত্মক আঘাত হতে পারে।
যেহেতু এটি তড়িঘড়ি করে নেওয়া একটি রাজনৈতিক উদ্যোগ, তাই বাংলাদেশকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর ক্ষেত্রে মার্কিন সরকারের যুক্তিগুলো অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক। তারা অভিযোগ করছে, বাংলাদেশ নাকি অতিরিক্ত পণ্য উৎপাদন করছে এবং সরকারি নগদ প্রণোদনা ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে সস্তা পণ্য ঢালছে।
বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আনা এই অভিযোগগুলো কেন অযৌক্তিক?
১. অর্ডারভিত্তিক তৈরি পণ্যে ‘অতিরিক্ত উৎপাদন’ সম্ভব নয়
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে এমনভাবে দেখছে, যেন এটি চীনের কোনো ইস্পাত কারখানা, যারা বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ করার জন্য লাগাতার উৎপাদন করছে। কিন্তু পোশাকশিল্প এভাবে কাজ করে না। এটি পুরোপুরি অর্ডারভিত্তিক। টার্গেট বা ওয়ালমার্টের মতো কোনো মার্কিন ব্র্যান্ড স্পষ্টভাবে ওয়ার্ক অর্ডার না দিলে ঢাকার কোনো কারখানা হাজারটা শার্ট তৈরি করে না। আমেরিকান কোম্পানিগুলো যেসব পণ্যের অর্ডার দেয়, সেগুলো তৈরি করার জন্য বাংলাদেশকে ‘অতিরিক্ত উৎপাদনের’ অভিযোগে অভিযুক্ত করা যায় না।
২. সিমেন্ট নিয়ে অযৌক্তিক যুক্তি
আনুষ্ঠানিক অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি বাংলাদেশের সিমেন্ট শিল্পে অব্যবহৃত উৎপাদন সক্ষমতাকে অন্যায্য বাণিজ্যের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে। এর থেকে আসলে বোঝা যায় যে ওয়াশিংটন কত কম গবেষণা করেছে।
সিমেন্ট ভারী এবং এর পরিবহন ব্যয়বহুল। বাংলাদেশ মূলত সিমেন্ট উৎপাদন করে নিজস্ব সেতু ও সড়ক নির্মাণের জন্য। এগুলো ক্যালিফোর্নিয়ায় রপ্তানি করে না। কাজেই, ঢাকার সিমেন্ট কারখানাগুলো আমেরিকান শ্রমিকদের জন্য হুমকি—এই দাবি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
৩. বাংলাদেশ নিয়ম মেনেই চলছে
বাংলাদেশের সরকার রপ্তানিকারকদের যে নগদ প্রণোদনা দেয়, সেটা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অসন্তুষ্ট বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু বৈশ্বিক বাণিজ্য নিয়ম অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশগুলো তাদের অর্থনীতি উন্নয়নের জন্য এসব প্রণোদনা আইনগতভাবেই দিতে পারে।
তাছাড়া বাংলাদেশ ২০২৬ সালে এলডিসি মর্যাদা থেকে উত্তরণ ঘটাতে যাচ্ছে। তাই দেশে ইতোমধ্যেই এসব ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমানোর প্রক্রিয়া চলছে। অর্থাৎ ঢাকা যে পুরোপুরি বৈধ একটি কর্মসূচি ইতোমধ্যেই বন্ধ করার পথে রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র মূলত সেই কর্মসূচির জন্যই বাংলাদেশকে শাস্তি দিতে চাইছে।
৫ মে ওয়াশিংটনে জনশুনানি শুরু হবে এবং এপ্রিলের মাঝামাঝি লিখিত জবাব জমা দেওয়ার কঠোর সময়সীমা রয়েছে। তাই ঢাকাকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। কেবল বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনা বা যুক্তরাষ্ট্র অন্যায় করছে—এমন অভিযোগ করলেই কাজ হবে না।
এই বাণিজ্যিক ফাঁদ থেকে বের হতে হলে বাংলাদেশের প্রয়োজন শক্ত তথ্যভিত্তিক যুক্তি এবং সুস্পষ্ট কৌশল:
বাংলাদেশি কূটনীতিকদের উচিত মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে আলোচনা করা এবং সম্ভব হলে বড় মার্কিন পোশাক ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে দ্রুত সমন্বয় করা। সেই নির্বাহীদের বলতে হবে, আপনি যদি বাংলাদেশের ওপর কর আরোপ করেন, তাহলে আমেরিকার কারখানার চাকরি ফিরবে না। বরং এতে আমেরিকান পরিবারগুলোকে তাদের সন্তানদের স্কুলের পোশাকের জন্য আরও বেশি টাকা দিতে বাধ্য করা হবে।
বাংলাদেশের উচিত ‘অর্ডারভিত্তিক উৎপাদন’ বাস্তবতার ওপর জোর দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্রকে নথিপত্র দেখিয়ে প্রমাণ করতে হবে, বন্দর ছেড়ে যাওয়া প্রতিটি পোশাকই কোনো মার্কিন ক্রেতার স্পষ্ট ওয়ার্ক অর্ডারের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে।
রপ্তানিতে নগদ প্রণোদনার বিষয়টি লুকানোর পরিবর্তে বাংলাদেশকে গর্বের সঙ্গে তথ্য তুলে ধরতে হবে যে এগুলো আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সম্পূর্ণ বৈধ এবং বাংলাদেশ কীভাবে ধাপে ধাপে এগুলো বন্ধ করছে তার নির্দিষ্ট সময়সূচিও দেখাতে হবে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য চীন। বাংলাদেশকে ভদ্রভাবে ওয়াশিংটনকে মনে করিয়ে দিতে হবে যে এটি একটি বন্ধুসুলভ উন্নয়নশীল দেশ, যা আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে তাদের সরবরাহ শৃঙ্খল বৈচিত্র্যময় করতে সহায়তা করছে। বাংলাদেশকে শাস্তি দিলে বিশ্ব বাণিজ্য আবারও বেইজিংয়ের দিকেই ঝুঁকে পড়বে।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের আবেগপ্রবণ হওয়া বা নিজেদের ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। তাদের উচিত তথ্যভিত্তিক যুক্তি দিয়ে মার্কিন সরকারের ভুল হিসাবকে খণ্ডন করা।