কেদারা বা চেয়ার কি কখনও ইতিহাসের গল্প বলতে পারে? আক্রমণ, ঔপনিবেশিক শাসন কিংবা সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের ইতিহাসও কি একটি চেয়ার তুলে ধরতে পারে?
ভারতের মুম্বাই শহরে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একটি প্রদর্শনী সেই প্রশ্নেরই উত্তর দিয়েছে। বিবিসি বলছে, ‘এ হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া থ্রু চেয়ারস’ শিরোনামের এই প্রদর্শনীতে ২০০টির বেশি চেয়ার প্রদর্শন করা হয়, যেগুলোর নকশা ও কাঠের কারুকাজের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে ভারতের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাস।
সংস্কারকারী প্রতিষ্ঠান হাউস অব মহেন্দ্র দোশি আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত চেয়াগুলো ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কয়েক দশক ধরে সংগ্রহ করেছেন ব্র্যান্ডটির অভিভাবক ও সংস্কার বিশেষজ্ঞ আনন্দ গান্ধী ও চিকি দোশি।
চেয়ারগুলোকে সময়ক্রম অনুযায়ী সাজানো হয়েছিল, যাতে উপনিবেশ-পূর্ব যুগ থেকে সমকালীন সময় পর্যন্ত ভারতে বসার সংস্কৃতির বিবর্তন তুলে ধরা যায়। একইসঙ্গে এতে দেখা যায় এমন সব বৈশ্বিক শিল্পধারা, যা একসময় ভারতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। চেয়ারগুলোর নকশা ১৬ থেকে ১৯ শতকের মধ্যে ডাচ, পর্তুগিজ, ফরাসি ও ব্রিটিশদের উপনিবেশিক আগ্রাসনের ইতিহাসের দিকেও আলোকপাত করে।
প্রদর্শনীর সহ-সংগঠক বিবেক গান্ধী বলেন, ‘তারা যখন ভারতে এসেছিল, নিজেদের আসবাবপত্র সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। পাশাপাশি তারা ভারতীয় কারিগরদের দিয়ে এমন চেয়ার ও অন্যান্য সামগ্রী বানাত, যা তাদের পরিচিত ইউরোপীয় নকশার অনুকরণে তৈরি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই কারণেই ভারতে এমন অনেক চেয়ার পাওয়া যায় যেগুলো পুরোপুরি ব্রিটিশ বা ইউরোপীয় নকশার, আবার অনেক ক্ষেত্রে ভারতীয় ও পাশ্চাত্য নান্দনিকতার মিশ্রণ দেখা যায়।’
বিবেক গান্ধীর ভাষ্য, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব চেয়ার অনেক সময় মানুষের বাড়িতে, সম্পত্তির নিলামে, পুরোনো আসবাবের দোকানে বা ব্যক্তিগত সংগ্রহে চলে যায়। সেখান থেকেই সেগুলো সংগ্রহ করা হয়।
তার কাছে বা তার বাবা আনন্দ গান্ধীর কাছে পৌঁছানোর সময় বেশিরভাগ চেয়ারই ছিল খারাপ অবস্থায়—কুশন ছেঁড়া, পা ভাঙা বা হারানো। এরপর দক্ষ কারিগরদের সহায়তায় দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে সেগুলো পুনরুদ্ধার করা হয়; কখনো কখনো এতে কয়েক মাস লেগে যায়।
গুজরাটের একটি সম্পত্তির নিলাম থেকে সংগ্রহ করা সিরামিক পুঁতিতে মোড়ানো একটি চেয়ার পুনরুদ্ধার করতে আট মাস সময় লেগেছিল বলে জানান বিবেক গান্ধী।
সংগ্রহের আরেকটি আকর্ষণীয় বস্তু ছিল বিরল একটি লাউঞ্জ চেয়ার, যার নকশা করেছিলেন সুইস-ফরাসি স্থপতি লে করবুসিয়ের। ১৯৫০-এর দশকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তাকে চণ্ডীগড় শহরের নকশা তৈরিতে সহায়তার জন্য ভারতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এ ছাড়া, গোয়া থেকে সংগৃহীত ১৯ শতকের বেশ কয়েকটি অ্যাংলো-পর্তুগিজ ধাঁচের চেয়ারও ছিল প্রদর্শনীতে; গোয়া একসময় পর্তুগিজ উপনিবেশ ছিল।
