মরুভূমির ম্যারাডোনা

Date:

১৯৯৪ সালের ২৯ জুন, ওয়াশিংটন ডিসির রবার্ট এফ. কেনেডি মেমোরিয়াল স্টেডিয়ামের আকাশ সেদিন হয়তো একটু বেশিই নীল ছিল, আর রোদ ছিল মরুভূমির তপ্ত বালুর মতো প্রখর। সেই তপ্ত দুপুরে স্টেডিয়ামের ঘাসগুলো হয়তো জানত না, তারা আজ এক যাযাবর রাজপুত্রের পদচিহ্নে ইতিহাস লিখতে যাচ্ছে। সেই প্রখরতাকে সঙ্গী করেই ফুটবল ইতিহাসের পাতায় রচিত হয়েছিল এক অবিশ্বাস্য মহাকাব্য, যার নাম ‘মরুভূমির ম্যারাডোনা’ সাইদ আল-ওয়াইরান।

ঘড়ির কাঁটায় তখন মাত্র পাঁচ মিনিট। সৌদি আরবের রক্ষণভাগ থেকে একটি বল যখন অলস ভঙ্গিতে আল-ওয়াইরানের পায়ে এসে থমকে দাঁড়াল, তখনো গ্যালারিতে উত্তেজনার পারদ চড়েনি। নিজের অর্ধে বলটি নিয়ে যখন আল-ওয়াইরান প্রথম কদম ফেললেন, মনে হচ্ছিল তিনি স্রেফ মাঠের দূরত্ব মাপছেন। কিন্তু সেই কদমগুলো ছিল ঝড়ের পূর্বাভাস।

তিনি দৌড়াতে শুরু করলেন। বলটি তার পায়ের সাথে এমনভাবে লেপ্টে ছিল, যেন কোনো অদৃশ্য মায়াজালে বাধা। মাঝমাঠ পর্যন্ত পৌঁছাতে পৌঁছাতে তিনি বেলজিয়ামের প্রথম দুই প্রহরীকে পরাস্ত করলেন কেবল গতির ছন্দ দিয়ে। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা যখন তাকে আটকানোর জন্য স্লাইড দিচ্ছিলেন, আল-ওয়াইরান তখন কোনো এক অলৌকিক ঘোরে আচ্ছন্ন। তিনি যেন এক তৃষ্ণার্ত হরিণ, যার চোখে কেবল এক ফোঁটা জলের তৃষ্ণা—আর সেই জল ছিল প্রতিপক্ষের জালে বল জড়ানো।

নিজের রক্ষণভাগ থেকে প্রতিপক্ষের জাল পর্যন্ত পৌঁছাতে সময় নিয়েছিলেন মাত্র ১০.৫ সেকেন্ড, আর এই স্বল্প সময়ে তিনি বল পায়ে দৌড়েছিলেন প্রায় ৬৯ মিটার। সেই মহাকাব্যিক দৌড় ছিল স্রেফ ফুটবল নয়, তা ছিল এক দীর্ঘ কবিতার ছন্দপতনহীন আবৃত্তি। চারজন বিশ্বমানের ডিফেন্ডার তাকে ঘিরে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন; আল-ওয়াইরান তাদের মাঝ দিয়ে এমনভাবে বেরিয়ে গেলেন, যেন তিনি কোনো সমান্তরাল মহাবিশ্বের পথিক।

যখন তিনি পেনাল্টি বক্সের মুখে পৌঁছালেন, তখন তার সামনে হিমালয়ের মতো অটল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেই সময়ের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক মিশেল প্রুদোম। ক্লান্তি আর উত্তেজনায় আল-ওয়াইরানের শরীর তখন কাঁপছিল, কিন্তু তার লক্ষ্য ছিল অবিচল। প্রুদোম এগিয়ে এলেন তাকে রুখতে, কিন্তু আল-ওয়াইরান এক অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় বলটি চিপ করে জালে পাঠিয়ে দিলেন। গোলটি করার ঠিক পরমুহূর্তেই তিনি ভারসাম্য হারিয়ে আছড়ে পড়লেন সবুজ গালিচায়। সেই পতন ছিল এক বিজয়ী বীরের ক্লান্তি।