প্রদর্শনীতে ভারতের নানা ধরনের উৎকৃষ্ট শক্ত কাঠ—যেমন সেগুন, রোজউড বা শিশু ও আবলুস এবং স্থানীয় কারিগরদের সূক্ষ্ম হস্তশিল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্যও তুলে ধরা হয়েছে।
প্রদর্শনীতে থাকা কিছু চেয়ারের বর্ণনা নিচে দেওয়া হলো—
১৭ শতকের ক্যারোলিয়ান ধাঁচের চেয়ার
ইংল্যান্ডের রেস্টোরেশন যুগে জনপ্রিয় এই চেয়ারটি ভারতে একটি পুরোনো আসবাবের দোকান থেকে সংগ্রহ করা হয়। ধারণা করা হয়, এটি কোনো ব্রিটিশ কর্মকর্তার ব্যবহৃত ছিল। এতে সূক্ষ্ম খোদাই ও সোনালি সুতোর সূচিকর্ম রয়েছে।
অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ধাঁচের সিংহাসন চেয়ার
বারগান্ডি ও সোনালি রঙে তৈরি এই বিশাল সেগুন কাঠের চেয়ার ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রতীক। সাধারণত রাজা বা ধর্মীয় নেতারা এমন চেয়ার ব্যবহার করতেন। বিবেক গান্ধীর মতে, ১৯ শতকের ভারতে কোনো ব্রিটিশ কর্মকর্তা এটি ব্যবহার করে থাকতে পারেন।
চেয়ারের পিঠে মুকুটের প্রতীক রয়েছে এবং এতে মুঘল যুগে জনপ্রিয় জরদৌসি কারুকাজ দেখা যায়—যা ভারতীয় ও পাশ্চাত্য নান্দনিকতার মিশ্রণ।
১৯ শতকের দরবার হলের চেয়ার
এটি ১৯ শতকের গুজরাটের এক ভারতীয় রাজার দরবার হলের চেয়ার। চেয়ারের পেছনে একটি ফলকে নির্মাণকারী কারিগরের নাম এবং নির্মাণের মাস ও বছর খোদাই করা আছে।
১৮ শতকের ইন্দো-পর্তুগিজ বিশপের চেয়ার
এটি সম্ভবত কোনো ক্যাথলিক বিশপ ব্যবহার করতেন। পরে এটি ভারতীয় একটি সরকারি দপ্তরে ব্যবহারের জন্য রূপান্তর করা হয়।
পেছনের অংশে অশোকচক্র
কাঠের ভিন্ন রঙে তৈরি ভারতের জাতীয় প্রতীক অশোকচক্রের চিহ্ন দেখা যায়, যা মূল নকশার অংশ ছিল না বলে ধারণা করা হয়।
হার্পের আদলে চেয়ার
প্রদর্শনীতে লে করবুসিয়েরের নকশা করা চেয়ার এবং জর্গেন হোভেলস্কভের হার্প চেয়ার ছিল দর্শকদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয়। ডেনমার্কের ডিজাইনার হোভেলস্কভ ১৯৬০-এর দশকে ভাইকিং জাহাজ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে হার্প চেয়ার তৈরি করেন।
গুজরাটের কাঠিয়াওয়ার অঞ্চলের মোতি চেয়ার
রঙিন সিরামিক পুঁতির সূক্ষ্ম নকশায় ঢাকা এই চেয়ার সংস্কার করতে আট মাস সময় লেগেছে। ধারণা করা হয়, এটি কোনো স্থানীয় প্রধানের ছিল।
ডাচ বার্গোমাস্টার চেয়ার
নেদারল্যান্ডসের শহরগুলোর মেয়ররা ঐতিহ্যগতভাবে এই ধরনের চেয়ার ব্যবহার করতেন। ১৭ থেকে ১৯ শতকের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের মতো ডাচ উপনিবেশেও এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এতে বাঁশের আসন, বাঁকানো পিঠ এবং ছয় থেকে আটটি পা থাকে।
আর্ট ডেকো ধাঁচের চেয়ার
হাতলের ভেতরে লুকানো খোপ রয়েছে। ১৯৩০-এর দশকে ভারতে আর্ট ডেকো আন্দোলন জনপ্রিয় হয়, যার স্থাপত্য ও সজ্জায় আধুনিক সরল নকশা, গাঢ় রং, প্রতিসম আকার ও নান্দনিক প্যাটার্ন দেখা যায়।