পুরো স্টেডিয়াম তখন বিমূঢ়, যেন এক পলকে তারা ১৯৮৬-র মেক্সিকো সিটিতে ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই ঐশ্বরিক গোলের পুনর্জন্ম দেখল। সেই এক গোলেই সৌদি আরব ১-০ ব্যবধানে জিতে ইতিহাস গড়েছিল, আর বিশ্ব ফুটবল পেয়েছিল তার নতুন এক বরপুত্রকে, যাকে সবাই একবাক্যে ডাকতে শুরু করল ‘মরুভূমির ম্যারাডোনা’।

সেই অবিস্মরণীয় কীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ সে বছরই আল-ওয়াইরান ‘এশিয়ান ফুটবলার অফ দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হন। সেটি ছিল এক মহিমান্বিত পুরস্কারের মঞ্চ, যেখানে তাকে এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি আন্তর্জাতিক ফুটবল ইতিহাস ও পরিসংখ্যান ফেডারেশন (আইএফএফএইচএস) তাকে সেই বছরের বিশ্বের সেরা গোলদাতার তালিকায় ওপরের দিকে স্থান দেয়। তার সেই একক দৌড় কেবল একটি পয়েন্ট বা জয় ছিল না; তা ছিল ফিফার চোখে আধুনিক ফুটবলের এক অনন্য প্রদর্শনী। সৌদি আরবের তৎকালীন বাদশা ফাহাদ বিন আব্দুল আজিজ তাকে একটি দামী রোলস রয়েস গাড়ি এবং অঢেল ধনসম্পদ উপহার দিয়েছিলেন, যা ছিল এক মরু-বালকের রূপকথার মতো প্রাপ্তি।

তবে নিয়তির লিখন ছিল বড়ই বিচিত্র। খ্যাতির সেই সুউচ্চ শিখর থেকে পতনের গল্পটিও ছিল ঠিক ততটাই নাটকীয়। ১৯৯৬ সালে যখন তাকে জেদ্দার এক প্রমোদতরণীতে নৈতিকতা ভঙ্গের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়, তখন পুরো সৌদি আরব স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাকে কারাগারে পাঠানো হয় এবং এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ হন ফুটবল থেকেও। উজ্জ্বল নক্ষত্রটি যেন হুট করেই মেঘে ঢাকা পড়ে গেল।

নিষেধাজ্ঞার সেই বন্দিদশা শেষে ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে তিনি যখন আবার সবুজ ঘাসে পা রাখলেন, তখন তার শরীরে আগের সেই চিতার ক্ষিপ্রতা ছিল না। বয়স এবং মানসিক অবসাদ তার পায়ের জাদু কেড়ে নিয়েছিল। ডেনমার্কের বিপক্ষে সেই বিশ্বকাপে তিনি মাঠে নামলেও তা ছিল কেবলই এক ম্লান উপস্থিতি।

ম্যারাডোনার উত্তরসূরি হওয়ার যে স্বপ্ন ফুটবল বিশ্ব তার চোখে দেখেছিল, তা হয়তো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি; কিন্তু আল-ওয়াইরান প্রমাণ করেছিলেন যে, মরুভূমির ধূলিকণা থেকেও এমন এক আলোর বিচ্ছুরণ ঘটা সম্ভব যা গোটা পৃথিবীকে ধাঁধিয়ে দিতে পারে। আজ যখনই বিশ্বকাপের স্মৃতিচারণ হয়, ফিফার আর্কাইভে সেই একটি গোল বারবার ফিরে আসে, এক নিঃশ্বাসে দৌড়ে যাওয়া সেই যুবক, যার পায়ের ছন্দে থমকে গিয়েছিল বেলজিয়ামের রক্ষণভাগ, থমকে গিয়েছিল সময়ও।
 

Popular

More like this
Related

‘রাক্ষস’ একটি রোমান্টিক সিনেমা: সিয়াম আহমেদ

সিয়াম আহমেদ ঢাকাই সিনেমার একজন দর্শকপ্রিয় নায়ক। এবারের ঈদে...

দুই দশক পর দখলমুক্ত কক্সবাজারের সুগন্ধা সৈকত

প্রশাসনের হুঁশিয়ারির পর কক্সবাজারের সুগন্ধা পয়েন্টের সৈকত থেকে ব্যবসায়ীরা...

ইরান যুদ্ধের কৌশল সামলাচ্ছেন যে মার্কিন অ্যাডমিরাল

লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর হুমকি সর্বোচ্চ পর্যায়ে...

গাজীপুর ও নেত্রকোণাসহ ৫ জেলায় নতুন ডিসি

গাজীপুর, নেত্রকোণা, কুষ্টিয়া, পঞ্চগড় ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ—এই পাঁচ জেলায় নতুন...